মশার ওষুধ ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখবে দুদক

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৯, ০১:৪৫ এএম

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মশা মারার ‘অকার্যকর’ ওষুধ ক্রয় ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানে নামছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রাজধানীসহ সারা দেশে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বর ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) অভিযান চালায় দুদক। অভিযানে মশা মারার ওষুধের কিছু নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়। ওইদিনই ওষুধের বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করে দুদক টিম। একই সঙ্গে ওষুধের বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নথিপত্র যাচাই করছে দুর্নীতি বিরোধী সংস্থাটি।

জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণে দুদকের অভিযান পরিচালনা দলের প্রধান ও কমিশনের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশিদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, অভিযানের দিনই কমিশনে একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। সেখানে এডিস মশার ভয়াবহ বিস্তারে অকার্যকর ওষুধ সংগ্রহ এবং এর নেপথ্যে জালিয়াতি ও দুর্নীতি হয়েছে কি না তা অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একজন উপপরিচালক বলেন, ‘কমিশন সরেজমিনে প্রতিবেদনটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে অকার্যকর ওষুধ সংগ্রহের বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অকার্যকর ওষুধ ক্রয়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে দুদক।’ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দুই সিটি করপোরেশনের প্রভাবশালীদের আশীর্বাদপুষ্ট একটি সিন্ডিকেট মশা মারার ওষুধ আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে। নিম্নমানের ওষুধ সরবরাহ করায় ইতিমধ্যে আমদানিকারক একটি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে ডিএনসিসি। ডিএসসিসি কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই ওষুধ কিনেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর’বি) এক বছর আগে দুই সিটি করপোরেশনের কেনা মশার ওষুধ ‘কার্যকর নয়’Ñ মর্মে প্রতিবেদন দিয়েছিল। এরপরও তা কেনা অব্যাহত রাখে দুই সিটি করপোরেশন।

দুদকে দেওয়া নথি অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দুই সিটি করপোরেশনে মশা মারার ওষুধ সরবরাহ করেছে লিমিট অ্যাগ্রো লিমিটেড এবং ‘নোকন’। লিমিট অ্যাগ্রো ১৮ বছর ধরে ঢাকা সিটি করপোরেশনে গড়ে প্রতি বছর ৪০ কোটি টাকার মশার ওষুধ সরবরাহ করে। আর ‘নোকন’ উত্তর সিটিতে গত অর্থবছরে সরবরাহ করে ১১ কোটি টাকার ওষুধ। ভেজাল ওষুধ সরবরাহের অভিযোগে লিমিট অ্যাগ্রোকে কালো তালিকাভুক্ত করে ডিএনসিসি। এছাড়া ওষুধ সংগ্রহের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের নিয়ম থাকলেও ডিএসসিসি সেটা অনুসরণ করেনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৫ সালের ৫ অক্টোবর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে দেশে ওষুধ আমদানির বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। পেস্টিসাইড কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি (পিটাক) সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কৃষিকাজে ব্যবহার্য ও জনস্বাস্থ্যে ব্যবহার্য বালাইনাশক দ্রব্যের নতুন নিবন্ধনে কিছু নির্দেশনা আসে। পণ্যের তথ্য-উপাত্ত, কারিগরি মূল্যায়ন, মিশ্রণের পরিমাণ এবং মূল্যায়ন, ভ্যাট সার্টিফিকেট, কোম্পানি মালিকের জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংকের সচ্ছলতা সনদ, অনাপত্তি সনদ, নমুনা মূল্যায়ন এবং বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিপিএ) নতুন নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়। মশার ওষুধ সংগ্রহে সেগুলো আমলে নেওয়া হয়নি। জানা যায়, ১৯৯০-৯৫ সালে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনে মশার ওষুধ সরবরাহ করত এসিআই। পরে তাদের বাদ দেওয়া হয়। ২০০০ সালের পর ওষুধ সরবরাহকারী হিসেবে দরপত্র জমা দেয় লিমিট এগ্রো প্রডাক্ট। এসিআইয়ের সরবরাহ করা ওষুধের মূল্যের অর্ধেকে দরপত্র জমা দিয়ে কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি। এরপর টানা ১৮ বছর মশার ওষুধ সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৮ সালে লিমিট অ্যাগ্রোর সরবরাহ করা ওষুধের মান পরীক্ষা করা হয়। মানে উত্তীর্ণ হতে না পারায় কালো তালিকাভুক্ত করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এরপর ওষুধ সরবরাহের কাজ পায় পাকিস্তানভিত্তিক কোম্পানি নোকন। এক বছর ধরে এ প্রতিষ্ঠানটিই মশার ওষুধ সরবরাহ করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে। তাদের সরবরাহ করা মশার ওষুধের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত