অকুপেন্সি সনদে থাকতে চায় ফায়ার সার্ভিস

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০১৯, ০৩:৪১ এএম

বিদ্যমান আইনে নতুন ভবন ব্যবহারের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছ থেকে অকুপেন্সি (বসবাস বা ব্যবহার) সনদ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও এতে নিজেদের অংশগ্রহণ চায় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। এ ছাড়া সংস্থাটি মনে করে, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী বহুতল ভবনের সংজ্ঞা ১০ তলা বা ৩৩ মিটারের ঊর্ধ্বে হলেও তা ছয়তলা হওয়া উচিত। প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ২০১৭’-এ এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে যুক্তি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এসব প্রস্তাব দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর।

বিএনবিসি-২০১৭-এর খসড়ায় অন্তর্ভুক্তের জন্য অধিদপ্তরের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, রাজউক কর্র্তৃক অকুপেন্সি সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নেওয়া অথবা যৌথভাবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং রাজউক থেকে সনদ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া ‘অথরিটি হ্যাভিং জুরিসডিকশন’ শব্দগুলো সংযোজন করে অগ্নিনির্বাপণের ক্ষেত্রে ‘অথরিটি হ্যাভিং জুরিসডিকশন’ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে ঘোষণা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

বহুতল ভবনের সংজ্ঞার বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিএনবিসি- ২০০৬ অনুযায়ী ছয়তলা বা ২০ মিটারের ঊর্ধ্বের উচ্চতাসম্পন্ন ইমারত বহুতল ভবন। ছয়তলা বা ২০ মিটার পর্যন্ত ভবনে স্থানীয় ফায়ার স্টেশনের ইকুইপমেন্টের মাধ্যমে অগ্নিনির্বাপণ সম্ভব। আর ১০ তলা বা ৩৩ মিটার পর্যন্ত ভবনে স্থানীয় ফায়ার স্টেশনের ইকুইপমেন্ট দিয়ে অগ্নিনির্বাপণ সম্ভব নয়। বিএনবিসি-২০০৬ অনুযায়ী ছয়তলা বা ২০ মিটারের ঊর্ধ্ব ভবনের অভ্যন্তরীণ অগ্নিনিরাপত্তা বাধ্যতামূলক। আর বিএনবিসি-২০১৭ অনুযায়ী ১০ তলা বা ৩৩ মিটারের ঊর্ধ্ব ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা বাধ্যতামূলক না থাকায় ভবনগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা কর্র্তৃপক্ষের নজরদারির মধ্যে থাকবে না। এতে জননিরাপত্তা বহুলাংশে বিঘিœত হবে।

ফায়ার সেইফটি প্ল্যানের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, ফায়ার সেইফটি প্ল্যানে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা, ফায়ার ইকুইপমেন্ট রক্ষণাবেক্ষণ, নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বক্তিবর্গের দায়িত্ব-কর্তব্য, ফায়ার ড্রিল, হ্যাজার্ড আইডেন্টিফিকেশন অন্তর্ভুক্ত থাকে। বিএনবিসি-২০১৭ অনুসারে ১০ তলা বা ৩৩ মিটারের ঊর্ধ্ব ভবনের ফায়ার সেইফটি প্ল্যান প্রযোজ্য না থাকায় ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এ ছাড়া এ উচ্চতার ভবনের নিচে ফায়ার অ্যালার্ম সিস্টেম স্থাপন বাধ্যতামূলক না করায় নিম্ন উচ্চতার ফ্ল্যাটধারী আগুনের সংকেত পাবে না এবং জরুরি বহির্গমন করতে পারবে না। ফলে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা বিঘিœত হবে। এ ছাড়া বহুতল ভবন ১০ তলা বা ৩৩ মিটার না করার পক্ষে বেশ কয়েকটি পাঁচতারকা হোটেল ও হাসপাতালের নাম উল্লেখ করে গুরুত্ব তুলে ধরেছে সংস্থাটি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ১৬ মে বিএনবিসি-২০১৭ চূড়ান্ত করতে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি সভা হয়ে। সেখানে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে সুপারিশ চাওয়া হলে তারা এসব প্রস্তাব দেয়।

জানা গেছে, ঢাকা মহানগর (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮-এর ১৮ ধারায় ইমারত আংশিক বা সম্পূর্ণ নির্মিত হওয়ার পর তা ব্যবহার অথবা সেখানে বসবাসের জন্য বসবাস বা ব্যবহার সনদ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। ১৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, আংশিক বা সম্পূর্ণ বসবাস বা ব্যবহার সনদ পাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ কোনো অবস্থাতেই ব্যবহার করা যাবে না। এ ছাড়া একই আইনের ১৯ ধারার উপধারা ৫-এ বলা হয়েছে, অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবনটি নির্মিত হয়েছে কি না, তা পরিদর্শন করে ১৫ দিনের মাথায় এ সনদ দেওয়া হবে। বিধিমালায় ব্যবহার বা বসবাস সনদের মেয়াদ নির্দিষ্ট করা হয়েছে পাঁচ বছর। এ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই এটি নবায়ন করার বিষয়টিও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সনদ ছাড়া নির্মিত ভবনে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনসহ কোনো ধরনের পরিষেবার সংযোগ না দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীতে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু দুটি আইনে বহুতল ভবনের সংজ্ঞা দুই রকম হওয়ায় অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা ছাড়াই অনেক ভবন নির্মিত হচ্ছে। ঢাকা মহানগর (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮-এর ৬৩ ধারায় বহুতলের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ১০ তলা বা ৩৩ মিটারের ঊর্ধ্বে যেকোনো ভবন। অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইনের ২০০৩ সালের ৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, অন্য আইনে যা-ই থাকুক না কেন, অগ্নিপ্রতিরোধ, অগ্নিনির্বাপণ এবং এ সংক্রান্ত নির্ধারিত বিষয়াদির ক্ষেত্রে মহাপরিচালকের (ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর) ছাড়পত্র ছাড়া কোনো বহুতল ভবন বা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন বা অনুমোদিত নকশার সংশোধন করা যাবে না। আইনে এমন একটি সাংঘর্ষিক বিষয় থাকায় মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়েও বিপাকে পড়ছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিস উপস্থিত হয়ে সব ভবনের আগুন নেভাবে এমন ধারণা থাকা উচিত নয়। বিএনবিসি অনুযায়ী, সব ভবনে ফায়ার ইকুইপমেন্ট থাকবেÑ যা স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। এক্ষেত্রে উচ্চতা নিয়ে বা বহুতল ভবনের সংজ্ঞা নিয়ে মতবিরোধের কিছু নেই। ফায়ার সার্ভিসের দক্ষ জনবল আর স্থানীয় পর্যায়ের লোকজনের এ কাজে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভবন ব্যবহারের জন্য অকুপেন্সি সনদ এক সংস্থার হাতে থাকাই ভালো। না হলে আবার ভোগান্তি বেড়ে যাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত