‘শেখ কামালের আর্তনাদ আজও তাড়িয়ে বেড়ায়’

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৯, ০৩:৩১ এএম

তিনি আবাহনী ক্রীড়া চক্রের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। সুবাদে খুব কাছ থেকে দেখেছেন ক্লাবটির প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামালকে। বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালকে নিয়ে হারুনুর রশিদের রয়েছে হাজারো স্মৃতি। আজ শেখ কামালের মৃত্যুর দিনে সেই স্মৃতির ডালি খুলে বসেছেন এই বর্ষীয়ান ক্রীড়া সংগঠক। দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র কাছে বলেছেন খুব কাছ থেকে দেখা শেখ কামালকে নিয়ে। বলেছেন দেশের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে কতটা স্বপ্নবাজ মানুষ ছিলেন কামাল। অনেক কথোপকথনের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো এখানে শেখ কামালের সঙ্গে পরিচয়ের গল্পটা শুনতে চাই আপনার কাছ থেকে।

 শেখ কামাল একজন ক্রীড়াপ্রেমী, ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়াবিদ ছিলেন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হলেও তার খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ ছিল যথেষ্ট বেশি এবং খেলাধুলাকে একটি আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন সবসময়। উনি বয়সে আমার চেয়ে ছোট ছিলেন। ১৯৬৭ সালের কথা। আমরা তখন আবাহনী মাঠ নিয়ে আন্দোলন করছি। আবাহনী মাঠের পাশেই ছিল তাজউদ্দীন সাহেবের বাসা। একদিন বঙ্গবন্ধু এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মর্নিং ওয়ার্ক করছিলেন। ছাত্র রাজনীতি করতাম বলে আমায় চিনতেন বঙ্গবন্ধু। আমাকে ডেকে বললেনÑ ‘তোরা এখানে কিছু ছেলে-পেলে দেখছি নিয়মিত এখানে জড়ো হস। তোরা আরও একটু সংঘবদ্ধ হয়ে মোহাম্মদপুরে নন-বেঙ্গলিদের প্রতিহত কর। নন-বেঙ্গলিরা লালমাটিয়ায় যেই বাঙালি পরিবারগুলো থাকে, তাদের মাঝে মাঝে আক্রমণ করে। তোরা যদি একত্রিত থাকিস, তাহলে মাঝে মাঝে তাদেরকে প্রতিহত করতে পারিস।’ তখন কথা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বললেন তোদের সংগঠনটা ভালো। আমি কামালকে বলব তোদের এখানে চলে আসতে। সেদিন বিকেলেই শেখ কামাল চলে এলেন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। শেখ কামালের সঙ্গে সেদিনই প্রথম পরিচয় এবং সেদিনই তিনি আমাদের সবাইকে মোহচ্ছন্ন করে তুললেন খেলাধুলা নিয়ে তার ধ্যান-ধারণা, চিন্তাগুলো প্রকাশ করে। তার বিভিন্ন কথা শুনে আমরা বিমোহিত হয়ে গেলাম। দেশের খেলাধুলার মান কী, কীভাবে উন্নতি করা যায় এগুলো নিয়ে ওর কথা শুনে, ওর দূরদর্শিতা দেখে তিনি হয়ে গেলেন আমাদের অলিখিত ক্রীড়া-নেতা।

আবাহনী ক্রীড়া চক্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শেখ কামাল। আপনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। আবাহনীর শুরুর গল্পটা বলুন।

 তখন এটা ছিল একটা পাড়ার ক্লাব। নাম ছিল আবাহনী সমাজ কল্যাণ সমিতি। এর তিনটি অংশ ছিলÑ আবাহনী ক্রীড়া চক্র, আবাহনী সমাজ চক্র এবং আবাহনী সাংস্কৃতিক চক্র। স্বাধীনতার পর শেখ কামাল বললেন, যুদ্ধের সময় একটা স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠিত হয়েছিল। যার ম্যানেজার ছিল আমাদের ক্লাবের তান্না (তানভীর মাজহার)। আমরা এক কাজ করি, আমাদের ক্লাবের সমাজ চক্র ও সাংস্কৃতিক চক্র বাদ দিয়ে শুধু ক্রীড়া চক্রকে নিয়েই থাকি। যাতে একটা ভালো দল গড়তে পারি। ওর কথায় ১৯৭২ সালে আবাহনী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পদার্পণ করল। ক্লাব তো হলো, কিন্তু আমরা ফুটবল লিগে কীভাবে খেলব? তখন ইকবাল স্পোর্টিং ক্লাব নামে মোহাম্মদপুরের একটা ক্লাব ছিল, যারা সদ্য দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে উঠেছে। স্বাধীনতার আগে এই ক্লাবের বেশিরভাগ নন-বেঙ্গলি যুদ্ধের সময় আমাদের অনেক নির্যাতন করেছে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ক্লাবের বেশিরভাগ সংগঠক চলে গেছে, তাই আমরা চিন্তা করলাম এর নাম পরিবর্তন করে আবাহনী ক্রীড়া চক্র নামকরণ করে লিগে খেলব। এরপর স্থায়ীভাবে আমরা ফুটবলে পদার্পণ করলাম। এরপর অবশ্য ১৯৭৩ সালে ইস্পাহানী ক্লাব থেকে ক্রিকেট ও হকি দল দুটি নিয়ে নিলাম। ইস্পাহানীর সঙ্গে তখন আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিল। একদিন কামাল বললেন, ইস্পাহানী তাদের ক্রিকেট ও হকি দল দুটি দিতে চায়। আমরা সম্মতি দিলাম। তারা তখন আমাদের কিছু আর্থিক সহায়তাও দিল দল দুটি পরিচালনার সুবিধার্থে। কামাল প্রতিষ্ঠাতা হলেও ও কিন্তু শুরুতে সভাপতি ছিলেন না। আসলে আমরা তখন কেউই পদ-পদবি চাইতাম না। কামাল ক্লাবের সভাপতি হন ১৯৭৫ সালে।

শেখ কামালের সাংগঠনিক দক্ষতা সম্পর্কে একটু বলুন।

 আমাদের দেশে আগে খুব নিম্নমানের ফুটবল খেলা হতো। লম্বা লম্বা পাস দিয়ে খেলা। আসলে তখন ফুটবলে আধুনিকতার কোনো ছোঁয়াই লাগেনি। শেখ কামাল কিন্তু চেয়েছিলেন ফুটবলের মানটা বাড়–ক, তাতে লাগুক আধুনিকতার ছোঁয়া। ও একদিন বললেন, আমরা এখন থেকে ইউরোপিয়ান ঘরানার ফুটবল খেলব। সেই লক্ষ্যেই ১৯৭৪ সালে কামালের উদ্যোগে দলের জন্য নিয়ে আনা হলো ব্রিটিশ কোচ উইলিয়াম বিল হার্টকে। তিনি এসেই ওয়ান টাচ, টু টাচ ফুটবল শেখালেন। এরপর থেকেই আবাহনীর নাম হয়ে গেল। সবাই বলতে লাগল আবাহনী আধুনিক ফুটবলের ধারক ও বাহক। শেখ কামালের চাওয়ায় আবাহনীর ছেলেরাই তখন একমাত্র বিদেশি পোশাক ও সরঞ্জাম দিয়ে খেলত। কামালের লক্ষ্য ছিল এটি একটি আদর্শ ক্লাব হবে। এই ক্লাবের মধ্য দিয়েই সারা দেশের সব তরুণ সমাজকে খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করবেন। কেবল আবাহনী নয়, শেখ কামাল ঢাকার সব ক্লাবকে নিয়েই ভাবতেন। ধানম-ি ক্লাব, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব, পুরান ঢাকার ক্লাবগুলোর সঙ্গে ওর খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। কারও সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু কামালের ক্রীড়াঙ্গনে একজনও শত্রু ছিল না। তিনি ছিলেন সবার শুভাকাক্সক্ষী। তিনি খুব ভালো ক্রীড়াবিদ ছিলেন। বলতেন আবাহনী ক্লাবে কোনো রাজনীতি চলবে না, চলবে কেবল খেলা আর খেলা। শেখ কামাল একটি শক্তিশালী জাতীয় দল গড়ার প্রক্রিয়াও শুরু করেছিলেন। তাদের বিদেশি কোচের অধীনে ট্রেনিং করানো, সুযোগ সুবিধা বাড়ানো, বিদেশে পাঠিয়ে ম্যাচ খেলানোর মতো কাজগুলো শুরু করেছিলেন। শেখ কামাল আর দশটি বছরও বাঁচলে দেখতেন দেশের ফুটবল এশিয়ার গ-ি ছাড়িয়ে যেত।

শেখ কামাল বিয়ে করেছিলেন প্রখ্যাত অ্যাথলেট সুলতানাকে। ...

