বিমানে পাইলট নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ

এমডিসহ পাঁচ কর্মকর্তাকে দুদকের জেরা

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০১৯, ০১:০৮ এএম

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাইলট নিয়োগে দুর্নীতি অনুসন্ধানে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)সহ ৫ কর্মকর্তাকে জেরা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। গতকাল সোমবার দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তাদের জেরা করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ক্যাপ্টেন ফারহাত হাসান জামিল বলেন, বিমানের পাইলট নিয়োগে কোনো দুর্নীতি হয়নি। গতকাল সোমবার দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) প্রধান কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। কমিশনের উপপরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য জানান, ক্ষমতার

অপব্যবহার, ঘুষ নিয়ে ক্যাডেট পাইলট নিয়োগসহ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানে ফারহাত জামিলসহ পাঁচ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের জেরা করেছেন দুদকের সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম। সোমবার জিজ্ঞাসাবাদ করা অপর কর্মকর্তারা হলেনÑ বিমানের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা বিনীত সুধ, পরিচালক (বিপণন ও বিক্রয়) আশরাফুল আলম ও পরিচালক (পরিকল্পনা) মাহবুব জামান খান, বিমানের প্রশিক্ষণ বিভাগের প্রধান ফজল মাহমুদ চৌধুরী।

এর আগে গত রবিবার বিমানের পরিচালক (প্রশাসন) পার্থ কুমার পণ্ডিত, পরিচালক (প্রকৌশল ও উপাদান ব্যবস্থাপনা) সাজ্জাদুর রহিম, পরিচালক (গ্রাহক সেবা) মমিনুল ইসলাম ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) বুশরা ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আজ মঙ্গলবার বিমানের সাবেক এমডি আবদুল মুনীম মোসাদ্দিক আহম্মেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা রয়েছে। বিমানের সাবেক এই প্রধান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।

দুকের অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণীতে বলা হয়েছে, ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক এমডি মোসাদ্দিক আহমেদ ও ডিএফও ফারহাত জামিলের (বর্তমান ভারপ্রাপ্ত এমডি) ক্ষমতার অপব্যবহার করে পাইলট নিয়োগসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাপক ঘুষ-বাণিজ্য করেছেন।’ এই অবস্থায় কমিশনকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন।

দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিমানের নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। নিয়োগ কমিটির সব সদস্যের সিদ্ধান্ত ছাড়া নিয়োগ বা এ জাতীয় বড় ধরনের অপকর্ম অসম্ভব। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনেও পাইলট নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে বিমান পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্য ও বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) ২-৩ জন প্রভাবশালী নেতার হস্তক্ষেপ থাকার কথা বলা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে নিয়োগ কমিটির সদস্যের কাছ থেকে এদের নাম ও নিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা জানতে চাওয়া হয়েছে।

কমিশনের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অভিযোগ অনুসন্ধানে পাইলট নিয়োগের বিধিমালা, ২০১৮ সালে পাইলট নিয়োগের অনুমোদন সংক্রান্ত রেকর্ড, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল, সাইকোমেট্রিক টেস্টের ফলাফল, প্রার্থীদের আবেদন বাছাই কমিটির নামসহ নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে দেখা হয়েছে। পাইলট নিয়োগ ছাড়াও বিমানের বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদক থেকে চারটি টিম একযোগে কাজ করছে। অপর তিন টিমের একটির নেতৃত্বে রয়েছেন সিনিয়র উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিন, সহকারী পরিচালক মো. সালাহউদ্দিন ও আতাউর রহমান। এ চার টিমের কাজ সমন্বয় করছেন দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বিমানে চলছে চরমমাত্রায় স্বেচ্ছাচারিতা। ইচ্ছা হলেই কিছু পাইলট ফ্লাইট পরিচালনা না করার হুমকি দিচ্ছেন। কিছুদিন আগে ডিএফও নিয়োগ বাতিলের দাবিতে একযোগে ৩ সিনিয়র পাইলট লন্ডন ফ্লাইট না করার জন্য নিজেদের রহস্যজনক ‘সিক’ ঘোষণা করেন। এর মধ্যে ক্যাপ্টেন শোয়েব চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনফিট অবস্থায় ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনার অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে।

গত ৮ এপ্রিল দৈনিক দেশ রূপান্তরে ‘ভাতিজাপাগল বিমান এমডি’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যা আমলে নিয়েছে দুদক। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভাতিজাকে নিয়োগ দিতে সাবেক এমডি ও সিইও এম মোসাদ্দিক আহমেদ একেক করে ১৩ ধরনের অনিয়ম করেছেন। ভাতিজা মোক্তাদির আহম্মদকে সুযোগ দিতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর তাতে সংশোধনী এনে শিক্ষাগত যোগ্যতা হ্রাস করেন। শিথিল বিজ্ঞপ্তির সুযোগে এমডির ভাতিজাসহ ৩০ জন আবেদন করেন। তাদের মধ্যে ১৩ জন চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।

দুদকে প্রাপ্ত অভিযোগ অনুযায়ী সাবেক এমডি ডেলিগেশন অব পাওয়ারের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করেছেন। শুধু তাই নয়, পছন্দের প্রার্থী ও একটি গ্রুপকে অবৈধ সুবিধা দিতে বাছাই কমিটির আহ্বায়ককে না জানিয়ে পুরো নিয়োগের বাছাই কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে।

এদিকে বিমানে পাইলট নিয়োগে দুর্নীতির বিষয়ে যুগ্ম সচিবের তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, ‘বিমানে পাইলট নিয়োগের আগে পরিচালনা পর্ষদের কাছ থেকে শূন্যপদের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বয়স নির্ধারণে বিমানের প্রচলিত নিয়মনীতি মানা হয়নি। নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিজের ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা দিয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সংশোধন করে এমডির ভাতিজাসহ কমপক্ষে ৩০-৩২ প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে বিশেষ সুবিধা দিয়েছেন। প্রার্থীদের প্রাথমিক বাছাইয়ের কাজটিও বিধি মোতাবেক হয়নি। কোনো কোনো ব্যক্তি ও পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বিমানের অপারেশন ম্যানুয়াল অনুযায়ী নিয়োগের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি।’

এছাড়া লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মানবণ্টন ম্যানুয়াল অনুযায়ী না করে মৌখিক পরীক্ষায় শতকরা ৫০ নম্বর রেখে বিশেষ প্রার্থীদের সুবিধা দেওয়া হয়। ক্যাডেট পাইলট নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম সৃষ্টির জন্য নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা ছিল যুগ্ম সচিবের করা তদন্ত প্রতিবেদনে। 

অনুসন্ধান দলের একজন কর্মকর্তা জানান, এর সবগুলো বিষয়ে উপস্থিত সবাইকে জেরা করা হয়েছে। এখানেও তাদের যার যেমন ইচ্ছা জবাব দিয়েছেন। তাদের জবাব সন্তোষজনক নয় মনে করছেন দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা।

বিমানের অনিয়ম অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত ২ মে বিমানের ১০ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বরাবর চিঠি পাঠায় দুদক। এসবির বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) এবং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওসি (ইমিগ্রেশন) বরাবর চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়। যাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় তারা হলেন বিমানের সাবেক এমডি আবদুল মুনীম মোসাদ্দিক আহম্মেদ, কনিষ্ঠ গ্রাউন্ড সার্ভিস কর্মকর্তা বিমান শ্রমিক লীগের সভাপতি ও বিমানের সিবিএ নেতা মশিকুর রহমান, গ্রাউন্ড সার্ভিস পরিদর্শক জি এম জাকির হোসেন, মিজানুর রহমান ও এ কে এম মাসুম বিল্লাহ, বাণিজ্যিক পরিদর্শক রফিকুল আলম ও গোলাম কায়সার আহমেদ, কনিষ্ঠ বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মারুফ মেহেদী হাসান এবং বাণিজ্যিক কর্মকর্তা জাওয়েদ তারিক খান ও মাহফুজুল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত