যাত্রীসেবার মান আরও বাড়াতে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব বিমানবন্দরে অত্যাধুনিক লাউঞ্জ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে লাউঞ্জ না থাকায় যাত্রীরা নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে এরই মধ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষকে (বেবিচক) চিঠি পাঠিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
এদিকে নিরাপদে উড়োজাহাজ পরিচালনায় বেশ কয়েকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। তাছাড়া বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনারও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দেশ
রূপান্তরকে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা।
এ প্রসঙ্গে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের সবকটি বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা বাড়াতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ঢেলে সাজানো হচ্ছে। অত্যাধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি আনা হবে। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে অত্যাধুনিক যাত্রী লাউঞ্জ করার পরিকল্পনা আছে। সেজন্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে। গত কয়েক মাসে শাহজালালে যে কটি ঘটনা ঘটেছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার ব্যাপারে কারোর সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করছি না।’
১৯৭২ সালের ৭ মার্চ ঢাকা থেকে সিলেট ও চট্টগ্রামে ফ্লাইট পরিচালনার মধ্য দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমানের যাত্রা শুরু। একই বছরের ৪ মার্চ শুরু হয় ঢাকা-লন্ডন ফ্লাইট। এরপর থেকে দেশ-বিদেশে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়লেও যাত্রীসেবার মান বাড়েনি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ১০ বছরে দেশের সবকটি বিমানবন্দরকে উন্নতমানে গড়ার নানা উদ্যোগ নিলেও কাক্সিক্ষত ফল আসছে না। শাহজালালসহ কোনো বিমানবন্দরেরই নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো নয়। বিশেষ করে বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীদের জন্য নেই উন্নতমানের লাউঞ্জ। এসব দিক বিবেচনা করে বছরখানেক আগে নিরাপদ উড়োজাহাজ পরিচালনা ব্যবস্থার উন্নয়নে ৬০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয় কর্র্তৃপক্ষ। ওই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সম্প্রতি নেওয়া হয় অত্যাধুনিক যাত্রী লাউঞ্জ করার পরিকল্পনা। এছাড়া উন্নয়নের আওতায় রয়েছে বিমানবন্দরের কমিউনিকেশন ও নেভিগেশন সার্ভিল্যান্স (সিএনএস) ব্যবস্থাও।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্প্রতি অধিদপ্তর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও চোরাকারবারিদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে বলা হয়েছে, দেশি-বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নিয়মিত বিমানবন্দরে আসা-যাওয়া এবং উড়োজাহাজে চলাচল করেন। অথচ মোটা অঙ্কের অর্থ পাওয়ার আশায় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দেশি-বিদেশি চোরাকারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশে স্বর্ণসহ বিভিন্ন চোরাইপণ্য উড়োজাহাজের স্পর্শকাতর অংশে পরিবহন করছে। বারবার সতর্ক করার পরও তারা বহাল তবিয়তে আছে। স্পর্শকাতর অংশে বিস্ফোরক রেখে বা যান্ত্রিক ত্রুটির মাধ্যমে তারা উড়োজাহাজে ভ্রমণকারী দেশি-বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ ও অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রাণহানিও ঘটাতে পারে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান ভালো না। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে উন্নতমানের লাউঞ্জ না থাকায় যাত্রীরা নানাভাবে হয়রানি হন। সেজন্য অত্যাধুনিক যাত্রী লাউঞ্জ তৈরি করতে আমরা পরামর্শ দিয়েছি।’
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গত ১৪ জুলাই জেলা প্রশাসক সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব দেশের প্রতিটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে আগমনী ও বহির্গমন যাত্রীদের জন্য আলাদা লাউঞ্জ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিষয়টি আমলে নিয়ে অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক টার্মিনালেও অত্যাধুনিক লাউঞ্জ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিতে আমরা বেবিচককে চিঠি পাঠিয়েছি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এয়ার ট্রাফিকের সংখ্যা বাড়লেও দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা সরঞ্জামাদির অধিকাংশই পুরনো। প্রায়ই সেগুলো বিকল হয়ে যায়। এতে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীদের নিরাপত্তাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এয়ার ট্রাফিক সেবার কার্যকারিতা বাড়ানোসহ নিরাপদে উড়োজাহাজ পরিবহন পরিচালনা, সিভিল এভিয়েশন ট্রেনিং সেন্টারে (সিএটিসি) এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের (এটিসি) জন্য প্রশিক্ষণ, উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা রোধে উদ্ধারকাজ ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।’ ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ফ্লাইট ইনফরমেশন রিজিয়ন কাভারেজের জন্য গভীর সমুদ্র পর্যন্ত সার্ভিল্যান্স এলাকা বিস্তৃত করতে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অত্যাধুনিক যাত্রী লাউঞ্জ তৈরিতে চলতি বছরের শেষদিকে দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে। এছাড়া কক্সবাজার ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
