গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল পল্লীতে অগ্নিসংযোগ-লুটপাট ও তিন সাঁওতালকে হত্যার মামলায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দেওয়া অভিযোগপত্র নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে স্থানীয় সাঁওতালদের সঙ্গে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিকদের সংঘর্ষ এবং তার জের ধরে সাঁওতাল পল্লীতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় হয়। ঘটনার সময়ে ভাইরাল হওয়া ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায় সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে পুলিশ। গোবিন্দগঞ্জের সাবেক এক সংসদ সদস্য এবং তার সহযোগীদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয় তখন। ওই ঘটনার দুটি আলাদা মামলায় রবিবার পিবিআই যে অভিযোগপত্র দিয়েছে তাতে ৯০ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। কিন্তু অভিযোগপত্রে পুলিশ এবং সাবেক সংসদ সদস্যসহ চিহ্নিত দুর্বৃত্তদের নাম না থাকায় সংবাদ সম্মেলন করে তা প্রত্যাখ্যান এবং বিক্ষোভ করেছে গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালরা।
গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালপল্লীতে হামলার পর আল-জাজিরা টেলিভিশনে প্রচারিত প্রতিবেদনের ভিডিওতে দেখা যায়, সাঁওতালদের বসতির পাশে দাঁড়িয়ে একদল পুলিশ গুলি ছুড়ছে ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করছে। এক পর্যায়ে মাথায় হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা এক পুলিশ সদস্য সাঁওতালদের বাঁশ ও ছনের তৈরি ঘরে আগুন ধরিয়ে দিলে মুহূর্তেই আশপাশের ঘরগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে সাধারণ পোশাকের কয়েকজনকেও দেখা যায়। এসব ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে দেশে-বিদেশে তুমুল সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। ঘটনাটি তদন্ত করে পুলিশের মহাপরিদর্শকের তরফ থেকে ২০১৭ সালের মার্চে একটি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। তাতে সরাসরি অগ্নিসংযোগে যুক্ত পুলিশের দুই সদস্যকে চিহ্নিত করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাশাপাশি ঘটনার দিন সেখানে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৫৮ সদস্যকে প্রত্যাহার করার কথাও বলা হয় পুলিশের ওই প্রতিবেদনে। ফলে, এখন পিবিআইয়ের দাখিল করা অভিযোগপত্রে ওই পুলিশ সদস্যদের নাম না থাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক নয় কি?
গোবিন্দগঞ্জের রংপুর চিনিকলের আওতাধীন খামারে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারী, বহিরাগত সন্ত্রাসী ও পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় সাঁওতালদের সংঘর্ষ হয়। সাঁওতালদের অভিযোগÑ পুলিশ, প্রশাসনসহ স্থানীয় সন্ত্রাসীরা সাঁওতালদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের জন্যই ওই হামলা চালায়। সেদিন সাঁওতালদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে আটজন পুলিশ সদস্য তীরবিদ্ধ হন এবং চারজন সাঁওতাল গুলিবিদ্ধ হন। গুলিবিদ্ধ শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু মারা যান। এই সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে সাঁওতালদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হলে বসতিহারা সাঁওতালরা খোলা আকাশের নিচে তাঁবু টানিয়ে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হন। এমনকি সাঁওতাল শিশুদের স্কুলও পুড়িয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা। এর প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে সারা দেশ।
রংপুর চিনিকল স্থাপনের জন্য আখ চাষ করতে ১৯৬২ সালে গোবিন্দগঞ্জের বাগদা ফার্ম এলাকার ১ হাজার ৮৪০ একর জমি রিকুইজিশন করা হয়। এসব জমি ছিল স্থানীয় সাঁওতাল ও বাঙালিদের ভোগদখলীয় সম্পত্তি। রিকুইজিশন চুক্তি অনুযায়ী, আখ চাষ করা না হলে, আগের মালিকদের ক্ষতিপূরণসহ জমি ফেরত দিতে হবে। কিন্তু ২০০৪ সালে রংপুর চিনিকল বন্ধ হয়ে গেলে স্থানীয় প্রভাবশালীরা সেখানে চাষাবাদ শুরু করেন। এদিকে, জমি ফেরত পাওয়ার চেষ্টায় ক্ষতিগ্রস্তরা আন্দোলন শুরু করলে তাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ নানা হয়রানি শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসের ওই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটে।
এদিকে, দুই বছর আট মাস আগের ওই সংঘর্ষের সময় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে আট পুলিশ সদস্যকে আহত করার আরেকটি মামলায় ৩৯ জন সাঁওতালকে আসামি করে আলাদা অভিযোগপত্র দাখিল করায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাঁওতাল নেতারাসহ মানবাধিকারকর্মীরা। এমন সংঘাত-সহিংসতা ও প্রাণহানির পর নানা তথ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মামলার অভিযোগপত্র থেকে দোষী ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়া যেমন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না তেমনি নতুন করে উত্তেজনা ছড়াতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়াও ঠিক হবে না। কেননা, তাতে ইতিমধ্যেই বিপদগ্রস্ত সাঁওতালদের জীবন ও জীবিকা আরও বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে। যে অপরাধ ইতিমধ্যেই প্রকাশিত ও প্রমাণিত; তা আমলে না নিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলে, সংকট বাড়বে বৈ কমবে না। তাই সবার জন্য ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই গোবিন্দগঞ্জ কাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
