ঈদুল আজহা সামনে রেখে পশু ব্যবসায়ীরা হিসাব কষছেন লাভ-লোকসানের। বিগত তিন কোরবানির ঈদে লোকসানের মুখে পড়েছিলেন অনেকে। তাই এবার হাটে পশু আনার ক্ষেত্রে হিসাব-নিকাশ করছেন তারা। তবে এরই মধ্যে অনেক ব্যবসায়ী তাদের খাটালে গরু তোলা শুরু করে দিয়েছেন। গতকাল সোমবার রাজধানীর সবচেয়ে বড় পশুর হাট গাবতলীতে গিয়ে এসব তথ্য জানা যায়।
এদিকে গত বছরের লোকসানে এবার মহাজনরা টাকা ছাড়ছেন না বলে জানিয়েছেন একাধিক গরুর বেপারি। তারা আরও জানান, ভারত থেকে বৈধভাবে না আসায় এবার কোরবানির গরুর দাম বেশি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বাজারে এখন কসাইদের কাছে বিক্রির জন্য গরু আছে। কোরবানির পশু আসবে চাঁদ দেখে। তারা আরও জানান, পশুখাদ্যের দাম বেড়ে গেছে। সে অনুপাতে দাম নেই পশুর। এ ছাড়া বিরোধী বিভিন্ন দলের বিত্তশালী নেতারা কারাগারে থাকায় কাক্সিক্ষতসংখ্যক গরু বিক্রি হওয়া নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে।
পশু ব্যবসায়ী ইউনুছ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোরবানির ঈদ সামনে রেখে অনেক মহাজন কোটি কোটি টাকার পুঁজি খাটান। পরিচিত পশু বেপারিদের কাউকে ১০ লাখ, ২০ লাখ কিংবা কয়েক কোটি টাকা দিয়ে থাকেন। কোনো মহাজন নির্দিষ্ট সুদের ওপর ধার দেন। কেউ লাভের অর্ধেক, আবার কেউ লাভ ও লোকসান দুটোতেই রাজি থাকেন। ওই টাকা নিয়েই আমাদের মতো অনেক বেপারি দেশের বিভিন্ন এলাকা, যেমন উত্তরাঞ্চল ও
দক্ষিণাঞ্চলের সীমান্ত এলাকা থেকে গরু সংগ্রহ করে হাটে তুলি। কিন্তু এবার সেই মহাজনদের কাছ থেকে এখনো কোনো টাকা পাচ্ছি না।’
গরুর বেপারি রোকনুজ্জামান জানান, গত বছর লাখ টাকায় গরু কিনে হাটে তুলে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এতে অনেক বেপারি লোকসান গুনে মহাজনদের টাকা না দিয়েই পালিয়ে গেছেন। সেই আশঙ্কা থেকে এবার অনেক মহাজন গরু কেনার টাকা ছাড়ছেন না।
গরুর বেপারি রিয়াজ হোসেন ৩০ বছর ধরে গাবতলীতে গরুর ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, ‘দেশে শান্তি নাই। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা জেলে। গরু কিনবে কে?’ তার কথা শুনে ভিন্ন মত দেন গাবতলীর মারফত আলী। তিনি বলেন, ‘এবার শুধু গরু না, গরুর দড়িও বিক্রি করবে বেপারি ও কসাইরা। ১২ আগস্ট কোরবানির ঈদ, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী ও একই সময়ে ভান্ডারিয়ার ওরস শরিফ। তাই এবার গাবতলীতে ঈদের আগেই সব পশু বিক্রি হয়ে যাবে।’
গাবতলীর হাটে প্রতি বছরই সবচেয়ে বেশি দামে গরু তোলেন হাজি আলী আকবর সুমন। এবারও তিনি আট মাস আগে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আনা প্রায় ৮০টি গরু তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার কখনো লোকসান হয় না। বেশি লাভের আশা না করে সময়মতো বেচে দিই। যারা বেশি লাভের আশা করে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত গরু রাখেন, তারাই ধরা খেয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘গরুর খাবার থেকে শুরু করে পরিবহন খরচ যেভাবে বেড়েছে, তাতে গরুর দাম বাড়বেই। গতবারের তুলনায় এবার গরুর দাম আরও চড়া হবে।’ তার মতে, ভারতীয় সীমান্ত খুলে না দিলে গরুর দাম আরও বাড়বে। তার তথ্যে ভিন্নমত পোষণ করে ব্যবসায়ী সালাম জানান, গ্রামে গ্রামে এখন গরুর খামার। সবাই কোরবানির জন্য গরু বিক্রি করতে মুখিয়ে আছেন। এসব মৌসুমি ব্যবসায়ী হাটে গরু তুললে দাম স্বাভাবিক থাকবে।
একাধিক ব্যবসায়ী জানান, অনেক মহাজনের প্রতিনিধিরা দেশের বিভিন্ন জেলায় গরু সংগ্রহে নেমেছেন। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গরু সংগ্রহ করছেন। অনেকে ভারত থেকে চোরাইপথে গরু সংগ্রহ করছেন। সেই গরু স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ‘কাস্টম’ করিয়ে (হাসিল অফিসের কাগজপত্র তৈরি করে) দেশীয় গরু বানাচ্ছেন। এই সিন্ডিকেটের ব্যবসায়ীরা ঠিক সময়মতো সেসব গরু ঢাকায় আনবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান, ভারতের অনেক ব্যবসায়ী এখন গাবতলী গরুর হাটে রয়েছেন। এখানকার বাজারদর পর্যবেক্ষণ করে তারা বিভিন্ন কৌশলে গরু আনার ব্যবস্থা করছেন। এ বিষয়ে ব্যবসায়ী হাজি আলী আকবর সুমন বলেন, ‘ভারতের একজন ব্যবসায়ী কয়েক দিন ধরে আমার সঙ্গেই ছিলেন। কিন্তু কোনোভাবেই সেখান থেকে গরু আনতে পারছি না। ভারতের যেসব গরু আমার কাছে রয়েছে, সেসব গরু আট মাস আগেই এনে রেখেছি। তবে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কিছু কিছু পশু আসা শুরু হয়েছে।’
গরু বেপারি মোসলেম উদ্দিন জানান, গাবতলী হাটের ডাক বেশি, তাই গরুর হাসিল হিসেবে অনেক টাকা গুনতে হয় পশু ক্রেতাকে। তাই অনেকে এই হাট থেকে গরু কিনতে আগ্রহী হন না। তিনি আরও জানান, এখন হাটের বিভিন্ন খাটালে যেসব গরু-মহিষ দেখা যাচ্ছে, সেসবের ৯০ শতাংশই ‘কসাই গরু’ (মাংস বিক্রির জন্য); কোরবানির গরু আসবে চাঁদ দেখার পর থেকে।
