খেলনার দোকানে কোনো শিশুকে ছেড়ে দিলে তার মুখের অভিব্যক্তিটা কেমন হবে? মুগ্ধতা, উত্তেজনা আর একরাশ আনন্দ ফুটে উঠবে তার চেহারায়। জেমস অ্যান্ডারসনের ঠিক এই অবস্থা হয়। দিলিপ জাদোজিয়ার ক্রিকেট বল ফ্যাক্টরিতে যতবার গেছেন ততবারই ছোট্ট শিশুর মতো মুগ্ধতা নিয়ে হেঁটেছেন বলের তাকের পাশে আর দেখেছেন বল তৈরির ধাপগুলো। কারণ এখানেই তৈরি হয় অ্যান্ডারসনের প্রিয় ‘ডিউক বল’।
অ্যান্ডারসনের কাছে ‘ডিউক বল’-এর মূল্য কত তা সম্ভবত বলে বোঝানো কঠিন। ৩৭ বছরে যতদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছিলেন, লাল চেরি ফলের মতো দেখতে বলটিই তার মূল অস্ত্র হয়েছে। এই বল দিয়েই দুর্ধর্ষ হয়েছেন রেকর্ড গড়া ইংলিশ পেসার। টেস্ট ক্রিকেটে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের রেকর্ডটি কিন্তু তার দখলে। মোট ৫৭৫ উইকেট তার। আর ২৫টি উইকেট হলে প্রথম ইংলিশ হিসেবে ৬০০ উইকেটের কোটা ছোঁবেন। এসব কীর্তির অবদান ওই ডিউক বলের। ডিউক বলে অ্যান্ডারসন যেমন, অস্ট্রেলিয়ান কুকাবুরা বা ভারতের এসজি বলে তেমনটা নন। তাই ৫৭৫ উইকেটের মধ্যে অ্যান্ডারসনের ৩৬৮ উইকেট এসেছে ডিউকে। ইংল্যান্ডের মাটিতে এটাই তার শিকার সংখ্যা।
ক্রিকেটের শুরু থেকেই ইংল্যান্ডে ব্যবহার হচ্ছে ডিউক, যার প্রস্তুতকারক ‘ব্রিটিশ ক্রিকেট বলস লিমিটেড’। এই প্রতিষ্ঠান অ্যান্ডারসনদের মোক্ষম অস্ত্র প্রস্তুত করে আসছে যুগ যুগ ধরে। এই অ্যাশেজেও বল তৈরির দায়িত্ব পড়েছে এই কোম্পানির ওপর। পাঁচ টেস্টে মোট ৬০ বল ব্যবহার হবে। সবগুলোই প্রস্তুত হয়ে গেছে নির্ধারিত সময়ে। নির্বাহী পরিচালক জাদোজিয়া এজবাস্টন টেস্ট শুরুর এক দিন আগে বলগুলো যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিতে ব্যস্ত ছিলেন। বলের সেলাই ঠিকঠাক আছে কি না, সেলাইয়ের দুপাশে সমান পরিধি আছে কি নাÑ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিষয়গুলো দেখতে গিয়ে মাথা ঘেমে উঠছে তার। সব দেখেশুনে এজবাস্টনে যখন পৌঁছে দিতে চলে যান, তখনই অ্যান্ডারসনের সঙ্গে দেখা। ১০ বলের এক বক্স তার দিকে এগিয়ে দিতেই চোখ নতুন কিছু দেখার আনন্দে ঝলঝল করে উঠল জিমির। ৬০০ হতে পাঁচ টেস্টে ২৫ উইকেট চাই। নতুন বলের দিকে তাকিয়ে এটাই হয়তো ভাবছিলেন এ পেসার।
এই বলে অ্যান্ডারসনের এতটা দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠার রহস্য কী? কী আছে এতে? জাদোজিয়া নিজেই জানালেন, রহস্যটা হাতে করা সেলাইয়ে যাতে সুইং বেশি হয়, সুতার দীর্ঘ স্থায়িত্ব থাকে, ‘মেশিনে যেসব বল সেলাই করা হয়, তাতে দুটি করে সেলাইয়ের লাইন থাকে। অন্যদিকে হাতে করা সেলাইয়ে লাইন থাকে ছয়টি। এতে বোলাররা খুব ভালোভাবে বল গ্রিপ করতে পারে। বল ছোড়ার সময় যেখানে চায় সঠিকভাবে সেখানে ফেলতে পারে। এছাড়া ছয় লাইনের সেলাইয়ে সুতাগুলো ৬০ ওভারের পরই যথেষ্ট শক্ত থাকে এজন্য ওই সময়ই সুইং করতে অসুবিধা হয় না। যা বোলারদের খুব সহযোগিতা করে। ক্রিকেটের উত্তেজনাটা হলো বলের চরিত্র সময়ে-সময়ে বদলাবে এবং বিভিন্ন বোলারদের সুবিধা দেবে। কিন্তু ডিউক বল ৮০ ওভার পর্যন্ত ধীরে ধীরে চরিত্র বদলায়। আর মেশিন সেলাইয়ের সিম দ্রুত নরম হয়ে যায় যা স্পিনারদের জন্য ভালো কিন্তু ডিউক বলে এমনটা হয় না তাই এটা পেসারদের পছন্দ।’
বল তৈরির এই ব্যবসাটা জাদোজিয়া নিজের করে নেন ১৯৮৭ সালে। সেই থেকে বল তৈরির কারখানা দক্ষিণ ব্রিটেনের রাজধানী কেন্টে আস্তানা গাড়ে। ১৯৯০ থেকে মূল কাঁচামাল যেমন সেরা মানের গরুর চামড়া ব্রিটেনেই সংগ্রহ করা হয়। সেগুলো সাইজমতো কেটে পাঠানো হয় উপমহাদেশে। এখানে দক্ষ সেলাই কারিগররা কর্ক তার ওপর রাবারে মোড়ানো বলের ওপর চামড়া সেলাই করেন। উপমহাদেশে বলের দুই পাশে চারটি সেলাই লাইন দেওয়া হয়। বাকি একটি দেওয়া হয় ফিনিশিংয়ের জন্য ইংল্যান্ডে বল ফেরার পর। ফিনিশিং বলতে জাদোজিয়ার ফ্যাক্টরিতে বলের ৯ ইঞ্চি সাইজ, ১৫৬-১৬৩ গ্রাম ওজন, বলের দুপাশে এম্বলেম ছাপানো এবং গোলাকৃতিটা নিখুঁত হওয়ার জন্য লোহার একটি গোলক ছাঁচে রেখে হালকা চাপ দেওয়া হয়। সবশেষে আসে খুব সাবধানে দেওয়া মোমের প্রলেপ।
তৈরি হয়ে গেল জাদোজিয়ার বিখ্যাত ও অ্যান্ডারসনের প্রিয় ‘ডিউক’। অস্ট্রেলিয়া সাবধান! অ্যান্ডারসন ৬০০-তে পৌঁছতে আক্রমণ করবেন কিন্তু!
