সস্তায় চামড়া পেয়েও রপ্তানিতে ব্যর্থ

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৯, ০৮:৫৫ পিএম

বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের গরুর কাঁচা চামড়ার খ্যাতি থাকলেও তা প্রক্রিয়াজাত করার পর বিশ্ববাজারে রপ্তানি করতে পারছে না ট্যানারিগুলো। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কাঁচা চামড়ার চাহিদা এত বেশি যে, কাঁচা চামড়া রপ্তানিতে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু দেশের ট্যানারি মালিকরা যাতে পর্যাপ্ত কাঁচা চামড়ার জোগান পান, সেজন্য রপ্তানি বন্ধ রেখেছে সরকার। কম দামে সেই চামড়া কিনেও রপ্তানি করতে পারছেন না ট্যানারি মালিকরা। গত কয়েক বছর ধরেই চামড়া রপ্তানি আয় কমছে।

রপ্তানি কমার পেছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ দেখিয়েছেন ব্যবসায়ী ও শিল্প মন্ত্রণালয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারিপল্লীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) পরিবেশগত প্রমাণপত্র বা সার্টিফিকেশন না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম অনেক কম। অন্যদিকে শিল্প মন্ত্রণালয় বলছে, বাংলাদেশের ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মান বজায় রাখছে না। স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত চামড়া তৈরির সঙ্গে জড়িতদের উৎপাদনশীলতা আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক কম। সাভারের বেশিরভাগি ট্যানারির আকার ছোট ও মাঝারি। এসব ট্যানারি ওয়েট ব্লু এবং ওয়েট হোয়াইট ট্যানিংয়ের কাজে জড়িত। বেশিরভাগ ট্যানারির সঙ্গেই বিদেশি ক্রেতাদের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। গুটিকয়েক ট্যানারি বড় বড় ব্র্যান্ড ও রিটেইলারের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন গঠিত প্রাইভেট সেক্টর ডেভেলপমেন্ট পলিসি কো-অর্ডিনেশন কমিটির বৈঠকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতের সমস্যা নিয়ে করা বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের সময় প্রত্যাশা করা হয়েছিল যে, আধুনিক পদ্ধতিতে কমপ্লায়েন্ট শিল্প হিসেবে ট্যানারি খাত থেকে রপ্তানি বাড়বে। পরিবেশ দূষণ রোধ হবে। কিন্তু তা হয়নি, বরং উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। রপ্তানিতে দরপতন ও উৎপাদন কমে যাওয়ায় ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়ার চাহিদা কমে গেছে। এ কারণেই কোরবানির পশুর চামড়ার দর গত কয়েক বছর ধরে তলানিতেই রয়ে গেছে।

৭৭ বছর ধরেই বাংলাদেশের ট্যানারি খাত বেশ কিছু সুবিধা ভোগ করে আসছে। দেশে উৎপাদিত চামড়ার সহজলভ্যতা, বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত চামড়ার উৎকৃষ্টমানের সূক্ষ্ম বুনন ও মসৃণতা। বাংলাদেশের বেশিরভাগ পশুই গৃহপালিত, যা বিশ্বের মোট গবাদিপশুর ১ দশমিক ৮ শতাংশ ও ছাগলের ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। কোরবানির সময় একসঙ্গে তুলনামূলকভাবে কম দামে একসঙ্গে বিপুল চামড়া পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে শিল্প মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশের ট্যানারিগুলোর বিশ্বের প্রধান প্রধান ব্র্যান্ড ও রিটেইলারদের পণ্য সম্পর্কে ধারণা কম এবং তারা সময়োপযোগী ফ্যাশন অনুযায়ী পণ্য তৈরি করতে সক্ষম নয়। ভবিষ্যৎ চাহিদা পর্যবেক্ষণ করার মতো তাদের সক্ষমতাও কম। তাই বাংলাদেশের ট্যানিং শিল্পকে আরও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। উৎপাদন অবশ্যই চলমান ফ্যাশন ও উচ্চমান অনুযায়ী হতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, চামড়া শিল্প মোটামুটি তিন ধরনের। ওয়েট ব্লু ও ফিনিশড চামড়া, চামড়াজাত পণ্য (ব্যাগ, বেল্ট) এবং জুতা ও জুতার বিভিন্ন অংশ। গত পাঁচ বছরে চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যের রপ্তানি বৃদ্ধির হার ছিল ১৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। কিন্তু ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে। ওই বছর প্রবৃদ্ধি কমেছে ১২ শতাংশেরও বেশি। বিদায়ী গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়া পণ্যের রপ্তানি কমেছে ৬ শতাংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রাস্ট চামড়া রপ্তানি কমেছে প্রায় ৯২ শতাংশ, সঙ্গে কমেছে ফিনিশড চামড়া রপ্তানির পরিমাণও।

ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ঢাকার (টিআইইডি) তথ্য অনুযায়ী, সিইটিপির পরিবেশগত সার্টিফিকেশন না থাকার কারণে বাংলাদেশের চামড়ার দাম আন্তর্জাতিক বাজারে হ্রাস পেয়েছে। অন্যান্য সমস্যার মধ্যে রয়েছেÑ কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সরকারি-বেসরকারি খাতের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব, কাঁচামাল, রাসায়নিক ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে উচ্চ শুল্ককর ও সঠিক নীতিমালার অভাব।

এসব বিষয়ে শিল্প সচিব আবদুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিইটিপি পুরোদমে চালু না হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। মূলত এ বিষয়ে আমাদের আগের কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথম দিকে বেশি জটিলতা হয়েছে। বর্তমানে আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সিইটিপি নির্মাণ ও কার্যক্রম সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে যে সিইটিপি তৈরি করা হয়েছে তা আন্তর্জাতিক মানের। ট্যানারির বর্জ্য ডাম্পিং নিয়ে কিছুটা সমস্যা আছে। এজন্য একটি প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে। ট্যানারির বর্জ্যগুলোকে পরিবেশসম্মত করতে যেসব যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হবে সেগুলোর আমদানি করা হয়েছে, যা চট্টগ্রাম পোর্টে আছে। আশা করা যায়, শিগগিরই সেগুলো ছাড়িয়ে সাভারে নিয়ে আসা হবে। তখন বর্জ্য ডাম্পিং নিয়েও প্রশ্ন উঠবে না। তিনি বলেন, বর্তমানে চামড়া রপ্তানি অনেকাংশেই কমে গেছে। আগামীতে সেটি হবে না। আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যে তৈরি পোশাকের পরই চামড়া শিল্পের অবস্থান। বাংলাদেশে এর কাঁচামাল থাকায় শতকরা ৬০ ভাগ মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে। তাই আগামী ২০২১ সাল নাগাদ এ শিল্প থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হবে বলে আশা করা যায়। বর্তমানে বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ২২০ বিলিয়ন ডলারের বাজার রয়েছে। আমরা এ খাতের মাত্র ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করছি।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা খসড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উন্নয়ন নীতিমালা অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী চামড়া ও জুতা খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। ২০১০ সালে বিশ্বে জুতা উৎপাদন হয়েছে ১৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ বিলিয়ন ডলারে। ২০১৬ সালে বিশ্বে জুতা রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল বিশ্বে অষ্টম। ওই বছর বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবদান ছিল মাত্র ১ শতাংশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত