মশার সঙ্গে মানুষের যত যুদ্ধ

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০১৯, ১২:১৬ এএম

বর্তমানে ১০০টি দেশের প্রায় ২৫০ কোটি মানুষ মশাবাহিত ডেঙ্গুঝুঁকির মুখে। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়েসের মশা নিধন কর্মসূচির কর্মকর্তা রজার এস নেস্কির মতে, পৃথিবীর সব মশা মেরে ফেলা অসম্ভব কাজ। বিজ্ঞানের কোনো শাখাতেই পৃথিবীর সব মশা মেরে ফেলার মতো কোনো অস্ত্র তৈরি হয়নি। তাই বলে রক্তচোষা এই ক্ষুদ্র প্রাণীটির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ মেনে নেয়নি অনেক দেশই। মশার সঙ্গে যুদ্ধ করা সফল দেশগুলো নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি

ইতিহাসে মশা ও ডেঙ্গুজ্বর

পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো মশাটির নিদর্শন পাওয়া গেছে কানাডায়। ওই মশাটি প্রায় ৮ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণ করেছিল। তবে মশার মতোই আরেক ধরসের ক্ষুদ্র রক্তচোষা প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে মায়ানমারে। ওই ফসিলটির বয়স প্রায় ১০ কোটি বছর। গবেষকদের মতে, পৃথিবীর বুকে মশার বিচরণ আরও অনেক আগে থেকেই। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতিরও বেশি মশা রয়েছে। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে বিপজ্জনক এই প্রাণীটির উপস্থিতি বেশি। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে ১১৩টি প্রজাতির মধ্যে তিন চারটি প্রজাতির মশা খুবই ভয়ংকর। এই প্রজাতিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অ্যানোফিলিস মশা। ১৮৯৮ সালে স্যার রোনাল্ড রস কলকাতায় বসে অনেক গবেষণার পর আবিষ্কার করেন যে, ম্যালেরিয়া রোগের জন্য দায়ী এই অ্যানোফিলিস মশা।

১৯০০ সালে ওয়াল্টার রিড আবিষ্কার করেন, এডিস মশা পীতজ্বর ও ডেঙ্গুর জীবাণু ছড়ায়। এছাড়াও কিউলেক্স নামে আরেক ধরনের মশা থেকে ফাইলেরিয়া বা গোদরোগ ছড়ায়।

এসব মশার মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরের বাহক এডিস মশা অপেক্ষাকৃত ভদ্র ও অভিজাত মশা। এই মশাকে শহুরে মশাও বলা হয়। পরিষ্কার পানি ছাড়া এরা ডিম পাড়ে না। এমনকি ভাঙা পিরিচের মধ্যে জমে থাকা অল্প পানিতেই এরা ডিম পাড়ে। রাতের বেলায় এই মশাটি আশ্রয় নেয় ড্রয়িং ও বেডরুমের পর্দার আড়ালে, দরজার ফাঁকে। এছাড়াও গৃহসজ্জায় রাখা ফুলের টব ও ফ্রিজ ও এয়ারকুলারের শীতল ছায়ায় এরা বিচরণ করে। সকালে ও সন্ধ্যার আগে এটি ঘুমন্ত মানুষ কামড়ে থাকে। এই সময়গুলো মানুষ মশার ব্যাপারে সচেতন থাকে না। এডিস সেই সুযোগটা বেশ কাজে লাগায় এবং ছড়িয়ে দেয় ডেঙ্গুর জীবাণু।

ইতিহাস বলে ডেঙ্গু মহামারীর প্রথম আবির্ভাব হয় চীনে। খ্রিস্টপূর্ব ২৬৫-৪২০ অব্দে জিন সাম্রাজ্যের সময় এই রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা জানা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও বিভিন্ন দেশে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল ডেঙ্গু। স্প্যানিশ ‘ডেঙ্গু’ শব্দ থেকে এই রোগের নামকরণ হয়। যার অর্থ হাড়ভাঙা জ্বর। তবে স্পেনে শব্দটি এসেছে পূর্ব আফ্রিকার সোহাইলি আদিবাসীদের কাছ থেকে। তাদের বিশ্বাস ছিল ‘খারাপ আত্মার সংস্পর্শে হাড়গোড় ভাঙার ব্যথাঅলা’ এই জ্বর হয়।

সাম্প্রতিক রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৫২ সালে আফ্রিকায় আত্মপ্রকাশ করে ডেঙ্গুজ্বর। পরে এটি এশিয়া ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং ইন্দোনেশিয়ায় বিস্তার লাভ করে। জানা যায়, ১৯৭৯-৮০ সালে এশিয়া, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকা ডেঙ্গু মহামারীতে পতিত হয় তখন থেকেই বিষয়টি আলোচনায় আসে। ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনকারীরা জাহাজে করে আফ্রিকা থেকে মশার এই জাতকে সমুদ্র পার করে আমেরিকা ও এশিয়ায় নিয়ে আসে বলে ধারণা করা হয়।

বিংশ শতকের শুরুতে ১৯০৬ সালে এডিস মশার পরিবাহিতা সম্পর্কে সবাই নিশ্চিত হয়। ১৯০৭ সালেই ভাইরাসঘটিত রোগের মধ্যে ডেঙ্গু হয়ে ওঠে দ্বিতীয়। এই জ্বরের এই চরম রূপের বিবরণ ১৯৫৩ সালে প্রথম ফিলিপাইনে পাওয়া যায়। ১৯৭০ সালে এই জ্বর শিশুমৃত্যুর এক প্রধান কারণ হয়ে ওঠে এবং আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

রেকর্ড বলে, ১৯৬৪ সাল থেকে বাংলাদেশে ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। সে সময় বেশ কিছু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছিল। এদের মধ্যে ২০ জনের জ্বরের সঙ্গে এখনকার ডেঙ্গুজ্বরের বেশ মিল রয়েছে। অবশ্য তখন এ জ্বরের কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ঢাকা ফিভার’। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে এক ধরনের অজ্ঞাত জ্বর ছড়িয়ে পড়েছিল।

১৯৯৯ সালে বাংলাদেশেও মারাত্মক আকারে ডেঙ্গুজ্বর দেখা দেয়। সে সময়ও ঢাকার জনগণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। কারণ সবার কাছে এই রোগটি ছিল নতুন ও অপরিচিত। ফলে রোগাক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের দিশেহারা অবস্থা সৃষ্টি হয়। শত শত রোগীর জন্য রক্তের প্লাটিলেট সংগ্রহ ও সরবরাহ করার জন্য রাজধানীর হাতেগোনা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়।

মশা মারতে মানুষের যত অস্ত্র 

১৯৫০-৬০ দশকে মশা দূর করতে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। ব্যাপক হারে ডিডিটিসহ বিভিন্ন শক্তিশালী কীটনাশক ব্যবহার করা হয় পুরো মহাদেশে। এতে কিছু সময়ের জন্য মশা দূর হয়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই ধীরে ধীরে মশা ফিরতে শুরু করে। ধারণা করা হয়, সেখানকার মশা দূর হলেও এশিয়া বা আফ্রিকার জাহাজ থেকে আবারও মশার বিস্তার ঘটে।

তবে, মশার সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হতে মানুষ এখনো জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ম্যালেরিয়াবাহী অ্যানোফিলিস মশা নিধনে জিন এডিটিং পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন। এই পদ্ধতিতে মশা থেকে ম্যালেরিয়ার জিন সরিয়ে ফেলা হয়।

মশাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে একটি ফোটোনিক জালও তৈরি করেছেন গবেষকরা। এটি মূলত লেজারের বিশেষ জাল। একে ‘ফোটোনিক ফেন্স’ বলে। ২০১০ সালে মাইক্রোসফটের প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা নাথান মারভোল্ড ফোটোনিক ফেন্সের কথা বলেন। মশার পাখার আওয়াজ শুনে স্বল্পশক্তির লেজারের মাধ্যমে তা মেরে ফেলা বা পুরোপুরি অকার্যকর করে ফেলতে সক্ষম এ পদ্ধতি। এই পদ্মতিতে ৯৯ শতাংশ মশা মারা সম্ভব হলেও এখনো ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়নি।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটি অ্যাপ তৈরি করছেন, যা মেশিন লার্নিং পদ্ধতি অ্যাকুয়াস্টিক শব্দ ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রজাতির মশা শনাক্ত করতে পারে। এ অ্যাপের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে অ্যানোফিলিস প্রজাতির মশা শনাক্ত করা সম্ভব। গবেষকদের দাবি, এই অ্যাপের সফলতার হার ৭২ শতাংশ। ক্ষুদ্র প্রাণী হলেও ঝড়ের পূর্বাভাস বুঝতে পারে মশা। তখন তারা দূরে সরে যায়। ইলেকট্রোম্যাগনেটিক সংকেত দিয়ে মশার মস্তিষ্কে ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। এতে মশার কামড় থেকে সাময়িক মুক্তি পাওয়া যায়। এ রকম ইলেকট্রোম্যাগনেটিক সংকেত দিতে সক্ষম রিস্টব্যান্ড তৈরি করেছে নোপিক্সগো নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

জেনেটিক পদ্ধতিতে বিশেষ প্রকৌশলে কিলার মশা বা বন্ধু মশাও আবিষ্কার করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। এ পদ্মতিতে পুরুষ মশাকে মশা মারার কীটনাশকবাহী হিসেবে তৈরি করা হয়। এছাড়াও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে উবাকিয়া পদ্মতি। উবাকিয়া একটি ব্যাকটেরিয়া যা প্রকৃতিতেই থাকে। বিভিন্ন কীটপতঙ্গের দেহকোষে এই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায় এবং ডিমের মাধ্যমে এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। ৬০ শতাংশ কীটপতঙ্গের দেহে এই উবাকিয়া থাকলেও এডিস মশার শরীরে এই ব্যাকটেরিয়া নেই। গবেষকদের দাবি, এডিস মশার কোষে এই ব্যাকটেরিয়া ঢুকিয়ে দেখা গেছে যে এর মাধ্যমে চিকনগুনিয়া, ডেঙ্গু, জিকা ও ইয়েলো ফিভারের মতো চারটি ভাইরাসজনিত রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ফলমূলে বসে যেসব মাছি সেগুলোর কোষ থেকে সূক্ষ্ম একটি সুঁই দিয়ে প্রথমে উবাকিয়া সংগ্রহ করেন গবেষকরা। পরে সেই ব্যাকটেরিয়া ঢুকিয়ে দেওয়া হয় এডিস মশার ডিমের ভেতর। সূক্ষ্ম এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে গবেষকদের সময় লেগেছে ১৫ বছর। অস্ট্রেলিয়ায় দশ সপ্তাহ ধরে পরিবেশে এসব মশা ছাড়ার কয়েক মাস পরই দেখা গেছে, সেখানকার ১০০ ভাগ মশাতেই উবাকিয়া আছে এবং সেই ধারা এখনো অব্যাহত আছে।

মশাযুদ্ধে বিজয়ী চীন

দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংডোং প্রদেশের দুটি দ্বীপ থেকে মশা নির্মূল করতে প্রায় সক্ষম হয়েছেন চীনা বিজ্ঞানীরা। ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সায়েন্স’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে। গুয়াংডোং থেকে নির্মূল করা মশার প্রজাতির নাম এশিয়ান টাইগার। এই প্রজাতির মশাকে বিশ্বের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক মশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত এই প্রজাজির স্ত্রী মশার কামড়ে বিভিন্ন ধরনের রোগ সংক্রমণের ঘটনা ঘটে। তবে নতুন উপায়ে এশিয়ান টাইগার প্রজাতির স্ত্রী মশার সংখ্যা ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হয়েছ এবং এর ফলে মশার কামড় কমেছে ৯৭ শতাংশ। মূলত কৃত্রিম উপায়ে মশার বংশবিস্তার রোধ করার মাধ্যমে মশা নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে চীন।

image

চীনের ওই দুটি দ্বীপ থেকে মশা নির্মূল করার যে প্রকল্প তাতে মুখ্য গবেষক ছিলেন জি ঝিয়োং। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন মশার বংশবিস্তার রোধের উপায় খোঁজার কাজ করেছেন। নতুন গবেষণায় জি ও তার সহকর্মীরা নারী ও পুরুষ উভয় মশার বংশবিস্তার ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা করেন। এই পদ্মতিতে সীমিত পরিসরে রেডিয়েশনের মাধ্যমে স্ত্রী মশাকে বন্ধ্যা করে দেওয়া হয়। আর পুরুষদের উবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত করা হয়। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে চীনের ওই দুটি দ্বীপে ওই প্রকল্প চালু করার পর ধীরে ধীরে নারী মশার সংখ্যা একেবারে শূন্যের কাছাকাছি পৌঁছায়।

এর আগে ২০১৮ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজ অব লন্ডনের বিজ্ঞানীরা জিন সম্পাদনা করে নারী মশাকে বন্ধ্যা করেছিলেন। আর পুরুষকে স্বাভাবিক রাখা হয়। এ অবস্থায় তাদের মধ্যে মিলন ঘটলেও বংশবিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়। বর্তমানে জি ঝিয়োং চীনে একটি মশার ফ্যাক্টরি পরিচালনা করছেন, যেখানে তিনি ক্ষতিকর মশাদের দমনের জন্য কৃত্রিম মশা উৎপাদন করেন। এর আগে তিনি পুরুষ মশাকে প্রজনন অক্ষম করার প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। পুরুষ মশাকে প্রজননে অক্ষম করার মাধ্যমে তিনি মশার বংশবিস্তার রোধের প্রচেষ্টা চালান। মশা নিধনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ২০১৬ সালে জি ঝিয়োং গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, আমরা এমন কিছু ভালো মশা তৈরির কাজ করছি যেগুলো খারাপ মশার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের সাহায্য করতে পারবে।

মশার বিরুদ্ধে ব্রাজিলের যুদ্ধ

বিশ্বের সর্বাধিক ডেঙ্গু আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিল অন্যতম। দেশটিতে ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ লাখ লোক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তবে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা ব্রাজিলে ভয়ংকর জিকা ভাইরাসও ছড়িয়ে দিয়েছিল। এখন পর্যন্ত দুই আমেরিকা মহাদেশেই জিকা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। আর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ব্যক্তি পাওয়া গেছে ব্রাজিলেই। দেশটিতে কয়েকশ শিশু অস্বাভাবিক ছোট মাথা ও ক্ষতিগ্রস্ত মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মে। এর জন্য জিকা ভাইরাসকেই দায়ী করেন বিজ্ঞানীরা।

২০১৬ সালে জিকা ভাইরাসের জন্য দায়ী এডিস মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল ব্রাজিল। দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফের আহ্বানে মশার বিরুদ্ধে ওই যুদ্ধে দেশের হাজার হাজার সেনাসদস্য ও সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও বাড়ি ও কর্মস্থলে মশা নিধনে অংশ নেন।

image

যুদ্ধ ঘোষণার প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট রুসেফ বলেছিলেন, ‘এটা এমন একটি লড়াই যেখানে পরাজিত হওয়া চলবে না।’ তার মতে, যেহেতু বিজ্ঞান এখনো জিকাবিরোধী টিকা আবিষ্কার করতে পারেনি, সেহেতু এই রোগ মোকাবিলার একমাত্র পদক্ষেপ হচ্ছে মশার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠভাবে লড়াই করা। মশার বিরুদ্ধে ব্রাজিলের লড়াই শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালেই। সেবার ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধে মশাকেই কাজে লাগিয়েছিলেন ব্রাজিলের একদল গবেষক। তারা ১০ হাজার মশার শরীরে ডেঙ্গু প্রতিরোধক উবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করিয়ে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেন। উবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া মানুষ বা অন্য প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে ডেঙ্গুজ্বরের ভাইরাসবাহী এডিস মশার জন্য তা ভ্যাকসিন হিসেবে কাজ করে।

