মালিঙ্গার ইয়র্কারে সারেন্ডার করতেই হয়

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৯, ০১:৪২ এএম

২২৬ ম্যাচে ৩৩৮ উইকেট নিয়ে মাথা উঁচু করেই ওয়ানডে ক্রিকেটকে বিদায় বললেন লাসিথ মালিঙ্গা। বিদায় বেলায় অনেক ক্রিকেটারই আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। মালিঙ্গা হননি। হাসিমুখেই মাঠে সতীর্থদের কাছ থেকে ল্যাপ অব অনার নিয়েছেন, ম্যাচ শেষে সমর্থকদের দিয়েছেন। কোনো আক্ষেপ বা ক্ষোভ নিয়ে একদিনের ক্রিকেটকে বিদায় বলেননি ‘মালি’। জানালেন, ‘ওয়ানডেতে আমার সময় ফুরিয়েছে। সঠিক সময়েই অবসর নিচ্ছি।’

বিশ্বকাপের আগে নেতৃত্ব চলে যাওয়ায় একটু চটেছিলেন। আচমকা টুর্নামেন্টের আগেই তার অবসরের ঘোষণা দেওয়ার গুঞ্জনও ছড়ায়। শেষ পর্যন্ত উত্তেজনার কিছু ঘটেনি। ঠা-া মাথায় দুর্দান্ত এক বিশ্বকাপ কাটিয়ে বুঝেশুনেই ওয়ানডেকে ইতি বললেন। বয়স ৩৫, সামনে একদিনের ক্রিকেটে বড় কোনো চ্যালেঞ্জও নেই যার জন্য অপেক্ষা করবেন। তাই অবসরের সময় নিয়েও কোনো আক্ষেপ নেই মালিঙ্গার, ‘আমি সত্যিই খুশি যে এমন একটি দিনে-পরিবেশে অবসর নিতে পারছি। ১৫ বছর শ্রীলঙ্কার হয়ে খেলেছি। সত্যিই আমি গর্বিত। নিজের সেরাটা দিয়ে দেশের জন্য চেষ্টা করেছি। আজ স্টেডিয়াম পুরোটা ভর্তি ছিল। সবাই আমার খেলা দেখতে এসেছে। আমি বুঝতে পেরেছি সবাই আমাকে কতটা ভালোবাসে। ১৫ বছরের পরিশ্রম বৃথা যায়নি। অবসর নিয়ে তাই আমার কোনো আক্ষেপ নেই। খুশি যে এমন একটা পরিবেশে বিদায় বলতে পেরেছি।’

প্রতিটি দলের চিন্তায় এখন ২০২৩ বিশ্বকাপ। শ্রীলঙ্কার চিন্তাতেও তাই। মালিঙ্গার মতে এখনই সময় তরুণদের জন্য জায়গা ছেড়ে যাওয়ার। যেন তার আদর্শ ধরে বর্তমান তরুণ পেসাররা বিশ্বকাপের জন্য নিজেদের তৈরি করতে পারে। মালিঙ্গার আদর্শ কী? ম্যাচ উইনার হওয়া। মালিঙ্গা বিশ্বাস করেন এই যুগের ওয়ানডেতে কোনো রকমে টিকে থাকা কোনো গুরুত্ব বহন করে না। দলে ম্যাচ উইনারের প্রয়োজন। ২০০৪ থেকে যেই দায়িত্বটি সফলতার সঙ্গে পালন করে এসেছেন মালিঙ্গা। এই দায়িত্বের ব্যাটনটা হাতবদল হয়েছিল চামিন্দা ভাসের কাছ থেকে। ভাসের পর মালিঙ্গাই তো লঙ্কান পেস আক্রমণকে টেনে নিয়ে এসেছেন। এই পেসারের বিশ্বকাপ ২০২৩ বিশ্বকাপ সামনে রেখে নতুন কেউ একজন ‘ম্যাচ উইনার’-এর ব্যাটনটা টেনে নেবেন, আশা মালিঙ্গার।

ফিটনেস হয়তো শতভাগ নেই মালিঙ্গার। কিন্তু ম্যাচ উইনার হিসেবে তিনি এখনো শীর্ষে। ক্যারিয়ারের শেষ ওয়ানডেতেও তা দেখিয়ে দিলেন। ম্যাচের আগে টিভিতে দেখানো হচ্ছিল মালিঙ্গাকে দুই দলের খেলোয়াড়রা বিদায়ী অভিবাদন জানাচ্ছেন। তাতে মুশফিকুর রহিমের বক্তব্য ছিল এমন, ‘তোমার চলে যাওয়া আমাদের সবার জন্য স্বস্তির। আশা করি ক্রিকেটে বাকি দিনগুলো তুমি উপভোগ করবে।’

মুশফিকের ‘স্বস্তি’ বলার কারণটা শুক্রবার আবারও দেখল বিশ্ব। ম্যাচ শেষে তামিমের স্বীকারোক্তিই এর সপক্ষে সব বলে দেয়, ‘সবাই জানে মালিঙ্গা আপনাকে ইয়র্ক দেবে। সে জন্য আপনি প্রস্তুতও থাকেন। কিন্তু ওর এমন কিছু ডেলিভারি আসে যেগুলোতে কিছুই করার থাকে না। যদি আমার আউটটা দেখেন, বলটা লেট এয়ার সুইং (বাতাসে সুইং) করেছে। এমন বলে আপনি কী-ই বা করবেন। ওই ওভারের তৃতীয় বলে খুব ভালো একটু ইয়র্ক ডিফেন্ড করেছিলাম। কিন্তু পঞ্চম বলেরটা ছিল বিশেষ। এসব বলে সারেন্ডার করা ছাড়া উপায় নেই।’

একই ‘ট্রো ক্র্যাশার্স’ দিয়ে সৌম্যকে ফিরিয়ে ছিলেন মালিঙ্গা। ওই ওভারের প্রথম বলটি ইয়র্কার। সৌম্য কোনো রকমে ব্যাট চেপে দিয়েছিল। পরের বলেও সেই ট্রো ক্রাশার্স, আর সৌম্য শেষ মুহূর্ত ব্যাট পাততে সক্ষম হন। তৃতীয় বলেও একই, যেমন দ্বিতীয় বলের কপি। এবার আর সফল হতে পারেননি সৌম্য, বোল্ড হয়ে ফিরে যান। টানা তিন বলে তিন ইয়র্কার, সফলও হলেন, মালিঙ্গা যেন প্রশ্ন রাখলেন, ‘সারা দিন এটা করে যেতে পারব, তুমি কি সারা দিন রুখতে পারবে?’  

মুশফিকের স্বস্তিটা কেন তা এতেই পরিষ্কার। এমন একজন পেসারকে কাছে পেয়ে তাই আনন্দে আত্মহারা জাসপ্রিত বুমরাহ। এই সময়ে ভালো ইয়র্কার তো এই ভারত পেসারই দিয়ে থাকেন। সে সব যে মালিঙ্গার কাছ থেকে শেখা তা আর বলে দিতে হয় না। আইপিএল দল মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সে মৌসুমের পর মৌসুম মালিঙ্গার কাছে এই তালিমই নিয়েছেন বুমরাহ। তাই লঙ্কান কিংবদন্তির বিদায় বেলায় সবচেয়ে বেশি শুভেচ্ছাবাণী ঝরল মুম্বাই ক্রিকেটারদের। বুমরাহ বলছেন, ‘ক্লাসিক মালি, তোমাকে সম্মান করি, সবসময় করে যাব।’ অধিনায়ক রোহিত শর্মা বলছেন, ‘যদি আমাকে অনেকের মধ্য থেকে একজন ম্যাচ উইনার বাছাই করতে বলা হয়, অবশ্যই মালিঙ্গাকেই নেব।’ কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার বলেছেন, ‘অভিনন্দন এমন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের জন্য। ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা।’

পিছিয়ে ছিলেন না মোস্তাফিজুর রহমানও। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সে গত মৌসুমে প্রথম খেলতে গিয়েই মালিঙ্গাকে কাছ থেকে দেখেন। কোনো সন্দেহ নেই নতুন করে ইয়র্কারের কৌশল ঝালিয়ে নিয়েছিলেন। অনুশীলনে কথা বলছেন এমন একটি ছবি পোস্ট করে মোস্তাফিজ টুইটারে লিখেন, ‘আমি ভাগ্যবান যে আপনার সঙ্গে ড্রেসিংরুমে শেয়ার করতে পেরেছি। ওয়ানডে ক্রিকেট আপনাকে মিস করবে। গুডবাই লিজেন্ড।’ জাতীয় দলে মালিঙ্গার সবচেয়ে কাছের সতীর্থ মাহেলা জয়াবর্ধনে, কুমার সাঙ্গাকারা ও তিলাকরত্নে দিলশানও টুইটার বার্তায় মালিঙ্গার বিদায়কে স্মরণীয় করেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত