বেসরকারি উদ্যোগে হেলিপোর্ট ও ছাদে হেলিপ্যাড নির্মাণ উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে সরকার। বেসরকারি মালিকানায় হেলিকপ্টারের ব্যবহার বাড়ায় এ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। বর্তমানে ঢাকার হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে উড্ডয়ন ও অবতরণ করছে বেসরকারি কপ্টারগুলো। এতে বিমানবন্দরে এয়ার ট্রাফিক মুভমেন্ট বাড়ছে, শিডিউল ফ্লাইটের চলাচল বিঘিœত হওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে হেলিপোর্ট ও ছাদে হেলিপ্যাড স্থাপনের জন্য পৃথক দুটি নীতিমালা করছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দুই দশকে বাংলাদেশের আকাশসীমায় হেলিকপ্টার চলাচল অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিজেদের যাতায়াত ও করপোরেট কাজে ব্যবহার বাড়ছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে চলাচল ও রোগী পরিবহনের মতো জরুরি প্রয়োজনে ভাড়ায়ও হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হচ্ছে। অতি জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত চলাচলের পরিবহন হিসেবে হেলিকপ্টারের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে এর ব্যবহার আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা। কারণ, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মরণাপন্ন রোগীকে দ্রুত স্থানান্তর, জরুরি সেবা প্রদান, দুর্ঘটনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে দ্রুত সহায়তা দেওয়া ও ব্যবসায়িক কারণে ত্বরিত যোগাযোগের জন্য হেলিকপ্টারে চলাচল এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বেবিচকের ইস্যু করা এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট (এওসি) পাওয়া ৮টি হেলিকপ্টার পরিচালনা সংস্থার বহরে ২৮ থেকে ৩০টি হেলিকপ্টার রয়েছে। সবগুলো হেলিকপ্টার সংস্থারই অপারেশনাল অফিস ও হেলিকপ্টারের হ্যাঙ্গার স্থাপনের জন্য শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই বিমানবন্দর থেকেই সংস্থাগুলো প্রতিদিন তাদের অপারেশন পরিচালনা করে এবং রাতে বিমানবন্দরেই অবস্থান করে। হেলিকপ্টার সংস্থাগুলোর বহরে প্রতিনিয়ত আরও নতুন নতুন হেলিকপ্টার যুক্ত হচ্ছে। আরও কয়েকটি সংস্থা এওসি পাওয়ার আবেদন করে রেখেছে। কিন্তু ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরে স্থান স্বল্পতার কারণে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানকে এওসি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, ঢাকা বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টার পরিচালিত হওয়ার কারণে বিমানবন্দরে এয়ার ট্রাফিক মুভমেন্ট বাড়ছে। এতে হেলিকপ্টারসহ অন্যান্য শিডিউল ফ্লাইটের চলাচল বিলম্বিত হচ্ছে। হেলিকপ্টার অপারেটরদের সমস্যার কারণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিজ খরচে হেলিপোর্ট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। বেসরকারি উদ্যোগে হেলিপোর্ট স্থাপন, অনুমোদন পদ্ধতি, পরিচালনার কারিগরি নির্দেশাবলি ও অন্যান্য বিষয় সবার অনুসরণের জন্য ‘হেলিপোর্ট স্থাপন ও পরিচালন নীতিমালা, ২০১৯’ প্রণয়ন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে খসড়া নীতিমালার ওপর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে।
ছাদে হেলিপ্যাড নির্মাণসংক্রান্ত খসড়া নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের কর্মকতারা জানান, হেলিপ্যাড সাধারণত কোনো এলাকার সবচেয়ে উঁচু ভবনের ছাদে স্থাপন করা হয়। ছাদের ওপর অবস্থানের কারণে হেলিকপ্টারের উড্ডয়ন ও অবতরণ পথ বেশ সহজ হয়। তা ছাড়া, পাইলট সব সময়ই বাতাসের মুখোমুখি অবতরণের সুযোগ পান। তাই সময়ের প্রয়োজনে ভবনের সহনশীলতা নিশ্চিত করাসহ সার্বিকভাবে হেলিকপ্টারের নিরাপদ অবতরণের জন্য ছাদে হেলিপ্যাড স্থাপন নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী হেলিপোর্ট স্থাপন করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে নিবন্ধিত হতে হবে। প্রস্তাবিত হেলিপোর্টে অবতরণ ও উড্ডয়নের জন্য সর্বোচ্চ ধরনের হেলিকপ্টারের জন্য প্রযোজ্য পরিমাপের কমপক্ষে দুটি হেলিপ্যাড থাকতে হবে। নিরাপদে কমপক্ষে ১০টি হেলিকপ্টার পার্কিং, অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা থাকতে হবে। সংযোগ ট্যাক্সিওয়ে, মেইনটেন্যান্স এরিয়া থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় সব ধরনের যোগাযোগ যন্ত্রপাতিসহ প্রয়োজনীয় উচ্চতার এটিসি কন্ট্রোল টাওয়ার, পূর্ণাঙ্গ ফায়ার ফাইটিং সুবিধাসহ ফায়ার স্টেশন থাকতে হবে। নেভিগেশন ও ল্যান্ডিং যন্ত্রপাতি ও আবহাওয়ার তথ্য পাওয়ার যন্ত্র থাকতে হবে। হেলিপ্যাড, পার্কিং এলাকা, ট্যাক্সিওয়ে, টার্মিনাল ভবন স্থাপনসহ কমপক্ষে সাত একর জমি থাকতে হবে। যাত্রীদের চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত কার পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের নীতিগত অনুমোদনের পর বেবিচক হেলিপোর্ট নির্মাণের অনুমোদন দেবে। হেলিপোর্টের নকশাও অনুমোদন করবে তারা। হেলিপোর্টে কর্মরত প্রত্যেক ব্যক্তির বিষয়ে পুলিশ বিভাগের অনাপত্তি লাগবে। বেবিচকের বিবেচনায় কোনো বেসরকারি হেলিপোর্টে অবতরণ ও উড্ডয়নকারী হেলিকপ্টারের অধিকতর নিরাপত্তা বা সুরক্ষার স্বার্থে অত্যাবশকীয় পরিষেবা বেবিচকের দেওয়া জরুরি মনে হলে সরকারের অনুমোদন নিয়ে বেবিচক ওই হেলিপোর্ট অপারেটরকে নোটিস দিয়ে সরাসরি সেবা দিতে শুরু করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে বেবিচকের সব ব্যয়ভার হেলিপোর্ট অপারেটর ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বেবিচককে অগ্রিম পরিশোধ করবে। তবে এ ধরনের পরিষেবা ছয় মাসের বেশি সময় ধরে দেওয়া প্রয়োজন হলে তা সংশ্লিষ্ট হেলিপোর্ট অপারেটরের পরিচালনায় অসামর্থ্য বলে গণ্য হবে এবং বেবিচক ওই হেলিপোর্টের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করতে পারবে।
‘ছাদে হেলিপ্যাড নীতিমালা ২০১৯’-এর খসড়ায় বলা হয়েছে, ছাদে অবতরণকারী হেলিকপ্টার অবশ্যই মাল্টি ইঞ্জিন হেলিকপ্টার হতে হবে। ছাদ থেকে শুধু দিনের বেলায় ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে। ছাদে হেলিপ্যাডের জন্য আবেদনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, ডিজিএফআই, এনএসআইয়ের অনাপত্তি জমা দিতে হবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) অনুমোদিত স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ও লোড বেয়ারিং ক্যাপাসিটি সনদ থাকতে হবে। ছাদে হেলিপ্যাডের অনুমোদনের মেয়াদ হবে এক বছর। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে সন্তোষজনক পরিচালনার প্রমাণ সাপেক্ষে, অবকাঠামো ও নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে মেয়াদ নবায়ন করা হবে। মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি যেকোনো সময় হেলিপ্যাড পরিদর্শন করতে পারবেন।
