দুয়োই যেন শক্তি জুগিয়েছিল স্মিথকে

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০১৯, ০৩:৪৯ এএম

১৮ মাস টেস্ট থেকে দূরে ছিলেন স্টিভেন স্মিথ। তার ফেরাটা যে এমন রাজকীয় হবে তা কেউ কল্পনাও করেনি। স্মিথ নিজেও হয়তো এতটা ভাবেননি। শুধু অ্যাশেজ নয়, টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা সেঞ্চুরি দিয়ে রাজকীয়ভাবে ফিরলেন স্মিথ। তার সঙ্গেই ট্যাম্পারিং কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে এজবাস্টন টেস্ট দিয়ে প্রত্যাবর্তন ঘটেছে ডেভিড ওয়ার্নার ও ক্যামেরন ব্যানক্রফটেরও। তবে দুজনের চেয়ে স্মিথ নিজেকে পুরোপুরি আলাদা করে উপস্থাপন করলেন ২১৯ বলে ১৪৪ রানের ইনিংস খেলে। ক্যারিয়ারের ২৪তম টেস্ট সেঞ্চুরি করে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের পর দ্বিতীয় দ্রুততম ব্যাটসম্যান হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটল স্মিথের। খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তোলা এই ইনিংস তাই ক্রিকেট মনে রাখবে অনেক দিন।

এজবাস্টনে প্রথম টেস্টের প্রথম দিন ব্যাটিং করাটা স্মিথের জন্য মোটেই সহজ ছিল না। ব্যাটিং ব্যর্থতায় শুরুতেই ১৭ রানে ২ উইকেট হারায় দল। এমন অবস্থায় উইকেটে যান স্মিথ। পুরোদিন স্টুয়ার্ট ব্রড, ক্রিস ওকস ও বেন স্টোকসদের সামলেছেন দৃঢ়তায়। একপর্যায়ে স্কোর গিয়ে দাঁড়ায় ৮ উইকেটে ১২২। দলের এই অবস্থা, বিপক্ষের আগুনে বোলিংÑ যথেষ্ট কঠিন করে তুলেছিল পরিস্থিতি, এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতিকূল দর্শক। ওয়ার্নার, ব্যানক্রফট ও স্মিথকে একদম প্রথম বল থেকে কটাক্ষ-ব্যঙ্গ করতে শুরু করে গ্যালারি। যে চাপ সামলাতে ব্যর্থ হন ওয়ার্নার ও ব্যানক্রফট। আউট হয়ে ফিরতে-ফিরতেও গ্যালারির বিদ্রƒপ মাথায় নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তাদের। ওয়ার্নারকে হলুদ সিরিশ-কাগজ দেখান ইংলিশ সমর্থকরা। স্মিথকেও ছাড়েনি ইংলিশরা। তার ব্যাপারে একটু বেশিই করে ফেলে তারা। গত বছর বল ট্যাম্পারিংয়ের দোষ স্বীকার করার সময় কেঁদেছিলেন স্মিথ। অজি তারকার সেই কান্নারত ছবি থেকে মুখোশ বানিয়ে পরে এসেছেন অনেকেই। স্মিথের জন্য সেটা কতটাই না বিব্রতকর! কিন্তু সেসব তাকে নায়ক হয়ে ওঠা থেকে থামাতে পারেনি। সব প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অজি নায়ক হয়ে উঠলেন স্মিথ।

এক বছর আগের খলনায়ক এখন নায়ক। স্মিথকে নিশ্চিতভাবেই ক্ষমা করে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ানরা। তার প্রমাণ, গতকাল শুক্রবার সব অজি সংবাদমাধ্যমে সাবেক অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়কের গুণকীর্তন। দেশটিতে অ্যাশেজ সম্প্রচার করা চ্যানেল-৯ তাদের ওয়েবসাইটে লিখেছে, ‘সবাই ব্যথিত হৃদয়ে হয়তো ঘুমিয়েছে কিন্তু সকালে উঠে দুর্দান্ত এক মুক্তি দেখবে। যা এসেছে স্মিথের ব্যাটে।’ অজি ক্রিকেটবিষয়ক লেখক পিটার লেলর নিজের কলামে লেখেন, ‘মনে হচ্ছে সে এতদিন দলেই ছিল। ভাবতে পারছি না স্মিথ না থাকলে কী হবে।’ সিডনির ডেইলি টেলিগ্রাফ বলছে, ‘সর্বকালের সেরা অ্যাশেজ সেঞ্চুরির একটি।’ টেলিগ্রাফের লেখক রাসেল গোল্ড লিখেছেন, ‘ওরা অনেকেই স্মিথের কান্নারত মুখোশ পরে এসেছিল যা আমাদের দুঃখজনক সেই মুহূর্তকে মনে করিয়ে দেয়। স্মিথেরও হয়তো সেসব মনে পড়ছিল। হয়তো এগুলো স্মিথকে শক্তি দিয়েছে।’

৮ উইকেটে ১২২ থেকে ২৮৪ পর্যন্ত গিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। স্মিথের পাশাপাশি এর কৃতিত্ব কিছুটা পাবেন পিটার সিডল। স্মিথের সঙ্গে ৪৪ করা এই পেসারের জুটিটি ছিল ৮৮ রানের। তবে এর পরের জুটির ৭৪ রানের সিংহভাগ স্মিথের ব্যাট থেকেই এসেছিল। মাত্র ১২ রান করেছেন লাথান লায়ন। বাকি ৬২ রান স্মিথের। শেষ পর্যন্ত দলকে নিরাপদে রেখে থামেন। ক্রিজে নামার সময় দুয়ো শুনেছিলেন কিন্তু ব্রডের বলে বোল্ড হয়ে ফেরার পথে পুরো গ্যালারি দাঁড়িয়ে করতালির সম্ভাষণ দিল স্মিথকে। সাবেকরাও প্রশংসায় ভাসিয়েছেন স্মিথকে। সাবেক ভারত ওপেনার বীরেন্দ্র শেবাগ টুইটারে লেখেন, ‘টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান সে।’ এছাড়া সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক মাইকেল ভন লিখেছেন, ‘সর্বকালের অন্যতম সেরা টেস্ট ইনিংস। টেস্টে ফিরে প্রথম ইনিংসে নেমেই এমন ব্যাটিং অবশ্য বিশেষ কিছু। একে গ্রেটনেসের সঙ্গে তুলনা করা ছাড়া উপায় নেই।’

২০১৩ ওভাল টেস্ট থেকে যে ৫৪ ম্যাচ স্মিথ খেলেছেন, তাতে প্রথম ইনিংসে অবিশ্বাস্য রেকর্ড তার। এই ম্যাচগুলোর যেসবে অস্ট্রেলিয়া আগে ব্যাট করেছে সেসবে স্মিথের গড় ১০০-এর ওপর। ৩০ ইনিংসে এসেছে ১৫ সেঞ্চুরি। তাতেই স্যার ব্র্যাডম্যানের পর দ্রুততম ২৪ সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়া হয়ে গেল। ব্র্যাডম্যান এই রেকর্ড করেছিলেন ৬৬ ইনিংসে। যা ভাঙা একরকম অসম্ভব। তালিকায় সাবেক কিংবদন্তির পর নিজের নাম লিখতে স্মিথের লেগেছে ১১৮ ইনিংস। পেছনে ফেলেছেন ১২৩ ইনিংসে ২৪ সেঞ্চুরি করা ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলিকে। শচিন টেন্ডুলকার ২৪ সেঞ্চুরি করেছিলেন ১২৫ ইনিংসে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত