রাজধানীতে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর স্থায়ী ও অস্থায়ী হাট। বৃষ্টি না থাকা ও ছুটির দিন হওয়ায় গতকাল শুক্রবার পর্যাপ্ত পশু দেখা যায় হাটগুলোতে। এদিন ক্রেতাও ছিল অনেক। বৃষ্টি না থাকায় মোটামুটি সুন্দর পরিবেশে ক্রেতারা গরু কিনেছেন। তবে এবার গরুর দাম অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা। বিক্রেতাদের ভাষ্য, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দামও বেড়েছে। বেপারিরা আজ শনিবার ও আগামীকাল রবিবার বেচাবিক্রি বাড়ার আশা করছেন। এদিকে কয়েকটি হাটেই ব্যবস্থাপনা নিয়ে বেপারি ও ক্রেতারা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
রাজধানীর আফতাবনগর হাটে দেখা যায়, দেশের নানা প্রান্ত থেকে গরুবোঝাই ট্রাক এসেছে। আগের দিনের মুষলধারে বৃষ্টির পর গতকাল শুক্রবার ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া। হাটে বিপুলসংখ্যক ক্রেতার উপস্থিতি দেখা যায়। সেখানে কথা হয় নয়াপল্টন থেকে আসা ক্রেতা বাহাদুর খানের সঙ্গে। তিনি জানান, হাটে গরু উঠেছে অনেক। দেশি গরুও প্রচুর। কিন্তু সাড়ে তিন থেকে চার মণ মাংস হবে, এই আকারের গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকা। অথচ অন্যান্য বছর এই আকারের গরুর দাম ছিল এক লাখ টাকার কম-বেশি।
রাজধানীর গাবতলী হাটেও অনেক গরু দেখা যায় গতকাল। শত শত ট্রাক গরু নামানো হয়। প্রচুর সরবরাহ থাকলেও দাম কমছে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাটের অনেক দিনকার বেপারি মুজিবুর রহমান জানান,
ক্রেতারা যেমন শেষ দিনে কী পরিস্থিতি হয় তার জন্য অপেক্ষা করছেন, বিক্রেতারাও শেষ দিনে বেশি দামে বিক্রির আশায় গরু রেখে দিচ্ছেন। এখন কাক্সিক্ষত লাভ পেলে বিক্রি করছেন।
উত্তরা ১২ ও ১৫ নম্বর সেক্টরের হাট ঘুরে দেখে যায়, দেশি-বিদেশি প্রচুর গরু হাটে। ভারতীয় গরুর তুলনায় দেশি গরুই বেশি। হাটের ক্রেতা আলম জানান, বেপারিরা দাম ছাড়ছেন না। দুই মণ মাংস হবে, এই আকারের গরু ৭০ হাজার টাকার কম বিক্রি হচ্ছে হচ্ছে না। তিন মণ মাংস হবে এই আকারের গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। বেপারিরা দাম ছাড়ছেন না। তিনি আরও বলেন, অন্যান্য বছরের চেয়ে গরুর দাম অনেক বেশি।
নয়াবাজার-বাবুবাজারের আরমানিটোলা স্ট্রিট, বাওয়ানি স্কুল, বাবুবাজার সেতু, ফ্রেঞ্চ রোড, ইউসুফ রোড, জিন্দাবাহার, ইংলিশ রোড, নয়াবাজার, সামছাবাদ এলাকার যে দিকে চোখ যায়, শত শত গরু নিয়ে অপেক্ষায় বিক্রেতারা। নানা নামের গরুতে সয়লাব এখানকার হাট। তবে বিশালদেহী গরুর আকর্ষণ বেশি থাকলেও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাঝারি আকারের দেশি গরু ও যাঁড়ের চাহিদাই তাদের কাছে বেশি।
বিক্রেতা ও হাটের দায়িত্বরতরা বলছেন, নয়াবাজার-বাবুবাজারে কোরবানির পশুরহাটে বরাবরই শেষ দুই দিনে জমজমাট বিক্রি হয়। আর অন্য বছরের তুলনায় এবারে এই হাটে গরুর সরবরাহ একটু বেশি। এই হাটের পশুর ক্রেতাদের বেশির ভাগই পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা। এ কারণে শেষ কয়েক দিনে বেড়ে যায় বিক্রি।
ইংলিশ রোডে মেহেরপুরের মুজিবনগর থেকে নিয়ে আসা অস্ট্রেলিয়ান ফিজিয়ান জাতের একটি গরু নিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, সেখানকার একটি অ্যাগ্রো ফার্মের সাড়ে ৩২ মণ ওজনের এই গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ২০ লাখ টাকা। গত সপ্তাহে গরুটি এই হাটে আনা হলেও এখন পর্যন্ত বিক্রি করার মতো দাম কেউ বলেনি।
রফিকুল ইসলাম আরও জানান, ছয় বছর আগে ৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা দিয়ে কেনা এই গরুকে প্রতিদিন ১৫ কেজি দানাদার খাবার দিতে হয়। শুধু তা-ই নয়, এলাকা থেকে গরুর সঙ্গে আনা হয়েছে একটি জেনারেটর। এটি দিয়ে গরুর দুই পাশে ফ্যানের বাতাস দিতে হয়। তিনি বলেন, ‘দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় ঢাকায় বড় গরুর চাহিদা বেশি। আমাদের অ্যাগ্রো ফার্মের মোট ৫৪টি গরু আনা হয়েছে বিক্রির জন্য। শেষ দুই দিনে আশা করি সব বিক্রি হয়ে যাবে।’
নয়াবাজার ইউসুফ রোডে বিশালদেহী অস্ট্রেলিয়ান ফিজিয়ান গরু নিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় যশোরের অভয়নগরের রেজাউল ইসলাম। তিনি জানান, ১ হাজার ৪৩০ কেজি ওজনের এই গরুটি তিনি তিন বছর ধরে লালন-পালন করছেন। দাম হাঁকছেন ১৫ লাখ টাকা। তবে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা হলেই তিনি বিক্রি করে দেবেন।
আরমানিটোলা এলাকায় মেহেরপুরের গাংনী থেকে আটটি মাঝারি আকারের গরু নিয়ে গত সোমবার ঢাকায় আসেন বেপারি মাহবুব। তিনি জানান, দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা দামের এসব গরুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে। হাটের শেষ তিন দিনে ন্যায্য দাম পেলেই তিনি এসব গরু বিক্রি করে দেবেন।
গরু কিনতে আসা নবাবপুরের ইলেকট্রিক সামগ্রী বিক্রেতা হৃদয় বলেন, ‘বড় গরুগুলো দেখতে এসেছি। আর কিনব মাঝারি আকারের। এর মধ্যে একটি গরুর দামও করেছি।’
পাবনা থেকে ‘এক টাইগার দুই পালোয়ান’ নিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরের বছিলা গরু-ছাগলের অস্থায়ী হাটে এসেছেন ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মাসুদ। তিনি ‘টাইগার’ নামের গরুটির দাম হাঁকছেন ৩০ লাখ টাকা। গতকাল মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৪৪ মণ ওজনের টাইগারের জন্য ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত বলে গেছেন একজন ক্রেতা। তবে ২৫ লাখের কমে বিক্রি করব না। আর দুই পালোয়ানের একটি ১৩ লাখ ও অন্যটি ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ১৫ লাখ ও সাড়ে সাত লাখ টাকার কমে বিক্রি করব না।’
গতকাল ছুটির দিনে বছিলা হাটে গিয়ে দেখা যায়, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের পর চৌরাস্তার মোড় থেকেই রাস্তার দুই পাশে শত শত গরু নিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। হাটে ছাগল, মহিষ আছে অল্পসংখ্যক। বেশির ভাগ বেপারিই গরু নিয়ে বসে আছেন। শেডের বাইরের ফাঁকা স্থান ও রাস্তার পাশের জায়গায়ও খুঁটি বসিয়ে এবং ত্রিপল, চট, পলিথিনের ছাউনি টাঙিয়ে অনেকেই পশু নিয়ে অপেক্ষা করছেন ক্রেতার জন্য। ট্রাকে ট্রাকে আসছে গরু।
গতকাল জুমার নামাজের পর থেকে বাজারে বাড়তে থাকে ক্রেতার ভিড়। ৪০ হাজার থেকে ২০-২৫ লাখ টাকা দামের গরু নিয়ে ক্রেতার আশায় বসে আছেন বিক্রেতারা। ক্রেতারাও দরদাম করছেন, ঘুরে দেখছেন পছন্দের গরু।
মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক থেকে আবদুল হালিম তার ১৩ বছরের নাতিকে নিয়ে যান গরু কিনতে। তিনি বলেন, ‘হাতে যখন আরও এক দিন আছে, আজকে দেখি। দরদামে মিলে গেলে কিনে নেব। অথবা শনিবার কিনব। সিরাজগঞ্জ থেকে ১৭টি গরু নিয়ে বছিলা হাটে এসেছেন তারেক আলী মুন্সি। তিনি বলেন, ‘আমার এখানে সব মাঝারি সাইজের দেশি গরু। ৫০ হাজার থেকে ৭ লাখ টাকা দামের গরু আছে।’
এদিকে হাটের ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ রয়েছে স্থানীয়দের। বছিলা ঘাটারচর এলাকার বাসিন্দা জাকির হোসেন রাজু বলেন, ‘কেউ কেউ রাস্তায়ও গরু রেখে দিয়েছে। ফলে এই রাস্তা দিয়ে ঘাটারচর, বছিলা ব্রিজের ওপারের মানুষের যাতায়াতে খুবই সমস্যা হচ্ছে।’
বছিলা হাটের ইজারাদার শাহ আলম হোসেন জীবন বলেন, ‘আমাদের দিক থেকে রাস্তা ও হাটের শৃঙ্খলা ঠিক রাখার জন্য সব রকম চেষ্টা করে যাচ্ছি। পাশাপাশি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরায়ও বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে।’ গরম ও মশার কারণে গরুর বিশেষভাবে যতœ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান সিরাজগঞ্জের ব্যবসায়ী মুসলিম মিয়া।
গতকাল জমে ওঠে দক্ষিণ বনশ্রীর মেরাদিয়া বাজারসংলগ্ন পশুর হাট। হাটে ক্রেতাদের ব্যাপক ভিড় দেখা যায়। জুমার নামাজের পর থেকেই ক্রেতারা হাটে আসতে শুরু করেন। বেলা যত বেড়েছে ক্রেতার ভিড় তত বেড়েছে। তবে এদিন বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সরেজমিনে হাটে ক্রেতাদের ব্যাপক ভিড় লক্ষ করা গেলেও তখন পর্যন্ত কোরবানির পশু তেমন বেশি বিক্রি হতে দেখা যায়নি। ক্রেতারা হাটে ঘুরছেন। পশু দেখছেন। কয়েকজন ক্রেতা জানালেন, অনেক বড় হাট। পছন্দের গরুটি দেখে-শুনে একটু সময় নিয়েই কিনতে চান তারা।
ছোট ও মাঝারি আকারের গরু বেশি বিক্রি হতে দেখা গেছে। এসব গরু বিক্রি হচ্ছিল ৪৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকার মধ্যে।
মেরাদিয়া হাটে ছোট ও বড় গরুর চাহিদাই বেশি। এখানে বড় গরুর চাহিদা কম। এমনটা জানিয়ে হাটের ইজারাদার শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্রেতার ভিড় বেশি হলেও পশু বিক্রি কম হচ্ছে। ক্রেতারা হাট ঘুরে ঘুরে দেখছেন। পশুর দাম সহনীয় পর্যায়েই আছে। পরের দুই দিন বিক্রি বাড়বে।’