গবেষকরা বলেন, উবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া মশার বংশবিস্তার রোধ করে। এই ব্যাকটেরিয়াবাহী পুরুষ মশার সঙ্গে কোনো স্ত্রী এডিস মশা মিলিত হলে সেই মশার ডিম থেকে বাচ্চা তৈরি হবে না। তবে উবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াযুক্ত স্ত্রী মশার সঙ্গে কোনো পুরুষ এডিস মশার মিলনে বাচ্চা হলেও সেটি হবে ওই ব্যাকটেরিয়াযুক্ত। যা আবার এডিস মশার জন্য ক্ষতিকর হবে। এভাবে উবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াযুক্ত এসব মশা ডেঙ্গুর ভাইরাসবাহী এডিশ মশার বংশ নির্মূলে ভূমিকা রাখে। ২০০৮ সালে প্রতিরোধে প্রথম এ ধরনের প্রকল্প হাতে নিয়ে সফল হন অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। কিন্তু মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর ক্ষতির আশঙ্কায় তখন এর প্রয়োগ করা হয়নি। পরে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ভিয়েতনাম ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রয়োগ করা হয় এই পদ্ধতি। তাতে সাফল্য এলে অনুপ্রাণিত হন ব্রাজিলের গবেষকরা।

এছাড়া গত বছরও (২০১৮) একই পদ্মতিতে মশা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে ব্রাজিল। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির সহযোগিতা নেয় দেশটি। ড্রোন উড়িয়ে কয়েক কোটি বাঁজা মশা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

আমেরিকানদের কিলার মশা

যখন কোনো উদ্যোগই ঠিকমতো কাজ করছিল না তখন আমেরিকানরা প্রয়োগ করে জেনিটিক্যালি মডিফাইড কিলার মশা। এই পদ্মতিতে মশার জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশেষ প্রকৌশলে তৈরি কিলার মশা মাঠে নামায় দেশটি। ২০১৭ সালে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রকৃতিতে কিলার মশা ছাড়ার সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করে মার্কিন কর্র্তৃপক্ষ। সেবার ওয়াশিংটন ডিসিসহ যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি অঙ্গরাজ্যে এই মশা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। দেশটির ক্যানটাকিভিত্তিক বায়োটেক কোম্পানি ‘মসকিউটোমেট’ এ ধরনের কিলার মশা উৎপাদন করছে। তাদের প্রকল্পে পুরুষ মশাকে মশা মারার কীটনাশকবাহী হিসেবে তৈরি করা হয়। এসব মশা যখন নারী মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন মশার ডিম ফোটে না। এ নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চালানো হয়েছে।

জেনেটিক্যালি মডিফাইড কিলার মশাকে ‘বন্ধু মশা’ হিসেবেও ডাকা হয়। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে ১৬ বছর ধরে গবেষণার পর প্রথমবারের মতো এ ধরনের মশা উৎপাদন করা সম্ভব হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রও এই পদ্মতি নিয়ে গবেষণা শুরু করে। এই পদ্ধতিতে জিন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে মশার কোষে জিন প্রবেশ করিয়ে এমন কিছু জেনেটিক পরিবর্তন ঘটানো হয় যার ফলে এর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বেঁচে থাকতে পারে না।

প্রকৃতি থেকে এডিস মশার সংখ্যা কমিয়ে ফেলতে ব্রিটেনে অক্সিটেক নামের একটি বায়োটেক কোম্পানি ২০০২ সাল থেকে এই প্রকল্প নিয়ে গবেষণা শুরু করে।

অক্সিটেকের বিজ্ঞানীরা বলছেন, ল্যাবরেটরিতে জন্ম দেওয়া এসব ‘বন্ধু মশা’ যখন প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হয় তখন পরিবেশে থাকা নারী এডিস মশার সঙ্গে মিলিত হলে যেসব মশার জন্ম হয় সেগুলো বেঁচে থাকতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে এডিস মশার সংখ্যা কমতে থাকে। অক্সিটেকের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছেÑ ব্রাজিল, পানামা ও কেম্যান আইল্যান্ডের কোনো কোনো অঞ্চলে এই পদ্ধতিতে এডিস মশার সংখ্যা ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত