খাদ্য অধিদপ্তরে জনবল নিয়োগে জটিলতা কেটেছে। পুরনো নিয়োগবিধির আওতায় গ্রহণ করা আবেদন বাতিল করে নতুন নিয়োগ বিধিমালার আওতায় শূন্য পদে নিয়োগ করা হবে। একই সঙ্গে ১ হাজার ১৬৬ পদের জন্য প্রায় ১৪ লাখ আবেদনকারীর যোগ্যতা নির্ধারণী বিভিন্ন পরীক্ষা বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতেই নেওয়া হবে। এর আগে সরকারি ক্রয় আইন অনুসরণ না করায় এসব পরীক্ষা গ্রহণের জন্য ২৮ কোটি টাকার দরপত্র বাতিল করা হয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. নাজমানারা খানুম দেশ রূপান্তরকে জানান, কয়েক দফায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। সর্বশেষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বহাল রেখে আগের সব নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিল করা হয়েছিল। আগের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির কয়েকজন আবেদকারী তাদের আবেদন বৈধ দাবি করে আদালতে গিয়েছিলেন। এ কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে যায়। শেষ পর্যন্ত আদালত খাদ্য অধিদপ্তরের পক্ষেই রায় দিয়েছে। এ কারণে মামলার বাধা দূর হওয়ার পর খাদ্য অধিদপ্তর নতুন করে দর নির্ধারণী প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমেই পরীক্ষা নেওয়া হবে। সরকারি ক্রয় আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় আগের দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। নতুন করে দর নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিন দফায় খাদ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। প্রথম দফায় ২০১৪ সালের ২৬ অক্টোবর তৃতীয় শ্রেণির ১৫ ক্যাটাগরির ৫৯৯টি পদে ও দ্বিতীয় দফায় ১৫ সালের ২৫ মার্চ চতুর্থ শ্রেণির চার ক্যাটাগরির ২৭৬টি পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। এসব নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ১৯৮৩ সালের নন-ক্যাডার গেজেটেড অফিসার অ্যান্ড নন-গেজেটেড এমপ্লয়ি রিক্রুটমেন্ট রুলস অনুযায়ী জারি করা হয়। মামলাসহ নানা কারণে এসব পদে যথাসময়ে নিয়োগ দিতে পারেনি খাদ্য অধিদপ্তর। একপর্যায়ে উচ্চ আদালত সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী বাতিল করে। এর ফলে সামরিক শাসনামলে প্রণীত সব আইন ও বিধিমালা নতুন করে জারি করার প্রয়োজন দেখা দেয়। নতুন করে ‘খাদ্য অধিদপ্তর (কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা-২০১৮’ জারি করা হয়। এই বিধিমালার আওতায় নতুন করে ২০১৮ সালের ১১ জুলাই ১ হাজার ১৬৬টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ১৩ লাখ ৭৮ হাজার ৯২৩ জনের আবেদন জমা পড়ে। এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থী যাচাই-বাছাই করার অভিজ্ঞতা কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের নেই। এ কারণে এসব আবেদনকারীর প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয় খাদ্য অধিদপ্তর।
খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটকে (আইবিএ) দেওয়ার ইচ্ছা ছিল খাদ্য অধিদপ্তরের। আইবিএ চাকরির প্রার্থী বাছাইয়ে এরই মধ্যে সুনাম কুড়িয়েছে। কিন্তু আইবিএ পুরো পরীক্ষার দায়িত্ব নিতে চায় না। তারা কয়েকটা পদের পরীক্ষা নিতে আগ্রহী। কিন্তু খাদ্য অধিদপ্তরকে সবকটি পদেরই পরীক্ষা নিতে হবে। তাদের পক্ষে আংশিক পরীক্ষার দায়িত্ব ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া সম্ভব না। এ কারণে খাদ্য অধিদপ্তর ঢাবির বাণিজ্য অনুষদভুক্ত ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমসকে (এমআইএস) দায়িত্ব দেয়।
এমআইএস খাদ্য অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণের জন্য ২৮ কোটি টাকা দর দেয়। এই ব্যয় অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভায় পাঠায়। দর নির্ধারণী প্রক্রিয়া সরকারি ক্রয় আইন অনুসরণ না করার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দরপত্র বাতিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই অবস্থায় খাদ্য অধিদপ্তর নতুন করে দর সংগ্রহ প্রক্রিয়া শুরু করছে।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যারাই পরীক্ষা গ্রহণের দায়িত্ব পাক, লিখিত পরীক্ষা হবে ১০০ নম্বরের। সেখান থেকে নির্বাচিতদের ডাকা হবে মৌখিক পরীক্ষায়। মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর রাখা হয়েছে ১০।
খাদ্য অধিদপ্তর ২৪ ক্যাটাগরিতে (ধরন) ১ হাজার ১৬৬টি শূন্য পদের বিপরীতে দরখাস্ত আহ্বান করেছিল গত ১১ জুলাই। ২৪ ধরনের পদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পদ অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর বা এএসআই। এর ২৭৪টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন পড়েছে ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৫২টি। এএসআইয়ের প্রতিটি পদের জন্য লড়বেন ২ হাজার ৩১৩ জন। এরপরই রয়েছে সাব-ইন্সপেক্টর বা এসআই পদ। এর ২৫০টি পদের জন্য প্রতিযোগিতা করবেন ৪ লাখ ১১ হাজার ৮৯৬ জন। অর্থাৎ প্রতিটি পদের জন্য লড়বেন ১ হাজার ৬৪৭ জন। স্টেনোগ্রাফার কাম কম্পিউটার অপারেটরের আটটি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ১ হাজার ৮৪৩ জন। স্টেনো টাইপিস্ট কাম কম্পিউটার অপারেটরের ১৫টি পদের জন্য ২ হাজার ৪৩৪টি আবেদন পড়ে। এছাড়া ৩১টি আপার ডিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট পদের জন্য ৪২ হাজার ৬০৪টি, ১৬টি অডিটর পদের জন্য ২৫ হাজার ৫৩৯টি, ছয়টি অ্যাসিস্ট্যান্ট কাম ক্যাশিয়ার পদের জন্য ৩ হাজার ৮০৬টি, দুটি ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান পদের জন্য ৪১৮টি, একটি ফোরম্যান পদের জন্য ৩০৭টি, দুটি মেকানিক্যাল ফোরম্যান পদের জন্য ২৭১টি, ২০টি অপারেটর পদের জন্য ৩০৬টি, নয়টি ইলেকট্রিশিয়ান পদের জন্য ১ হাজার ১৯৫টি, একটি ভেহিক্যাল ইলেকট্রিশিয়ান পদের জন্য ১৭টি, তিনটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ফোরম্যানের জন্য ৮৯টি, তিনটি মিল রাইট পদের জন্য ৬৫টি, ৪০২টি অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট কাম কম্পিউটার টাইপিস্ট পদের জন্য ২ লাখ ২৪ হাজার ৬৩০টি, ছয়টি ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পদের জন্য ১ হাজার ৪৭৬টি, আটটি ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট পদের জন্য ২ হাজার ৮০৭টি, ১১টি অ্যাসিস্ট্যান্ট পদের জন্য ৮১টি, ছয়টি সর্দার পদের জন্য ১৫টি, চারটি ভেহিক্যাল মেকানিক পদের জন্য ১৯টি, পাঁচটি অ্যাসিস্ট্যান্ট মিল রাইটের জন্য ৪৬৫টি, ৫৬টি সাইলো অপারেটর পদের জন্য ৪৬৫টি এবং ২৭টি স্প্রেম্যান পদের জন্য ২৪ হাজার ৬৭৫টি আবেদন জমা পড়েছে।