 ১৯৭৪ সালেই শেখ কামালকে বিয়ে করানোর জন্য মেয়ে দেখা শুরু হয়েছিল। ওদের পরিবারে একটু আগেভাগে বিয়ের চল ছিল। আমরাও মেয়ে খুঁজছি চারদিকে। তো, সুলতানাও পূর্ব পরিচয়ের সুবাদে শেখ কামালের জন্য পাত্রী দেখা শুরু করেছিল। ও ছিল শেখ রেহানার বান্ধবী। একদিন বঙ্গবন্ধুর কাছে কে একজন বললেন, এত মেয়ে খুঁজছেন, মেয়ে তো আপনার হাতের কাছেই আছে। বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করলেন কোন মেয়েটা? শেখ রেহানা বলল, খুব সুন্দর মেয়ে, তাকে শেখ কামালের বউ করলে কেমন হয়? তখন বঙ্গবন্ধু ওর ছবি দেখে খোঁজ নিয়ে জানলেন সুলতানার বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী দবিরউদ্দিন। বঙ্গবন্ধু তাকে ডেকে পাঠিয়ে প্রস্তাব দিলেন। ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে তাদের বিয়ে হয়। সুলতানার সঙ্গে বিয়ে হওয়ায় যেটা হয়েছিল শেখ কামাল খেলাধুলার সঙ্গে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে গিয়েছিলেন। যদিও তাদের দাম্পত্য জীবনকাল ছিল মাত্র এক মাসের।

শেখ কামালের মৃত্যুতে নিশ্চয় খুব ভেঙে পড়েছিলেন?

 আগের দিন অর্থাৎ ১৪ আগস্ট শেখ কামালসহ আমরা সবাই নারায়ণগঞ্জের নাসিম ওসমানের বিয়ের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলাম রাজধানীর লেডিস ক্লাবে। সেখান থেকে শেখ কামাল চলে গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। কারণ পরের দিন বঙ্গবন্ধুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা। শেখ কামাল হয়তো অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। প্রস্তুতিটা দেখতে তিনি ওখানে গেলেন। সেখানে রাতে থাকলেন না কারণ ঘরে নতুন বউ। বাইরে থাকলে আম্মা (বঙ্গমাতা) রাগারাগি করবেন, এই কথা বলে তিনি বাসায় ফিরে যান। প্রকারান্তরে নিজের মৃত্যুও ডেকে আনেন। খুব ভোরে গুলির আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়। দরজা খুলে গুলির আওয়াজ কোন দিক থেকে আসছে বোঝার চেষ্টা করতেই বুঝলাম ওটা ৩২ নম্বরের আশপাশের কোনো দিক থেকে আসছে। তখনই কামালের বাসায় ফোন করার চেষ্টা করলাম। বহুবার ফোন করার পরও কেউ না ধরায় অস্থির হয়ে গেলাম। আমার এক ভাই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একজন সিকিউরিটি অফিসার। ও ওর হটলাইনে চেষ্টা করেও পাচ্ছিল না। অনেকক্ষণ পর রিসিপশনে ফোন করতে মুহিত ধরলেন। মুহিতকে জিজ্ঞেস করলাম শেখ কামাল কোথায়। মুহিত বলল কামাল ভাই আমার পাশেই আছেন। শেখ কামাল পাশ থেকে প্রশ্ন করলেন, কে? মুহিত আমার কথা বলতেই ফোন তুলে নিয়ে বললেন, কিছুই বুঝতে পারছি না। ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি বাড়ির দিকে আসছে। শেখ কামাল বলে যাচ্ছেন, কালো পোশাক পরে একজন একজন করে ছয়জন লোক আমাদের বাড়িতে ঢুকছে। রিসিপশনটা মূল গেটের কাছে ছিল। আমাকে ফোনে রেখেই শেখ কামাল মুহিতকে বলতে বললেন আমি বঙ্গবন্ধুর ছেলে শেখ কামাল? এ কথাটা মুহিতের আর বলতে হয়নি। কারণ যারা এসেছিল তারা শেখ কামালকে চিনত। তারা ঘরে এসে দু’তিনটা বাজে গালি দিয়ে ব্রাশফায়ার করতে শুরু করল। ব্রাশফায়ারের পর ফোনটা পড়ে গেল। আমি ওপাশ থেকে সব শুনছি। গুলির পর শেখ কামালের আর্তনাদ আমি শুনেছি। আর্তনাদের পর নিস্তব্ধ হয়ে গেল সব। আমি প্রায় ২০-২৫ সেকেন্ড দম বন্ধ করে ফোন কানে দিয়ে ওই আর্তনাদ শুনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। শেখ কামালের আর্তনাদ আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

সাড়ে তিন বছরে শেখ কামাল দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য যা করে গেছেন আমি মনে করি তারই ফল ভোগ করছে দেশ। নিজের কাজ দিয়েই তিনি সবার কাছে অমর হয়ে থাকবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত