জমি নিয়ে বিরোধ

রংপুরে বিধবাকে হত্যার পর আত্মহত্যা প্রমাণচেষ্টা

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০১৯, ০৩:০০ এএম

জমিকেন্দ্রিক বিরোধের জেরে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের ধলোগাছ গ্রামে লাইলি বেগম (৫৫) নামের এক বিধবাকে হত্যার পর আত্মহত্যা বলে চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্বজনদের অভিযোগ, লাইলিকে হত্যার পর দড়িতে ঝুঁলিয়ে অপমৃত্যুর মামলা করে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তার ভাই মাহবুবার। তবে মাহবুবার সে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় লাইলির ছেলে লাভলু মিয়া (২৫) জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

ছেলে, স্বজনদের অভিযোগ ও স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, লাইলি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমিতে স্বামীর অবর্তমানে সন্তানকে নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। জীবদ্দশায় স্বামী নজির হোসেনও লাইলিকে ১০ শতক জমি দিয়ে গিয়েছিলেন। লাইলির জমির ওপর লোভ পড়ে তার ভাই মাহবুবার রহমানের। তিনি সুযোগ বুঝে ১০ শতকের মধ্যে ৫ শতক জমি জাল দলিলের মাধ্যমে দখল করে নেন। লাইলি নিজ নামে থাকা ২২ শতক আবাদি জমি বিক্রির কথা বললে তার ভাই মাহবুবার ও ভাতিজা সোহেল রানা বাধা দেন। ওই জমি কম মূল্যে বিক্রি করার চাপ দেন তারা। এমনকি ওই ২২ শতক জমি লিখে দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করতেন। কিন্তু ভাই-ভাতিজাকে জমি লিখে দিতে চাননি।

স্থানীয় ও স্বজনদের অভিযোগ, গত ২৫ এপ্রিল রাতে ভাতিজা সোহেল রানা তার বাবার কথা বলে তাদের বাড়িতে ডেকে নিয়ে যান লাইলিকে। ওই সময় লাইলির ছেলে লাভলু নিজ ঘরে শুয়ে ছিলেন। ভোরের দিকে তার ঘুম ভাঙলে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে লাভলু মিয়া মামা মাহবুবার রহমান, মামাতো ভাই সোহেল রানাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন। তারা তাকে জানান, তার মা হয়তো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে গেছেন। এ কথা বলে তারা সেখান থেকে সটকে পড়েন। কিন্তু কিছু সময় পরও লাইলি বাড়িতে না আসায় ছেলের সন্দেহ দানা বাঁধে। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে তিনি হঠাৎ মাহবুবারের বসতবাড়ির তামাক রাখা ঘরে মাকে ফাঁসিতে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। এ সময় লাভলু সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলে তারাগঞ্জ থানার এসআই মশিউর রহমান যান। পরে লাশের সুরতহাল রিপোর্ট করেন। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। লাশের ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করে থানা পুলিশ।

লাভলু ও স্বজনদের দাবি, মাহবুবার রহমান ও তার ছেলে সোহেল রানা প্রভাবশালী হওয়ায় ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। তারা লাইলিকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে তিনি আত্মহত্যা করেছেন মর্মে গত ২৬ এপ্রিল অপমৃত্যুর মামলা করেন।

মায়ের হত্যার বিচারের দাবিতে কয়েক দফায় থানায় অভিযোগ কিংবা মামলা দায়ের করতে গেলেও পুলিশ তার কথায় সাড়া দেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন লাভলু মিয়া। এ বিষয়ে লাভলুর খালাতো ভাই শাহ আলম বলেন, ‘জমি লিখে না দেওয়ায় খালাকে জীবন দিতে হলো। তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুললে তো লাভলুকেও শেষ করে দেবে। ঘটনাটা সত্যিই। অমার (ওদের) টাকা আছে। আর লাভলু তো গরিব মানুষ। কী আর করবে। সে জন্য আমরা চুপচাপ আছি।’

এ বিষয়ে সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয় এক নারী বলতে থাকেন, ‘কত সাংবাদিক আসিল আর গেইল, কাজের কাজ তো আর হয় না। খুনিরা তো বাঁচিল। অমার (মাহাবুবারদের) টাকার কাছোত সব সাংবাদিক বেচা হয়া যাইতোছে।’

আবদুল মোন্নাফ নামের এক প্রতিবেশী দেশ রূপান্তরকে জানান, লাইলি বেগম তার জীবদ্দশায় মানসিক রোগী ছিলেন না। তার চলাফেরায় এমন আচরণ তারা দেখেননি। তিনি অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। একই মন্তব্য করেন এলাকার একাধিক নারী বাসিন্দা।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য আবদুল জলিল মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি এলাকায় খোঁজখবর নিয়ে দেখেছি, তিনি (লাইলি) কোনো মানসিক কিংবা প্রতিবন্ধী রোগী ছিলেন না। আমি কাউকে কোনো মানসিক কিংবা প্রতিবন্ধীর প্রত্যয়নপত্র দেব না।’ লাইলির ভাই মাহাবুবার রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার কথা অস্বীকার করেন।

তারাগঞ্জ থানার সাবেক এসআই মশিউর রহমান (যিনি বর্তমানে প্রশিক্ষণে আছেন) বলেন, ‘আমিই লাশের সুরতহাল রিপোর্ট করেছি। এ ব্যাপারে মৃতের ভাই বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন। লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। আমি ট্রেনিংয়ে যাব। তাই আমার কাছে এখন মামলাটি নেই।’

তারাগঞ্জ থানার বর্তমান এসআই কার্ত্তিক চন্দ্র মহন্ত মুঠোফোনে দেশ রূপান্তরকে জানান, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তাদের হাতে পৌঁছায়নি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। সে অনুযায়ীই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত