দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হচ্ছে মিলনের। ১৮ বছর পর ফের মিলন ঘটতে চলেছে তার মা-বাবার। মিলনের জন্মের
স্বীকৃতি না দেওয়াকে কেন্দ্র করে তার নানার করা মামলায় কারাগারে রয়েছেন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বাবা ইসলাম। উচ্চ আদালত থেকে মুক্তির আদেশ এসে পৌঁছালে তাকে মুক্তি দেবে কারা কর্র্তৃপক্ষ। স্বামীকে কাছে পেতে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন মিলনের মা মালাও। ইতিমধ্যে কারাগারে নতুন করে বিয়েও হয়েছে ইসলাম-মালা দম্পতির। এখন বিবাহোত্তর সংবর্ধনার মাধ্যমে মিলনের কাছে তার মা-বাবাকে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে যশোরের কারা কর্র্তৃপক্ষ।
ঝিনাইদহের লক্ষ্মীপুর গ্রামের আজিজ মৃধার ছেলে ইসলাম। মালা একই গ্রামের আবদুর রহমানের মেয়ে। দীর্ঘদিন প্রেম করার পর ২০০০ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি ইসলাম ও মালা বাড়ি থেকে পালিয়ে স্থানীয় এক মৌলবির মাধ্যমে গোপনে বিয়ে করেন। পরিবারের সদস্যদের ভয়ে মালাকে নিজের বাড়িতে তুলতে সাহস পাননি ইসলাম। কিন্তু বিয়ের পর থেকে ইসলাম ও মালা দম্পতি বিভিন্ন স্থানে শারীরিকভাবে মিলিত হতে থাকেন। এক পর্যায়ে মালা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে তার গর্ভের সন্তানকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানান ইসলাম। গর্ভের সন্তানের পিতৃপরিচয়ের দাবি নিয়ে ইসলামের বাড়ি গেলে মালাকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। লোকলজ্জার ভয়ে গর্ভের সন্তানসহ মালা বহুবার আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে গিয়েও তা করেননি। শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালের ২১ জানুয়ারি স্বাভাবিক নিয়মে মালার কোলজুড়ে আসে এক পুত্রসন্তান। নাম রাখেন মিলন। মিলন ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মালার বাবা বাদী হয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে ২০০১ সালে ধর্ষণের একটি মামলা করেন ঝিনাইদহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। আদালতের নির্দেশে পুলিশ ইসলামকে আটক করে। কিন্তু ইসলাম আদালতেও মালা ও তার সন্তানকে অস্বীকার করেন। তখন মালার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুত্র মিলনের ডিএনএ টেস্ট করা হলে তার পিতৃপরিচয় নিশ্চিত হয়। আদালত ওই মামলায় ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে ইসলাম আপিল করলে রায় বহাল রাখে উচ্চ আদালত। উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করলে সেখানেও ইসলামের সাজার রায় বহাল থাকে। পরে আপিল রিভিউ আবেদন করেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ইসলাম। ইসলামের করা রিভিউ শুনানিতে আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চে মালা ও মিলনের স্বীকৃতির বিষয়টি সামনে আনেন। ১৮ বছর পর ইসলামের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল আপিল বিভাগকে জানান- মালা ইসলামেরই স্ত্রী। আর মিলন যে ইসলামের সন্তান সেটা উচ্চ আদালতের আদেশের পর ডিএনএ প্রতিবেদনেও প্রমাণিত। বর্তমানে ইসলাম মালাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে চান। মিলনকে সন্তানের স্বীকৃতি দিয়ে স্ত্রী ও সন্তানকে তিনি নিজ বাড়িতে তুলে নিতে চান। ইসলামের আইনজীবীর এই বক্তব্য শোনার পর গত রোববার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এক আদেশে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্র্তৃপক্ষকে কারাভ্যন্তরে ইসলাম ও মালার আবারও বিয়ে পড়ানোর নির্দেশ দেয়। একইসঙ্গে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলারকে আগামী ২৯ আগস্ট এ বিষয়ে অগ্রগতি জানাতে নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবু তালেব দেশ রূপান্তরকে জানান, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ইসলাম আদালতে জামিনের জন্য আবেদন করেন। আদালত শর্ত দেন মালাকে স্ত্রী ও মিলনকে সন্তানের স্বীকৃতি দিলে জামিন দেওয়া হবে। আদালতের শর্তে ইসলাম রাজি হন। এরপর আদালতের নির্দেশে জেলা প্রশাসকের অনুমতিক্রমে গত বুধবার কেন্দ্রীয় কারাগারের ভারপ্রাপ্ত সুপার, দু’পক্ষের আত্মীয়স্বজন ও তাদের ছেলে মিলনের উপস্থিতিতে ইসলাম ও মালার বিয়ে দেওয়া হয়। পরে বিয়ের কাবিন উচ্চ আদালতে জমা দেওয়া হয়।
জেলার আবু তালেব গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতের আদেশ হাতে পৌঁছানো মাত্রই ইসলামকে কারামুক্ত করা হবে। তার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখা হয়েছে। এছাড়া এমন একটি ঘটনাকে আরও স্মরণীয় করে রাখতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। জামিনে মুক্ত হলে ইসলামকে নতুন পোশাকে বরের বেশে সাজানো হবে। মালাকে সাজানো হবে বউয়ের বেশে। তারপর কারাগারের সামনের উন্মুক্ত মঞ্চে তাদের বিবাহোত্তর সংবর্ধনা দেওয়া হবে। এরপর ফুল দিয়ে সাজানো বিয়ের গাড়িতে করে বর-বউ ও তাদের একমাত্র পুত্রকে বাড়িতে পাঠানো হবে। এ ধরনের প্রস্তুতি জেল কর্র্তৃপক্ষ গ্রহণ করেছে।’
