ঈদের আগে ডেঙ্গুজ¦রের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। ঈদে রাজধানী ও বিভিন্ন শহরের লোকজন গ্রামে ফিরবে। আশঙ্কার বিষয়, ঈদে ঘরমুখো মানুষেরা ডেঙ্গুর জীবাণু বহন করে নিয়ে যাচ্ছে কি না! এর মধ্যেই প্রায় সব জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। ঈদকে কেন্দ্র করে যাতে ডেঙ্গু আরও ছড়িয়ে না যায় সে জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সিটি করপোরেশন-প্রশাসন একাট্টা হয়ে কাজ করতে হবে। জনসাধারণকেও আন্তরিক হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতি বছরই ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে অনেক কষ্ট সহ্য করে মানুষ গ্রামের বাড়িতে যায়। কিন্তু মহাসড়কের খারাপ অবস্থা, বিভিন্ন রকমের চাঁদাবাজি, টিকিট কালোবাজারি, পরিবহন মালিক/শ্রমিকের অসাধু পন্থা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ইত্যাদি ঈদের যাত্রাকে দুঃসহ করে তোলে।
সড়ক-মহাসড়কের দুর্দশা জনগণের দুর্ভোগকে আরও হাজারগুণ বাড়িয়ে দেয়। ঈদের সাত দিন আগে থেকেই যানজট শুরু হয়ে যায়। এজন্য মহাসড়কের দিকে সর্বদাই নজর রাখতে হবে। সড়ক স্বাভাবিক রাখার জন্য প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় নির্দিষ্ট কমিটি গঠন করা যেতে পারে। মহাসড়কে যানজট ও ভোগান্তি রোধে পুলিশ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ঈদের আগে এবং পরে অন্তত এক সপ্তাহ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব সড়কে উন্নয়নকাজ স্থগিত রাখা যেতে পারে। যান চলাচল নির্বিঘœ করতে সড়ক দখলমুক্ত করতে হবে। সড়কের পাশ ঘেঁষে অস্থায়ী দোকানপাট/স্থাপনা বসানো যাবে না। গতিসীমা নিয়ন্ত্রিত থাকতে হবে, ওভারটেক নয়। আর লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা গাড়ি যেন রাস্তায় চলতে না পারে সে জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ঈদের আগে ও পরের কিছুদিন হাইওয়েতে ট্রাক ও লরি বন্ধ রাখা যেতে পারে। বাসের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে।
আরও কিছু যন্ত্রণা ঈদের যাত্রাকে বিষময় করে তোলে। নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার অমানবিক কষ্টের মধ্যেও মানুষকে পড়তে হয় অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি ও ছিনতাইকারীদের কবলে। এর থেকে নিস্তার পেতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই একমাত্র ভরসা। ঈদে নিরাপদে বাড়ি ফেরার অন্যতম ও আরামদায়ক মাধ্যম হলো বাংলাদেশ রেলওয়ে। তাই ঈদযাত্রা সফল করতে রেলওয়েকে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। ট্রেনসংখ্যা ও বগিসংখ্যা বৃদ্ধি করাসহ দুর্ঘটনা এড়াতে ট্রেন ও বাসের ছাদে ভ্রমণ থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই। কিন্তু রোজার ঈদের মতোই এবারও যাতে ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় না হয় সে বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়েকে অবশ্যই বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার সড়ক মহাসড়কের চিত্র অনেকটা ভালো হলেও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিয়ে ঘরমুখো মানুষের শঙ্কা যেন কাটছেই না। একদিকে টিকিট পেতে এখনো যুদ্ধ চলছে। বাস, লঞ্চ ও রেলস্টেশনে অগ্রিম টিকিটের জন্য রীতিমতো হাহাকার। আকাশপথে বিভিন্ন এয়ারলাইনস কো¤পানি দ্বিগুণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনগুণ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রুটে ভাড়া নিচ্ছে। তবুও সিলেট, খুলনা, সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রুটে রয়েছে বিমানের টিকিট সংকট।
পরিবহন চালকরা জানিয়েছেন, টঙ্গী সেতু পার হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত অন্তত আটটি পয়েন্টে রয়েছে মারাত্মক সমস্যা। এসব পয়েন্টে সমস্যা নিরসন করা সম্ভব হলে ঘরমুখো মানুষের খুব একটা ভোগান্তি পোহাতে হবে না। পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ টঙ্গী বাজার, টঙ্গী স্টেশন রোড, চেরাগ আলী মার্কেট, বাটা গেট, গাজীপুরা বাসস্ট্যান্ড, বোর্ড বাজার, ভোগড়া বাইপাস ও জয়দেবপুর চৌরাস্তা। এছাড়া আশুলিয়া, চন্দ্রা, বাইপাইলসহ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কও যানজটের মহাভোগান্তির নাম। ইতিমধ্যে চন্দ্রাসহ আশপাশের রাস্তা ফোর লেন হওয়ায় হয়তো দুর্ভোগ খুব একটা হবে না। তাছাড়া সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী ভাঙাচোড়া সড়ক ইতিমধ্যে সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে। মহাসড়কে কয়েকটি সেতু, আন্ডারপাস খুলে দেওয়া হয়েছে। তবুও কেন যেন বিপদের ভয়। তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা নিরাপদ ঈদযাত্রায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সড়কে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
সমস্যা হলো ঈদের তিনদিন আগে থেকে পরিবহন সেক্টরে কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বিশেষ করে পরিবহন চালক ও শ্রমিকরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নিষিদ্ধ যানবাহন অবাধে চলে মহাসড়কে। নেওয়া হয় বাড়তি ভাড়া। ফলে সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ে। বৃষ্টি হলে সংস্কারকাজ নষ্ট হয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যানজটের আশঙ্কা রয়েই যায়। রেলের টিকিট পাননি অনেক যাত্রী। অ্যাপস সেবার নামে অনেকে টিকিট থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। লঞ্চের কেবিনের টিকিট ঘোষণা ছাড়াই হাওয়া হয়ে গেল। ভিআইপিরা এসব টিকিট কেটে নিয়েছে। সাধারণ মানুষ সবদিক থেকেই বঞ্চিত।
ঈদ ও ঈদ-পরবর্তী সময়ে সড়কপথে দুর্ঘটনা এড়াতে চালককে দায়িত্বশীল হয়ে গাড়ি চালাতে হবে। বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ফিটনেস ছাড়া কোনো গাড়ি যাতে রাস্তায় চলতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। মালিক পক্ষ যাতে কোনো মাদকাসক্ত ড্রাইভারের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং না দেয়। সেই সঙ্গে চালক, হেলপার বা পরিবহন সেক্টরের কাউকে মাদকাসক্ত বলে সন্দেহ হলে পুলিশের সহায়তা নিতে হবে। টার্মিনাল থেকে গাড়ি ছাড়ার পূর্বে বাস মালিক-শ্রমিক ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ড্রাইভারের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির ফিটনেস চেক করে গাড়ি রাস্তায় নামাতে কাজ করতে পারে। কোনো অবস্থায় বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির ফিটনেস ছাড়া গাড়ি যেন রাস্তায় চলতে দেওয়া না হয়। গাড়ির চালকরা সুযোগ পেলে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান, মোবাইলে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালান। গাড়ি চালানো অবস্থায় এমনটি করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
শ্রমিকদের যেন ঈদের আগে বেতন ভাতা নিয়ে কোনো আন্দোলনে যেতে না হয় সে জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মালিক বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আরও ভালো হবে। ছুটির আগেই শ্রমিকদের বেতনভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকার শ্রমিকদের বেশিরভাগই পোশাক শ্রমিক। এদের বেশিরভাগই নারীকর্মী। শ্রমিকদের বেতনভাতা নিশ্চিত হোক। তাদের মুখে হাসি ফুটুক।
ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে জনহয়রানি বন্ধ হোক। সুবিধাভোগীরা যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি না করতে পারে সে জন্য প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের তদারকি বাড়াতে হবে। আমাদেরও সচেতন হতে হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আসুক। ভ্রমণসময়ের অপচয় কম হোক। আসলে ঈদযাত্রাকে সুখময় ও আরামদায়ক করে তুলতে হলে শুধু সরকার বা পরিবহন মালিক বা অন্যের ওপর ভরসা করলেই চলবে না; যাত্রী হিসেবে আমাদেরও সহযোগীর ভূমিকা পালন করতে হবে।
লেখক : উপপরিচালক, বিআরডিবি, কুষ্টিয়া
