জেলার সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশকারী চার সাংবাদিকের নাম পুরনো ৯টি মামলার অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে এক দিনে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে ছয়টি মামলায়। একাধিক মামলায় সাংবাদিকদের আসামি করার বিষয়টি বাদীরাই জানেন না। সাংবাদিকদের অভিযোগ, ফেনী থেকে প্রত্যাহার হওয়ার আগে পুলিশ সুপার (এসপি) জাহাঙ্গীর আলম সরকার অভিযোগপত্র দিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের বাধ্য করেন।
জেলা পুলিশের বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, নুসরাত হত্যার ঘটনায় সংবাদ প্রকাশে ক্ষিপ্ত হয়ে এসপি জাহাঙ্গীর ফেনী ছাড়ার আগেই কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। কয়েকজন সাংবাদিকের নামসংবলিত একটি তালিকা সংশ্লিষ্ট থানার ওসিদের ধরিয়ে দিয়ে বিভিন্ন তদন্তাধীন মামলায় সাংবাদিকদের নাম অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন তিনি। কয়েকজন ওসি কৌশলে এড়িয়ে গেলেও অন্যরা বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের (এসিআর) ভয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলে বাধ্য হন। ১২ মে রাতে বদলির আদেশ আসার পর জরুরি ভিত্তিতে ওসিদের ডেকে চাপ দিয়ে কয়েকটি অভিযোগপত্র তৈরি করান। পরের দিন তা দাখিলে বাধ্য করেন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ওসি জানান। এমনকি বিষয়টি গোপন রাখতে তিনি কোর্ট পরিদর্শকসহ অন্যদের নির্দেশ দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নথি ঘেঁটে জানা যায়, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ফেনী মডেল থানায় তিনটি, সোনাগাজী মডেল থানায় দুটি, দাগনভূঞা থানায় দুটি ও ছাগলনাইয়া থানায় দুটি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা হয়েছে। সবগুলো মামলায় স্থানীয় দৈনিক ফেনীর সময় ও সাপ্তাহিক আলোকিত ফেনী সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন, বাংলানিউজ স্টাফ রিপোর্টার ও সাপ্তাহিক হকার্সের বার্তা সম্পাদক সোলায়মান হাজারী ডালিম, দৈনিক অধিকার প্রতিনিধি ও অনলাইন পোর্টাল ফেনী রিপোর্ট সম্পাদক এস এম ইউসুফ আলী এবং দৈনিক সময়ের আলো প্রতিনিধি ও দৈনিক স্টার লাইনের স্টাফ রিপোর্টার মাঈন উদ্দিন পাটোয়ারীর নাম রয়েছে।
মামলাগুলোর নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, সাংবাদিকদের নাম সংযুক্ত করা ৯টি মামলার মধ্যে ৬টির অভিযোগপত্র এক দিনেই আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছাগলনাইয়া থানার একটি, ফেনী মডেল থানার তিনটি ও সোনাগাজী মডেল থানার দুটি মামলার অভিযোগপত্র ১২ মে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি মামলাগুলোর মধ্যে ছাগলনাইয়া থানার একটিতে ৯ মে ও দাগনভূঞা থানার একটিতে ১০ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। সবগুলো মামলাই ২০১৮ সালের বিভিন্ন সময়ে করা। একটি মামলার অভিযোগপত্রের অনুলিপি পাওয়া যায়নি।
২০১৮ সালের ২৭ অক্টোবর জনৈক ওমর ফারুক ১৭ জনকে আসামি করে দাগনভূঞা থানায় একটি মামলা করেন। মামলার বাদী ওমর ফারুকের দাবি, তাকে না জানিয়ে ১০ মে ৩৭ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। এ ছাড়া ছাগলনাইয়ায় কর্মরত দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ১৭ মার্চ আইসিটি আইনে দায়েরকৃত মামলার বাদী মজিবুল হকের সঙ্গে একই বছরের ৮ জুলাই সমঝোতা হয় বিবাদীদের। অথচ সমঝোতা হওয়া সত্ত্বেও পুলিশ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চলতি বছরের ২৭ মে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়।
ফেনী রিপোর্টের সম্পাদক এস এম ইউসুফ আলী জানান, দৈনিক অধিকার পত্রিকায় বেশ কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে কিছু পুলিশ কর্মকর্তা তাকে ‘কথিত গায়েবি’ মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। পরে জানতে পারেন তাকে তদন্তাধীন ৮ থেকে ১০টি মামলায় অভিযোগপত্রে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
দৈনিক ফেনীর সময় সম্পাদক শাহাদাত হোসেন জানান, নুসরাত হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমের পাশাপশি আঞ্চলিক পত্রিকাগুলোতেও সংবাদ পরিবেশিত হয়। নৃশংস এ হত্যাকা-ে এসপি-ওসির কর্তব্যে অবহেলা নিয়ে সংবাদ পরিবেশিত হলে ক্ষুব্ধ হয়েই পুলিশ সুপার তাকে মামলায় জড়িয়ে দেন।
ফেনী প্রেস ক্লাবের সভাপতি আসাদুজ্জামান দারা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগপত্রকে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ ও ‘নিন্দনীয়’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘পুলিশ-সাংবাদিক একে অপরের শত্রু নয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা পুলিশ ও সাংবাদিকদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করবে। পেশাদার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পুলিশের এমন বিরূপ আচরণ কাম্য নয়।’
বিষয়টি সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানার কথা বলে ফেনীর বর্তমান এসপি খোন্দকার নূরুন্নবী বলেন, ‘যেসব মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে, সে ক্ষেত্রে আমার করণীয় নেই। তবে আগামীতে যাতে কোনো সাংবাদিক হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে খেয়াল রাখব।’
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রত্যাহার হওয়া ফেনীর সাবেক পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
গত ৬ এপ্রিল মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুন দিয়ে হত্যার ঘটনাকে সোনাগাজী মডেল থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন আত্মহত্যা বলে প্রচার করেন। তার পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রতিবেদন দেন পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায়ও অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ কয়েকজনকে আসামি না করতে চেষ্টা করেন এসপি-ওসি। কিন্তু সাংবাদিকদের দৃঢ় অবস্থানে ক্রমেই ঘটনার জট খুলতে থাকে। একপর্যায়ে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) হস্তান্তর করা হলে ঘটনায় জড়িতরা গ্রেপ্তার হয়। অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হয়ে বরখাস্ত হন ওসি মোয়াজ্জেম। কর্তব্যে অবহেলার দায়ে প্রত্যাহার হয়ে সদর দপ্তরে সংযুক্ত হন এসপি জাহাঙ্গীর।
