ফেরিতে স্কুলছাত্রের মৃত্যু

জুনিয়রকে দিয়ে সিনিয়র কর্মকর্তার তদন্ত

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০১৯, ০৩:৪০ এএম

যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর মণ্ডলের অপেক্ষায় থাকা ফেরিতে স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি ত্রুটিপূর্ণ বলে অভিযোগ উঠেছে। গত সোমবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে একই মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও ১৭তম বিসিএসের কর্মকর্তা শাহনওয়াজ দিলরুবা খানকে। অথচ আবদুস সবুর ম-ল ১৩তম বিসিএসের কর্মকর্তা। প্রশাসনিক বিধিবিধান অনুযায়ী, সমপর্যায়ের বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয় বলে জনপ্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তদন্ত কমিটি গতকাল মঙ্গলবার থেকেই কাজ শুরু করেছে। কমিটি আজ বুধবার কাঁঠালবাড়ী ১ নম্বর ফেরিঘাটে ‘কুমিল্লা’ ফেরিতে শুনানির আয়োজন করেছে। ওই শুনানিতে হাজির থাকার জন্য মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ওয়াহিদুল ইসলামকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিসিকে তিনটি জাতীয় দৈনিকের স্থানীয় প্রতিনিধিসহ উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। শুনানিস্থলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পুলিশ সদস্যদের রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটি ফেরি চালানোর দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট সবাইকে উপস্থিত রাখার জন্য বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছে।

তদন্ত কমিটি গোপালগঞ্জ সার্কিট হাউসে অবস্থান করে আগামীকাল বৃহস্পতিবার নড়াইলের কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে দ্বিতীয় শুনানি করবে। দ্বিতীয় শুনানিতে অ্যাম্বুলেন্সের চালক, অ্যাম্বুলেন্সে অবস্থানরত চিকিৎসক, নিহত তিতাস ঘোষের আত্মীয়-স্বজনকে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান শাহনওয়াজ দিলরুবা খান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করব। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলব। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’ 

গত বৃহস্পতিবার মাদারীপুর জেলার কাঁঠালবাড়ীর ১ নম্বর ফেরিঘাটে ‘কুমিল্লা’ নামের ফেরিটি ভিআইপি আসার জন্য অপেক্ষা করছিল। ‘ভিআইপি’ অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের পরিচালক ও ১৩তম ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা, যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর মণ্ডলের আসার বার্তা দিয়েছিলেন মাদারীপুর জেলার ডিসি। ওই সময় খুলনা থেকে রোগীবাহী একটি অ্যাম্বুলেন্স রাত ৮টায় কাঁঠালবাড়ী ফেরিঘাটে পৌঁছায়। রোগীর আত্মীয়-স্বজন অপেক্ষমাণ ফেরিটি ছাড়ার জন্য ঘাট কর্র্তৃপক্ষকে বারবার অনুরোধ করার কথা জানায়। কিন্তু ঘাট কর্র্তৃপক্ষ ওই ভিআইপি না আসা পর্যন্ত ফেরিটি ছাড়েনি। তিতাসের স্বজনদের ভাষ্য, রাত ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ৩ ঘণ্টা ফেরিটি ভিআইপির জন্য অপেক্ষা করে। এতে অ্যাম্বুলেন্সের রোগী নড়াইলের কালিয়া উপজেলার কালিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তিতাসের মৃত্যু হয়।

এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ‘ভিআইপি কালচার’ বন্ধ করার জন্য ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি) বিবৃতি দেয়। একপর্যায়ে ঘটনাটি তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। কমিটি গঠনের পরও প্রতিক্রিয়া চলছে। প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে বিষয়টি নিয়ে গত দুদিন ধরে আলোচনা চলছে।

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা বিশেষ করে জুনিয়র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জনপ্রশাসনে বর্তমানে ৮৫২ জন যুগ্ম সচিব রয়েছেন। অতিরিক্ত সচিব রয়েছেন ৪৭৮ জন। এসব কর্মকর্তাকে যদি ভিআইপি মর্যাদা দেওয়া হয়, তাহলে সারা দেশের ফেরি, লঞ্চ, বাস, ট্রেন, বিমান সার্ভিসে অচলাবস্থা দেখা দেবে। এ ছাড়া অন্যান্য সার্ভিসের ‘বড় কর্তারা’ তো রয়েছেনই। একজন যুগ্ম সচিবের জন্য ফেরি তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে পারে না। এখানে সংশ্লিষ্ট যুগ্ম সচিবের সমস্যা থাকতে পারে। একইভাবে ফেরিঘাটেরও কোনো সমস্যা থাকতে পারে। তাদের নিজেদের দোষ যুগ্ম সচিবের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের হওয়া উচিত। কিন্তু তদন্ত কমিটি ত্রুটিপূর্ণ। তদন্ত কমিটি একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্ব হলে কোনো প্রশ্ন উঠত না।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গঠনের অফিস আদেশে বলা হয়, ‘অতিরিক্ত সচিবের জন্য বিলম্ব: প্রাণ গেল অ্যাম্বুলেন্সের রোগীর’ শিরোনামে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত সংবাদের বিষয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিষয়টি উল্লেখ করে একজন উপসচিব জানান, একটা বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত সংবাদই কেন তদন্ত হবে। অন্যান্য মিডিয়ায় কী বলা হয়েছে, টিআইবি কী বলছে, সংশ্লিষ্ট সব কিছুই তদন্ত হওয়া উচিত। একটা টেলিভিশনের সংবাদে ভুল থাকতেই পারে। এ জন্য পুরো বিষয়টি তদন্ত করা দরকার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন যুগ্ম সচিব বলেন, ‘সারা দেশে এক ধরনের সেন্টিমেন্ট (মনোভাব) তৈরি হয়েছে। এই সেন্টিমেন্টের কাছে যুগ্ম সচিব অপরাধী হিসেবে মনে হচ্ছে। কিন্তু কেউ নিহত তিতাস ঘোষের বিষয়টি আলোচনায় আনছেন না। কিশোর তিতাসকে কে মোটরসাইকেল চালানোর অনুমতি দিয়েছে? ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া কিশোরের ড্রাইভিং লাইসেন্সও থাকার সুযোগ নেই। তদন্তে এসব বিষয়ও বের হয়ে আসা উচিত।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদি জুনিয়র কর্মকর্তা দিয়ে সিনিয়র কর্মকর্তার তদন্ত করা হয়, তাহলে তদন্তের বস্তুনিষ্ঠতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত কমিটি গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি খুবই সংবেদনশীল। সারা দেশে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দায়িত্বশীল তদন্তের মাধ্যমে সরকারের সামনেও নিরপেক্ষতা প্রমাণের সুযোগ এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘ভিআইপি কারা, কোন মাপকাঠিতে তারা ভিআইপি হচ্ছেন, তারা কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবেন, তার একটা সীমারেখা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। ভিআইপিরা সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন; এটা খুবই স্বাভাবিক। তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনধারণের জন্য যে মৌলিক বিষয়, তা ভিআইপিদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। নির্ধারিত সীমারেখা লঙ্ঘন করলে কী শাস্তি হবে, তাও স্পষ্ট করা সরকারের দায়িত্ব।’ 

তদন্ত কমিটির অপর সদস্য হলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শাহ হাবিবুর রহমান হাকিম। এ ছাড়াও এই ঘটনা তদন্ত করতে মাদারীপুর জেলা প্রশাসন এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত