হাসপাতালে কিট ও রি-এজেন্ট সংকট

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৯, ০১:৪১ এএম

ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপে দেশের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু শনাক্তের কিট ও রি-এজেন্টের সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক হাসপাতালে মাঝেমধ্যেই বন্ধ রাখতে হচ্ছে পরীক্ষা। এতদিন  এই সংকট রাজধানীতে সীমাবদ্ধ থাকলেও দেশব্যাপী ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলা-উপজেলায়ও কিটের অভাব দেখা দিয়েছে। ফলে সরকারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে পারছে না রোগীরা। এ ছাড়া হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় যথাযথ সেবা পাচ্ছে না রোগীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বাড়তি লোকবল চেয়েছে কয়েকটি সরকারি হাসপাতাল। চিকিৎসকরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই চিকিৎসাসেবায় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এদিকে বিনামূল্যে ডেঙ্গু শনাক্তের ঘোষণা দিয়েছে সেনাবাহিনী। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়–য়া গতকাল শনিবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের দেওয়া কিট চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। তাই আমরা নিজেদের অর্থায়নে কিট কিনে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে আসছি। কিন্তু বাজারেও এখন এর সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে প্রয়োজন মতো সরবরাহ পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে যে পরিমাণ আছে তাতে হয়তো আগামীকাল (রবিবার) পর্যন্ত পরীক্ষা চালানো যাবে। এর মধ্যে সরকার যদি নতুন কিট সরবরাহ করতে না পারে, তবে নতুন রোগীদের পরীক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।’

তিনি আরও জানান, ‘বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে আমাদের হাসপাতালের প্রত্যেক স্তরে কর্মরতরা এখন ক্লান্ত। বিশেষ করে প্যাথলজি বিভাগ অকেজো হয়ে যাওয়ার পথে। সমস্যা সমাধানে আমি কলেজ অধ্যক্ষের নিকট সহযোগী অধ্যাপকদের বাড়তি সময় দেওয়ার জন্য আবেদন করেছি। এ ছাড়া সরকারের নিকট বাড়তি নার্স ও ইন্টার্ন ডাক্তার চাওয়া হয়েছে। রেড ক্রিসেন্ট ইতোমধ্যে প্যাথলজি বিভাগকে সচল রাখতে কয়েকজন জনবল দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে চিকিৎসাসেবা ভেঙে পড়বে বলে আশঙ্কা করছি।’

সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ব্রায়ান বি হালদার বলেন, ‘আমার হাসপাতালে কেবল একটি জিনিসের সংকট নেই, সেটা হলো রোগী। আগে যেখানে ৫০ জন থাকত সেখানে এখন ১০০ জন থাকছে। কিন্তু তাদের সেবা দেওয়ার জন্য কোনো কিছুই পর্যাপ্ত নেই। কিট, ওষুধ, সিট ও লোকবলের সংকট। সব মিলিয়ে খুব বাজে অবস্থা। সমস্যা সমাধানে সরকারের নিকট ১০ হাজার কিট ও ১০০ নার্স চেয়ে চিঠি দিয়েছি। সরকার ২০ জন নার্স দিয়েছে। রবিবারের মধ্যে কিট ও রি-এজেন্ট সরবরাহ করতে না পারলে সোমবার থেকে পরীক্ষা করা সম্ভব হবে কি না অনিশ্চিত।’

রাজধানীর বেসরকারি একটি হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, তাদের হাসপাতালে যে পরিমাণ কিট ও রি-এজেন্ট মজুদ রয়েছে তাতে আর মাত্র দুদিন চলবে। বাজারে এমন সংকট তৈরি হয়েছে যে, চাহিদার অর্ধেক সরবরাহ করা হচ্ছে; তা-ও আবার বাড়তি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। অথচ সরকার পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ করায় বাড়তি দাম নেওয়া যাচ্ছে না। হাসপাতালের সুনাম অব্যাহত রাখতে অনেক উচ্চমূল্যে কিট ও রি-এজেন্ট সরবরাহ করে লোকসানে ডেঙ্গুর পরীক্ষা চালাতে হচ্ছে।

রাজধানীর বাড্ডার বেসরকারি একটি হাসপাতালের ব্যবস্থাপক বলেন, ‘অনেক হাসপাতালই এখন কিট পাচ্ছে না। বিক্রেতাদের সঙ্গে যেসব হাসপাতালের ভালো সম্পর্ক তারাই কিট ও রি-এজেন্ট পাচ্ছে। কিন্তু যাদের সম্পর্ক খুব একটা ভালো না তাদের কিট সংগ্রহে বেগ পেতে হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, যারা পরীক্ষা করতে আসছেন তাদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা অনেক কম।

আমাদের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, অনেক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কিটের সরবরাহ শেষ হয়ে গেছে। এখন তারা কিট কিনতে পারছে না। ফলে ওইসব এলাকায় ডেঙ্গু পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে পার্শ্ববর্তী কোনো জেলায় যেতে হচ্ছে তাদের। এতে যেমন সময় বেশি লাগছে তেমনি ভোগান্তিও হচ্ছে রোগী ও তার স্বজনদের। আর বেশিরভাগ জেলার সরকারি হাসপাতালেই আইভি স্যালাইনের সংকট রয়েছে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, সব জেলায় ইতোমধ্যে কিট ও রি-এজেন্ট পাঠানো হয়েছে। যাদের শেষ হয়ে গেছে তারাও সিভিল সার্জনের কাছ থেকে সরবরাহ নিতে পারবে। আর গণস্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, তাদের উৎপাদন সক্ষমতা কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী স্যালাইন সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালম আজাদ বলেন, রাজধানীসহ সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে কিট ও রি-এজেন্ট সরবরাহ করা হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ শেষ হয়ে গেলে তাৎক্ষণিক কেনার জন্য অর্থের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তাই সংকট থাকার কথা নয়। জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো হয়তো এখনো সিভিল সার্জন অফিস থেকে কিট সরবরাহ নেয়নি। এজন্য সেখানে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।

মিলছে না বিনামূল্যে চিকিৎসা : দেশের সব সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গুর চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু এখনো সেই সুবিধা মিলছে না। কেবল ঢাকা শিশু হাসপাতালে এনএস-১ পরীক্ষা বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সেখানে যারা ফ্রি বেডে থাকছেন তাদেরকে সব ওষুধ ও স্যালাইনও দেওয়া হচ্ছে। বাকি সব হাসপাতালেই এজন্য অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক), সোহরাওয়ার্দী এবং মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালকরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বর্তমানে তারা ডেঙ্গু শনাক্তের পরীক্ষা করছেন হাসপাতালের তহবিলের অর্থ থেকে। কিন্তু ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে আসা ব্যক্তির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে বিনামূল্যে সেবা দিতে গেলে অনেক অর্থের প্রয়োজন। তাই সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা বিবেচনা করে যৌক্তিক ফি আদায় করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তারা।

ঢামেকে সংকট নেই, তবুও মিলছে না বিনামূল্যে পরীক্ষা : হাসপাতালে পর্যাপ্ত কিট থাকার পরও ফি দিয়ে ডেঙ্গু শনাক্তের পরীক্ষা করতে হচ্ছে রোগীদের। বিনামূল্যে পরীক্ষা করালে উৎসুক ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে যাবে এমন অজুহাত দেখাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, এই সুযোগে নিজেদের তহবিল সমৃদ্ধ করে নিচ্ছেন তারা। যদিও সরকার কিট, রি-এজেন্ট ও স্যালাইন সরবরাহে তাদের প্রাধান্য দিয়ে আসছে। ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে তাদের হাসপাতালে কিট বা রি-এজেন্টের কোনো সংকট নেই। এ ছাড়া সরকার নতুন যে কিট আমদানি করেছে তার থেকেও একটি অংশ তাদের হাসপাতালে আসবে।

বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করবে সেনাবাহিনী : দেশের যেসব এলাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল রয়েছে, সেখানে ডেঙ্গু শনাক্তের পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হবে। গতকাল শনিবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে গত ২৫ জুলাই ঢাকা সেনানিবাসে ডেঙ্গু নির্মূল অভিযানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বিনামূল্যে ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় এবং সিএমএইচে চিকিৎসা সহায়তার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।

বেসামাল সব হাসপাতাল : দিন যত গড়াচ্ছে দেশের সব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ওয়ার্ডে সিট শেষ হয়ে গেছে জুলাইয়ের শুরুতেই। এরপর আসা রোগীরা স্থান নিতে শুরু করে বারান্দায়। এখন রোগীদের ঠাঁই মিলছে করিডোর কিংবা সিঁড়ির নিচে। কোনো রোগী ছাড়পত্র পাওয়ার পর খালি বিছানার বরাদ্দ পেতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে রোগী বা তার স্বজনদের। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ বলছে, যাদের অবস্থা গুরুতর তাদের প্রাধান্য দিয়েই সিট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী, ঢামেক, মিটফোর্ড, মুগদা এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অবস্থা চরমে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই পাঁচ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত আরও ৪০৭ জন ভর্তি হয়েছেন; বর্তমানে চিকিৎসাধীন ১ হাজার ৮৩২ জন। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ ও রোগীর স্বজনরা বলছেন, বেড না পাওয়ায় অনেক রোগী বাসায় বা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত