গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। বাইরের প্রতিটি জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কে আছেন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হওয়া ঢাকার বাসিন্দারা। এ কারণে ঈদুল আজহার ছুটি উদযাপনে বাড়িতে না গিয়ে রাজধানীতে থাকছেন তাদের কেউ কেউ। গত তিন দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা, বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন, লঞ্চঘাটে গিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ছুটি বাতিল হওয়ায় চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট অনেককে থাকতে হচ্ছে ঢাকায়। ডেঙ্গু রোগীর সেবায় অনেক গ্রামে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক নেই বলে আক্রান্তদের ঈদে গ্রামের বাড়িতে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবার পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৯ জনের। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩৮ হাজার ৮৪৪। ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৯ হাজার ৩৯৫ জন।
ঈদে বাড়ি না যাওয়ার বিষয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের গাড়িচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছি; পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়নি। তবে ছেড়ে ছেড়ে জ্বর আসছে। যেহেতু রাজধানীর বাইরে ডেঙ্গুর ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে, তাই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গিয়ে আবার কী বিপদে পড়ি, এমন চিন্তা করেই এবার গ্রামে যাওয়ার জন্য অফিস থেকে ছুটি নিচ্ছি না। ঈদ ঢাকায় করব।’
রাজধানীর বাস টার্মিনাল, সদরঘাট ও রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে উপচেপড়া ভিড় চোখে পড়লেও যাত্রীদের রয়েছে আলাদা সতর্কতা। কেউ কেউ পরিবারের অন্য সদস্যদের ঢাকায় রেখে একাই গ্রামের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে শাকিল আহমেদ নামের একজন বলেন, ‘আমার ৯ বছরের ছেলের ১০ দিন আগে জ্বর আসে। প্রথমে গুরুত্ব না নিয়ে সাধারণ জ্বর ভেবে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা ভাবিনি। দুই দিন পার হলে আমার ছেলে আরও অসুস্থ বোধ করলে ফার্মগেটে আল রাজি হাসপাতালে নিয়ে গেল ডেঙ্গুজ্বর বলে শনাক্ত হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘(ছেলে) এখন বাসায় আছে, ভালো আছে। তবে (জ্বর) পুরোপুরি সারেনি। এখন এ অবস্থায় পরিবার নিয়ে কীভাবে গ্রামে যাই? তাই আমি একা যাচ্ছি। এক দিন পরেই ঢাকায় ফিরে আসব। মা-বাবা আছেন, গ্রামেই কোরবানি দিচ্ছি। তাই যেতে হচ্ছে আমাকে।’
ধানমণ্ডির ১৫ নম্বর স্টাফ কোয়ার্টারে একটি মেসে রবিউল ইসলাম, জাহিদ হাসান, ফারুক আহমেদসহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী থাকেন। তাদের মধ্যে রবিউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের বাসায় এখন পর্যন্ত কারও ডেঙ্গুজ্বর হয়নি। তবে আমরা আশঙ্কায় আছি, কখন আবার কাকে পেয়ে বসে। সামনে চাকরির পরীক্ষা আছে। তাই গ্রামের বাড়ি গিয়ে বা যাওয়ার পথে জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ভয় রয়েছে। গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর; অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। যদিও স্বজনদের জন্য খারাপ লাগছে। তবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবার ঢাকায় ঈদ করব।’
রাজধানীর শাহজাদপুরের খালপাড়া এলাকার মুসলিম হেয়ার কাটিং সেলুনে কাজ করেন ব্রাক্ষণবাড়িয়ার নবীনগরের আবদুর রাজ্জাক ও বগুড়ার সিরাজ মিয়া। দুজন এবার ঈদে ঢাকাতেই থাকবেন বলে জানান। তাদের একজন আবদুর রাজ্জাক জানান, কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছেন। এখনো কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। এবার ঈদে গ্রামের বাড়ি যাওয়া নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন।
আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমাদের দোকানের পাশের বাসায় ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং পরিচিত আরেকজন ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। তাই আমরাও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। ঈদে বাড়ি গেলেও সতর্ক থাকব এবং ডেঙ্গু পরীক্ষা করেই ঢাকা ছাড়ব যেন ডেঙ্গু থেকে বেঁচে থাকি।’ স্যুয়ারেজ খালের পাড়েই দোকান। রাতে দোকানেই ঘুমান বলে জানান তারা।
রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মিডিসিন বিভাগের চিকিৎসক মহসিনা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ আপনারা জানেন যে ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সব সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের ঈদের ছুটি বাতিল করে দিয়েছে। এবার ঈদে আমাদের রোগীদের সেবায় নিয়োজিত থাকতে হবে।’
