বন্যায় গবাদিপশু নিয়ে বেকায়দায় আছেন স্থানীয় অধিবাসীরা। একদিকে খাদ্য সংকট, অন্যদিকে শুকনো স্থানের অভাব। ফলে হিমশিম খাচ্ছেন পশু মালিকরা। তবে এই বন্যার কারণে ঈদুল আজহার কোরবানির বাজারে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, ২৮ জেলার বন্যায় খামারিরা কিছুটা সমস্যায় পড়েছেন ঠিক। কিন্তু কোরবানির বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। কারণ আসন্ন ঈদে দেশে সর্বমোট ১ কোটি ১০ লাখ পশু কোরবানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। সে হিসাবে চাহিদার চেয়ে বেশি পশু দেশে রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুসারে এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে গরু-মহিষ রয়েছে ৪৫ লাখ ৮২ হাজার, ছাগল-ভেড়া ৭২ লাখ, অন্যান্য পশু ৬ হাজার ৫৬৩টি। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ১ কোটি ১৭ লাখ ৮৮ হাজার পশু কোরবানির প্রস্তুতি রয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পশু লালন-পালনের হার বেড়েছে।
দেশ রূপান্তরের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি পরিমল মজুমদার জানান, কুড়িগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় বন্যার পানির কারণে বেকায়দায় পড়েছেন অনেক খামারি। খাদ্য সংকট আছে, তারচেয়ে বেশি সমস্যা শুকনো জমি। তবে এ পর্যন্ত অর্থ সংকটের কারণে কোনো পশু কম দামে বিক্রি করছে না। স্থানীয় খামারি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ঝুনকার চরের বাসিন্দা আছর উদ্দিন জানান, তার গরুর সংখ্যা ১২। প্রতি বছর গরু বিক্রি করেই পরিবারের খরচ বহন করেন। এখন বন্যার পানিতে ভেজা খড় ছাড়া গরুকে কিছু খেতে দিতে পারছেন না। নিজে পানিতে থাকলেও গরুকে রাখছেন মাচায়। ঈদে ভালো দাম পাওয়ার আশায় এখন বিক্রি করছেন না। একই কথা বলেন জামালপুর প্রতিনিধি শোয়েব হোসেন। তিনি জানান, বন্যায় পশু পালনে সমস্যা হচ্ছে। খাদ্য সংকট রয়েছে। তবে খামারিরা নিজে না খেয়ে থাকলেও পশুর জন্য খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এখন পর্যন্ত কোনো পশুর প্রাণহানি হয়নি বলে জানান তিনি।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। ঈদ আসতে আরও কিছুদিন বাকি। এই সময়ের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে।
সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে ঈদুল আজহায় কোরবানি পশুর হাটে সুস্থ-সবল গবাদিপশু সরবরাহ ও বিক্রি নিশ্চিতে এক সভা হয়। সভায় কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় স্থায়ী ও অস্থায়ী পশু হাটের সংখ্যা নির্ধারণের তথ্য অনুসারে, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যহানিকর স্টেরয়েড ও হরমোন ইনজেকশনের মাধ্যমে গরু মোটাতাজাকরণ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্যসম্মত মোটাতাজাকরণকে উৎসাহিত করতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো একযোগে কাজ করবে।
২০১৪ সালে ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের (বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী) গোরক্ষা নীতির ধারাবাহিকতায় দেশটি থেকে গরু আমদানিতে ভাটা পড়ে। এরই ভিত্তিতে গরু-ছাগল পালনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ওপর জোর দেয় সরকার। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন বাড়ায় বর্তমানে এ আমদানি নির্ভরতা কাটিয়ে উঠছে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় এ বছর ঈদের আগ পর্যন্ত ভারত থেকে গরু আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার।
সভায় বলা হয়, দেশের বাইরে থেকে গরু আনা বন্ধের বিষয়ে পশু ও পশু বিক্রেতার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কোরবানির পশুবাহী ট্রাক ছিনতাই প্রতিরোধ এবং সীমান্ত জেলাগুলোয় পশুর অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভাগ, জেলা প্রশাসন, বিজেপি ও পুলিশকে একজোটে কাজ করতে হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে গবাদিপশুর মোট খামারের সংখ্যা ১ লাখ ৩৬ হাজার। প্রতি বছর বাড়ছে খামারির সংখ্যা। শেরপুরের নওহাটা গ্রামের তরুণ খামারি খোরশেদ আলম বলেন, গরু বিক্রির একটি ভালো সময় কোরবানির ঈদ। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হলে খামারিরা গরু পালনে আগ্রহী হবেন। প্রতি বছরই গোখাদ্যের দাম বাড়ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আনুষঙ্গিক খরচ। এ কারণে অনেকেই গরু পালন করছেন না। ন্যায্য দাম পেলে অনেক শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা গরুর খামার করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।
এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলেন, খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি সারা দেশে কোরবানির হাটে স্বাস্থ্যসম্মত পশু সরবরাহ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে যাবতীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খামারিদের প্রশিক্ষণ ও পশু ব্যবস্থাপনায় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। আমরা চাই খামারিরা যাতে ভালো দাম পান ও ভোক্তারাও যাতে মানসম্মত নিরাপদ পশু পেতে পারেন। এজন্য আসন্ন ঈদে ঢাকাসহ দেশের উল্লেখযোগ্য হাটবাজারে পশুর স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম কাজ করবে।
