বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ১২ আসামির মধ্যে এখনো চারজনকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ড দেশব্যাপী আলোড়ন তোলার পর মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে বেশ অগ্রগতি হয়। কিন্তু মামলার প্রধান সাক্ষী রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গত ১৬ জুলাই গ্রেপ্তার দেখানোর পর থেকে তাকে ঘিরেই যেন তদন্তের কাজ ঘুরপাক খাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বরগুনার পুলিশ মিন্নিকে নিয়ে অতি উৎসাহী ভূমিকায় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাকে সাক্ষী থেকে আসামি বানিয়ে গ্রেপ্তার ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে দেশব্যাপী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার ঝড় ওঠে।
অন্যদিকে রিফাত হত্যা মামলার মূল আসামি রেখে তারই স্ত্রী কারাগারে থাকা আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে নিয়ে পুলিশ যেন বেশি উৎসাহী না হয় সে ব্যাপারে গত ২৮ জুলাই সতর্ক করেছে হাইকোর্টও। আদালত বলেছে, অন্য আসামিদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মিন্নিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে অন্য আসামি রেখে পুলিশ যেন তাকে নিয়ে বেশি উৎসাহী না হয়। এক রিট আবেদনের ওপর শুনানিকালে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে এমন মন্তব্য আসে।
গত ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনের সড়কে বহু পথচারীর উপস্থিতিতে একদল যুবক প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে রিফাত শরীফকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া রিফাতকে কোপানোর একটি ভিডিওতে স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নিকে প্রাণপণ চেষ্টা করতে দেখা যায়। ওই ঘটনার পরদিন রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করে বরগুনা সদর থানায় একটি মামলা করেন। ক্রমানুযায়ী মামলাটির এজাহারভুক্ত আসামিরা হলোÑ সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড (২৫), মো. রিফাত ফরাজী (২৩), মো. রিশান ফরাজী (২০), চন্দন (২১), মো. মুসা, মো. রাব্বি আকন (১৯), মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত (১৯), রায়হান (১৯), মো. হাসান (১৯), রিফাত (২০), অলি (২২) ও টিকটক হৃদয় (২১)। এদের মধ্যে সাতজনকে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার করা হলেও চারজনকে এখনো ধরতে পারেনি পুলিশ। তারা হলো পাঁচ নম্বর আসামি মো. মুসা, সাত নম্বর আসামি মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত, আট নম্বর আসামি রায়হান এবং ১০ নম্বর আসামি, তার নামও রিফাত। অন্যদিকে রিফাত হত্যায় জড়িত অভিযোগে মিন্নি এবং এজাহারভুক্ত আট আসামি ছাড়াও আরও সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া গত ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মামলার এক নম্বর আসামি নয়ন বন্ড নিহত হয়।
রিফাত শরীফ হত্যা মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে মনোযোগ না দিয়ে মিন্নিকে নিয়ে পুলিশ অতি উৎসাহী ভূমিকায় রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বরগুনা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক মো. হাসানুর রহমান ঝন্টু। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘রিফাত হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত চার আসামিকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ওই চার আসামিকে গ্রেপ্তারে পুলিশের কোনো তৎপরতা চোখে না পড়লেও মিন্নির বিষয়ে তারা খুব তৎপর। আমাদের কাছে মনে হয়, মিন্নির বিষয়ে তদন্তে সে অপরাধী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু বাকি যে আসামিরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি তাদের ব্যাপারেও পুলিশকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।’
অন্যদিকে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগসাজশে আমার মেয়েকে ফাঁসিয়ে প্রকৃত খুনিদের আড়াল করতে চাইছে। পুলিশ আমার মেয়েকে ফাঁসানোর কাজে ব্যস্ত না থেকে যারা এজাহারভুক্ত আসামি তাদের গ্রেপ্তার করুক। পুলিশের ওপর আমার কোনো আস্থা নেই। তারা সুষ্ঠু তদন্ত করছে না। এই মামলার তদন্তভার দ্রুত পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানাচ্ছি।’
রিফাত হত্যা মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার না করে মিন্নিকে নিয়ে পুলিশের অতি উৎসাহী ভূমিকার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিফাত হত্যা মামলায় বেশ ভালো অগ্রগতি হয়েছে। আমরা শুধু মিন্নিকে নিয়েই পড়ে নেই। তদন্তে যেসব বিষয় উঠে আসছে আমরা সেসব বিষয় নিয়েই কাজ করছি। তবে মামলার তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছুই এখন মিডিয়াতে বলতে পারছি না।’
এখনো ধরা পড়েনি যারা
মুসা
রিফাত হত্যা মামলার পাঁচ নম্বর আসামি বরগুনা পৌর শহরের ধানসিঁড়ি সড়কের বাসিন্দা মো. মুসা ওরফে মুসা বন্ড। ঘটনার পর থেকেই সে পলাতক। এলাকায় মুসা বন্ড হিসেবে পরিচিত এই মুসা নয়ন বন্ডের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিল। তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা এবং চুরির অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। বিভিন্ন সময় এলাকাবাসী তাকে ধরে পুলিশের হাতেও তুলে দিয়েছিল।
সিফাত
মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত মামলার সাত নম্বর আসামি। রিফাত হত্যার পর থেকেই পলাতক সিফাতের বাড়ি বরগুনা পৌর এলাকার কলেজিয়েট স্কুল সড়কে। নয়ন বন্ড ও তার সহযোগী রিফাত ফরাজীর সঙ্গে সে ঘোরাফেরা করত বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছে।
রায়হান
মামলার আট নম্বর আসামি রায়হানের বাসা বরগুনা পৌর শহরের কেজি স্কুল সড়কে। রিফাত হত্যায় তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই সে পলাতক।
রিফাত
রিফাত শরীফ হত্যা মামলার ১০ নম্বর আসামি এই রিফাতের বাড়ি শহরের সোনালিপাড়ায়। ঘটনার পর থেকেই সে এলাকাছাড়া। হত্যাকাণ্ডের সময় রিফাত শরীফকে বরগুনা কলেজ থেকে টেনে বের করে আনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ঘটনার পর থেকেই পলাতক এই রিফাত এলাকায় নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজী গ্রুপের অন্যতম সদস্য হিসেবে পরিচিত।
রিফাত হত্যার ঘটনায় তার বাবার করা মামলায় এক নম্বর সাক্ষী করা হয়েছিল মিন্নিকে। কিন্তু গত ১৩ জুলাই বরগুনা প্রেস ক্লাবে রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, তার ছেলের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিন্নিরও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এরপর ১৬ জুলাই সকালে মিন্নিকে বরগুনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে সন্ধ্যায় রিফাত হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে জানিয়ে গ্রেপ্তারের কথা জানান বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন।
পরদিন পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বরগুনার সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক মিন্নির পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গত ১৮ জুলাই পুলিশ জানায়, রিফাত হত্যায় নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছেন মিন্নি। এরপর ১৯ জুলাই বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. সিরাজুল ইসলামের কাছে মিন্নি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে জানায় পুলিশ। তবে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন অভিযোগ করেছেন, নির্যাতন করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে পুলিশ।
এদিকে আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহার চেয়ে গত বুধবার আবেদন করেছেন মিন্নি। বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে মিন্নির উপস্থিতিতে তার আইনজীবী ওই আবেদন করেন। বিচারক আবেদনটি গ্রহণ করে ১৪ আগস্ট মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করেছেন।
