ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দুই হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অর্থাৎ গতকাল ঘণ্টায় ৮৬ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এই সংখ্যা এক দিনে দেশে এটাই সর্বোচ্চ।
একই সময় সারা দেশে ডেঙ্গুতে আরও পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকায় চারজন ও ঢাকার বাইরে একজন মারা গেছে। এ নিয়ে বেসরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা দেশ রূপান্তরের হিসাবে ৫৬ জন। তবে সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ১৮ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের
হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে মোট ২ হাজার ৬৫৫ জন ডেঙ্গু নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
মাঝে দুদিন নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা কিছুটা কমলেও গত রবিবার থেকে এই ধারা আবার বাড়তির দিকে যায়। গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে গত রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৭১২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়।
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে এই রোগ পরীক্ষার হিড়িক পড়ায় ডেঙ্গুর পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিটের সংকট দেখা দিয়েছে বাজারে। দামও বেড়েছে কয়েক গুণ। এ অবস্থায় গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আবারও অনুরোধ করা হয়েছে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডেঙ্গুর পরীক্ষা না করাতে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত মোট ২৭ হাজার ৪৩৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯ হাজার ৭৬১ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। মোট ৭ হাজার ৬৫৮ জন এখনো চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে রাজধানীর ৩৮টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছে ৪ হাজার ৯৬২ জন ডেঙ্গু রোগী। আর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় ভর্তি আছে ২ হাজার ৬৯৬ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হওয়া ২ হাজার ৬৫ জন নতুন রোগীর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ১৫৯ জন এবং রাজধানীর বাইরে সারা দেশে ৯০৬ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৮৭০ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে রাজধানীতে ১ হাজার ৫৩ জন এবং রাজধানীর বাইরে সারা দেশে ৮২১ জন। অর্থাৎ ঢাকার পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
রাজধানীর বাইরে ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এসব জেলার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২২১ জন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮০ জন, খুলনা বিভাগে ১৫০ জন, রাজশাহী বিভাগে ১১২ জন, বরিশাল বিভাগে ৯৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৬১ জন, রংপুর বিভাগে ৪৭ জন এবং সিলেট বিভাগে ৩৬ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে হাসপাতালে।
পাঁচজনের মৃত্যু : রাজধানীতে গতকাল শারমিন আক্তার শাপলা নামের ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হকের স্ত্রী। তার গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাট সদর উপজেলায়। মৃত্যুর সময় নিহতের স্বামী সরকারি সফরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছিলেন। শাপলার স্বজনরা জানান, স্বামী বিদেশ যাওয়ার পর শাপলা জয়পুরহাটে বাবার বাসায় চলে যায়। সেখানে ডেঙ্গুজরে আক্রান্ত হলে রবিবার তাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সোমবার ভোরে মারা যান। তার ৮ বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, শাপলার শক সিনড্রোম ছিল। প্লাটিলেটের মাত্রা নেমে যাওয়ায় তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাসান (১৩) নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ৭০১ নম্বর ওয়ার্ডে তার মৃত্যু হয়। হাসান ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত শনিবার হাসপাতালে ভর্তি হয়। তার বাড়ি ভোলা জেলার দৌলতখানে। ঢাকার খিলগাঁও থানার সিপাহীবাগে থাকত সে। আনুষ্ঠানিকতা শেষে হাসানের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নকুল কুমার দাস নামে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। নওগাঁ জেলার পতœীতলা উপজেলার বাসিন্দা নীল কণ্ঠ দাসের ছেলে নকুল। তিনি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানাধীন শনিরআখড়ায় থাকতেন। ২-৩ দিন ধরে তিনি জ্বরাক্রান্ত ছিলেন। সোমবার সন্ধ্যায় প্রচ- জ্বর ও খিঁচুনি শুরু হলে তাকে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মাদারীপুরের শিবচরে রিপন হাওলাদার নামে এক যুবক রবিবার গভীর রাতে মারা গেছেন। শনিবার জ্বর নিয়ে শিবচর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন তিনি। শিবচরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার ডেঙ্গুজ্বর নিশ্চিত হলে চিকিৎসকরা তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি ভর্তি না হয়ে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি চলে যান। রবিবার রাতে গুরুতর অসুস্থ হলে শিবচর হাসপাতালে নিয়ে আসার পথে তিনি মারা যান।
ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত স্কুলছাত্রী অথৈ সাহা (১১) সোমবার সকালে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। অথৈ বোয়ালমারী পৌর সদরের কামারগ্রামের কানাই সাহার মেয়ে এবং নিউ মডেল প্রিক্যাডেট স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। অথৈ সাহা গত ৬-৭ দিন যাবৎ জ্বরে ভুগছিল, প্রথমে স্থানীয় ডাক্তার দেখানো হয়েছে। রবিবার তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখান থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়। ধানমণ্ডির আনোয়ারা প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকালে সে মারা যায়।
