বরগুনায় প্রকাশ্যে সড়কে বহু পথচারীর উপস্থিতিতে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার সঙ্গে জড়িত ‘বন্ড-০০৭’ গ্রুপের সদস্যরা ‘টিম৬১’ নামে একটি ফেইসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপের ব্যানারে সংগঠিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। নতুন এই গ্রুপে সক্রিয় থেকে তারা নিজেদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে। আর এই গ্রুপের প্রোফাইল পিকচার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ছবি। এছাড়া নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া ‘বন্ড-০০৭’ গ্রুপের সদস্যরা ‘লারেলাপ্পা’ ও ‘হানিবন্ড’ নামের আলাদা আরও দুটি
ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে সক্রিয় রয়েছে বলেও দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে। তবে বরগুনার পুলিশ প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলেছে, এ ধরনের কোনো গ্রুপের বিষয়ে তাদের কাছে তথ্য নেই।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশব্যাপী আলোচিত রিফাত হত্যার ঘটনার পর দিন থেকে নিষ্ক্রিয় হতে থাকে ‘বন্ড-০০৭’ গ্রুপ। এই হত্যা মামলার ১ নম্বর আসামি ও ‘বন্ড-০০৭’ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড গত ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় ‘বন্ড-০০৭’ গ্রুপটি। অনেকেই গ্রুপ থেকে লিভ নিয়ে নেয়। অভিযোগ রয়েছে, এই গ্রুপের সব সদস্য তাদের ইচ্ছায় গ্রুপে যুক্ত হয়নি। কিছু কিছু সদস্যকে নয়ন বন্ড জোর করে গ্রুপে যুক্ত করেছিল।
নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া ‘বন্ড-০০৭’ গ্রুপের এক সদস্য এবং নতুন ‘টিম ৬১’ গ্রুপের আরেক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, রিফাত হত্যার পরপরই ৬১ জন সদস্য নিয়ে গঠন করা হয় ‘টিম ৬১’ নামের নতুন ফেইসবুক গ্রুপ। গ্রুপটিতে প্রথম ধাপে ৬১ জন সদস্য থাকলেও ‘বন্ড-০০৭’ গ্রুপের মতোই ধীরে ধীরে এখানেও বৃদ্ধি করা হয় সদস্য সংখ্যা। এক পর্যায়ে শুধুমাত্র বিশ্বস্ত সদস্যদের রেখে বাকিদের গ্রুপ থেকে রিমুভ করে দেওয়া হয়। এই গ্রুপটি থেকে রিফাত হত্যাকাণ্ড পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এবং গতিবিধির ওপর নজরদারি করেন গ্রুপের সদস্যরা। কথিত বন্দুকযুদ্ধে নয়ন বন্ডের নিহত হওয়া এবং রিফাত হত্যা নিয়ে এই গ্রুপের সদস্যদের মধ্যেও একাধিকবার কথোপকথন হয়েছে বলে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে। নতুন এই ম্যাসেঞ্জার গ্রুপের অ্যাডমিন হিসেবে রয়েছে বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে ইরফান আহমেদ (বিশাল)।
গত ২ জুলাই ভোরে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর নিহত নয়নের একটি ছবি ‘টিম ৬১’ গ্রুপে আপলোড করেন শাহরিয়ার নামের এক সদস্য। ওই ছবিটিতে নিহত নয়নের হাতে থাকা ট্যাটুর অংশটি নিল রঙের গোলাকৃতির মার্ক করা ছিল। এরপরই ইরফান আহমেদ নামে এক সদস্য তাকে প্রশ্ন করে, ‘তোরা শিওর নয়ন বন্ড ধরা পড়ছে?’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘টিম ৬১’ এর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বন্ড গ্রুপটি নিষ্ক্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই গ্রুপটি তৈরি করা হয়। সেখানে ৬১ জন সদস্যকে যোগ করার কারণে গ্রুপের নামকরণ টিম ৬১ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয়।’
ওই সদস্য আরও বলেন, ‘বন্ড-০০৭ গ্রুপের সদস্য শাহরিয়ার ইমরান, সাদনাম পাপ্পু, আসিফ নাইস সৈকত ও আব্দুল্লাহ রিফাত নতুন গ্রুপে সক্রিয় থেকে ঘটনার দিকে নজর রাখছে এবং রিফাত হত্যাকা- ও নয়ন বন্ডের নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছে।’
শুধু ‘টিম ৬১’ই নয়, বরগুনায় আরও সক্রিয় আছে ‘লারেলাপ্পা’ ও ‘হানিবন্ড’ নামের দুটি কিশোর গ্যাং গ্রুপ। গ্রুপ সদস্য ও বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘টিম ৬১’ গ্রুপটি যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হলেও লারেলাপ্পা গ্রুপটি ব্যবহার করা হচ্ছে মাদক সেবনের গোপন গ্রুপ হিসেবে। সেই সঙ্গে হানিবন্ড নামের গ্রুপটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে নারীদের মাদক সেবনের জন্য। এই গ্রুপের মেম্বার হওয়ার জন্য তিনটি ধাপ অতিক্রম করতে হয় গ্রুপ সদস্যদের। এগুলো হলো- প্রথমত অবশ্যই তাকে মাদকসেবী হতে হবে। দ্বিতীয়ত তাকে মাদক ব্যবসায় যুক্ত হতে হবে। তৃতীয়ত এ বাহিনীর সদস্য হিসেবে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, লুটপাট, অপহরণ ও ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে অপরাধমূলক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করতে হবে। এসব কিশোর গ্যাং সদস্যদের বয়স ১২ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। শুধু হাতেগোনা কয়েকজনের বয়স ৪০-এর মধ্যে।
বরগুনা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বলেন, ‘বরগুনায় রিফাত হত্যার অন্যতম কারণ মাদক ও কিশোর গ্যাং। একের পর এক কিশোর গ্যাং মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। প্রশাসনের এই সব গ্যাংয়ের ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করে শুরুতেই এগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া উচিত। না হলে আরও অনেক রিফাত শরীফ অকালে মারা যাবে।’
এদিকে ‘টিম ৬১’ নামে নতুন গ্রুপের বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনা সদর থানার ওসি আবির মোহাম্মাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই ধরনের ফেইসবুক গ্রুপের কথা আমরা শুনিনি। ০০৭ বন্ড গ্রুপের বিষয়টিও প্রকাশ্যে এসেছে রিফাত হত্যাকাণ্ডের পর থেকে। যে ধরনের গ্রুপের কথা শোনা যাচ্ছে সে বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই এবং আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আমাদের এ ধরনের কোনো তথ্য দেয়নি।’
