দিদারুল আলম মাসুম ২ দিনের রিমান্ডে

ছেলে হত্যার বিচার দেখে মরতে চান সুদীপ্ত’র বাবা

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০১৯, ০১:২৮ এএম

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যার নেপথ্যের নায়ক লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুম গ্রেপ্তার হওয়ায় গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তার বাবা  মেঘনাথ বিশ্বাস বাবুল। তিনি বলেছেন, ‘দিদারুল আলম মাসুম একটি আতঙ্কের নাম। সে আমার ছেলেকে খুনের নির্দেশ দিয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা স্বীকারোক্তিমূলক

জবানবন্দিতে তা স্পষ্ট  করে বলেছে। ছেলে হত্যার বিচার দেখার জন্য বেঁচে আছি, বিচার দেখেই মরব।’

গত রোববার রাতে সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যা মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুমকে রাজধানী ঢাকার বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গতকাল সকালে কঠোর নিরাপত্তায় মাসুমকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আদালতে আনা হয়।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (প্রসিকিউশন) মো. কামরুজ্জামান বলেন, ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যার ঘটনায় সদরঘাট থানায় দায়ের হওয়া মামলায় দিদারুল আলম মাসুমকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই’র পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দু’পক্ষের শুনানি শেষে আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। ২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর সকালে নগরীর দক্ষিণ নালাপাড়ার বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে। এ ঘটনায় সুদীপ্তের বাবা মেঘনাথ বিশ্বাস বাবুল বাদী হয়ে সদরঘাট থানায় অজ্ঞাতপরিচয় সাত-আটজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। হত্যাকা-ের এক বছর পর বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত পিবিআইকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয়। গত বছরের নভেম্বর মাসে পিবিআই মামলার তদন্ত শুরু করে।

এদিকে, নগর ছাত্রলীগের একাংশের নেতারা দিদারুল আলম মাসুমের নির্দেশে সুদীপ্তকে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছিলেন।  এই মামলায় গ্রেপ্তার মোক্তার হোসেন ও ফয়সাল আহমেদ পাপ্পু বড় ভাইয়ের নির্দেশে সুদীপ্তকে পিটিয়ে হত্যা করেছে মর্মে আদালতে স্বীকারোক্তি দেন। তবে বড় ভাই হিসেবে তখন তারা কারও নাম উল্লেখ করেননি। পরবর্তী সময়ে গত ১২ জুলাই মিজানুর রহমান নামে আরেক আসামি আদালতে দিদারুল আলম মাসুমের নির্দেশে ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত বিশ^াসকে হত্যা করা হয়েছে বলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পিবিআই’র পরিদর্শক সন্তোষ চাকমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া আসামি মিজানুর রহমানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির আগেও অন্য আসামিদের ১৬৪’র সময়েও বড় ভাই হিসেবে মাসুমের নাম এসেছিল। মাসুমকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সুদীপ্ত হত্যা মামলার রহস্য উন্মোচন হবে। আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ‘বড় ভাই’ ও আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুম পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সুদীপ্তের বাবা মেঘনাথ বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে পুলিশ যেইভাবে তদন্ত করছে এবং যেই পথে এগোচ্ছে তাতে আমি খুশি। কেননা, আমার বড় ছেলে সুদীপ্তকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যায় জড়িত যে কয়জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদে অনেক বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে। মাসুমের নির্দেশেই আমার ছেলেকে তারা খুন করেছে। আমি চাই আমার ছেলে হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার হোক। এরমাধ্যমে আমার ছেলের আত্মাটা শান্তি পাবে। তবে আমি ও আমার পরিবার নিরাপত্তার অভাববোধ করছি।’

দিদারুল আলম মাসুমের উত্থান : ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজার এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেন দিদারুল আলম মাসুম। ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার আলম বাজার গ্রামের আব্দুল হকের ছেলে মাসুম। পরে ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে মাসুম বিভিন্ন মামলায় কারাগারে যান। পরবর্তী সময়ে জামিনে বেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্য চলে যান তিনি। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে দেশে ফিরে আবারও লালখানবাজার এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেন। গড়ে তোলেন আলাদা গ্রুপ।

২০১৩ সালের ৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরের ওয়াসা মোড়ে হেফাজতে ইসলামের উত্থানের সময় মাসুম দিনদুপুরে প্রকাশ্যে শটগান বের করে গুলি চালান। ওই সময় তার কাছে থাকা অস্ত্রের বৈধতা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। এরপর থেকে নিজের গড়া আলাদা বাহিনী নিয়ে লালখানবাজার এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেন। ওই এলাকায় বর্তমান কাউন্সিলর এ এফ কবির আহমেদ মানিক, যুবলীগ নেতা বেলাল ও মাসুম গ্রুপ সক্রিয়। তাই এসব গ্রুপের মধ্যে প্রায় সময়ই মারামারির ঘটনা ঘটে। বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরের লালখানবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে

এছাড়াও লালখান বাজার ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর এ এফ কবির আহমেদ মানিক গত ২২ জুলাই দিদারুল আলম মাসুমের নামে বিশেষ বিবেচনায় বরাদ্দ থাকা দুটি অস্ত্রের (শটগান/৫৪৪৪/ডবলমুরিং ও পিস্তল/৩৩/খুলশী) লাইসেন্স বাতিলের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। ওই আবেদনে মাসুমকে চট্টগ্রামের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং অন্তত এক ডজন হত্যাকা-ের  সঙ্গে জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযোগ করা হয়। এছাড়া আবেদনে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয় মাসুমের বিরুদ্ধে।

 

ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চট্টগ্রামের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অস্ত্র দুটির লাইসেন্স বাতিলপূর্বক জব্দের নির্দেশনা দেওয়া হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লাইসেন্স বাতিল করে অস্ত্র দুটি জব্দের বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারকে গত ৩১ জুলাই চিঠি দেন। পরে সিএমপির বিশেষ শাখা গত ১ আগস্ট খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অস্ত্র দুটি জব্দের নির্দেশ দেন। নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন অস্ত্র ২টি জব্দ করতে মাসুমের বাসায় গিয়েছিল পুলিশ। তখন অস্ত্রগুলো না পেয়ে নোটিস দিয়ে আসে। তবে পরদিন (৩ আগস্ট) মাসুম নিজে খুলশী থানায় গিয়ে অস্ত্র দুটি জমা দিয়ে আসেন। পরে গত রোববার রাতে সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যা মামলায় দিদারুল আলম মাসুমকে রাজধানী ঢাকার বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত