২৮ বছর পর কাঁচা চামড়া রপ্তানি করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ
রূপান্তরের বাণিজ্য সম্পাদক আবুল কাশেমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে খোলামেলা সরকারের অবস্থান জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মফিজুল ইসলাম ২৮ বছর পর কাঁচা চামড়া রপ্তানির ঘোষণা দিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ছুটির সময়ে এ সিদ্ধান্ত কেন?
এখন চামড়া রপ্তানি নিষিদ্ধ আছে। আমরা রপ্তানি উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছি। এজন্য কোনো গেজেট জারির দরকার হবে না। আমরা চেয়েছি, সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া বিক্রি হোক। ট্যানারি মালিকরাও আমাদের কথা দিয়েছিলেন যে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারিত দরে তারা চামড়া কিনবেন। কিন্তু মাঠ পর্যায় থেকে আমরা ভিন্ন তথ্য পেয়েছি। চামড়ার দামে সমস্যা হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যে দর নির্ধারণ করেছে, সেই দরে চামড়া কেনা হয়নি। কোরবানির পশুর চামড়ার মূল্য এতিমখানা, গরিব, দুখী মানুষের অধিকার। তাদের জন্যই আমরা ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চাই।
রপ্তানি কি উন্মুক্ত? নাকি শর্তযুক্ত হবে?
কাঁচা চামড়া রপ্তানির ঘোষণা দেওয়ার পর ট্যানারি মালিকরা আমাদের কথা দিয়েছেন যে, ২০ আগস্ট থেকে তারা নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কিনবেন। তাতে একটা প্রভাব পড়বে। আমাদের মূল্যে কেনার বিষয়ে এরমধ্যে তারা ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা তাদের বলেছি আরও আগেই চামড়া কেনা শুরু করতে। তারা ১৭ আগস্ট থেকে কেনা শুরু করবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। এতে যদি দেখা যায়, চামড়া নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি হচ্ছে, তখন আমরা রপ্তানির অনুমতি দেব না। কারণ হলো, আমাদের রপ্তানিমুখী সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প যাতে দাঁড়াতে পারে। আমরা যেভাবে চাচ্ছি, সেভাবে যাতে এ শিল্প এগিয়ে যেতে পারে। নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কিনলে আমরা কাঁচা চামড়া বা ওয়েট ব্লু রপ্তানির অনুমতি দেব না। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত মূল্যে যদি চামড়া কেনাবেচা না হয়, তা হলে আমরা কেস টু কেস ভিত্তিতে প্রথমে ওয়েট ব্লু রপ্তানির সুযোগ দেব। তারপরও যদি পরিস্থিতি খারাপ দেখা যায়, তা হলে আমরা কাঁচা চামড়াও রপ্তানির সুযোগ দেব। এই হলো আমাদের সিদ্ধান্ত। তবে রপ্তানির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হবে। কেউ চাইলেই যেকোনো পরিমাণ, যখন-তখন রপ্তানি করতে পারবে, তা নয়।
যদিও ট্যানারি পল্লী শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিষয়, কিন্তু চামড়া কেনা ও রপ্তানির বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। ট্যানারি ব্যবসায়ীরা বলছেন যে, সিইটিপির সার্টিফিকেশন না থাকায় বাংলাদেশি চামড়ার দর আন্তর্জাতিক বাজারে কম। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভাবনা কী?
রপ্তানির অংশটুকু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। আর রপ্তানি এখন নিষিদ্ধ। তাই চামড়া নিয়ে আসলে আমাদের কিছু বলার নেই। চামড়া শিল্পের উন্নয়নে আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকেও অনেক কাজ করছি। আমাদের জেলা পর্যায়ে একটি প্রকল্প আছে। ১০০০ কোটি টাকার প্রকল্প। সেখানে চামড়া শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করছি। চামড়া যাতে সংরক্ষণ করে রাখা যায়, সেজন্য গুদাম বা কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ, কারিগরি উন্নয়নে ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার কাজ করছি। রপ্তানি বাড়াতেও আমরা কাজ করছি। চামড়া শিল্প যেহেতু শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে, ফলে তাদেরও স্টেক আছে।
সিইটিপির সার্টিফিকেশন না থাকার কারণে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা বিদেশ থেকে চামড়া আমদানি করে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করছে। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কোনো ভূমিকা রাখতে পারে কি?
এটা ঠিকই। ওয়ার্কিং লেদার গ্রুপের সার্টিফিকেট না থাকার কারণে বা সিইটিপির সার্টিফিকেশন না থাকার কারণে বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে সমস্যা হচ্ছে। বিষয়টা এখানেই।
এই সমস্যা দূর করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ে কোনো সুপারিশ থাকবে কি?
আমরা বলব, আন্তর্জাতিক মানদ- বজায় রেখে যাতে দেশে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। এ ব্যাপারে আমাদের অনুরোধ থাকবে ব্যবসায়ীদের কাছে। তবে আমার জায়গা থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়কে কোনো সুপারিশ করতে পারি না।
বাংলাদেশের চামড়া বিশ্বমানের। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায়ই রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুরোধ করে। সেই চামড়া মানুষ দাম না পেয়ে পুঁতে ফেলছে। কীভাবে দেখছেন বিষয়টি?
বাংলাদেশের চামড়া বিশ্বসেরা। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ আমাদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া নিতে আগ্রহী। ট্যানারি মালিকরা বলছেন, গত বছরের চামড়াই নাকি বিক্রি হয়নি। আমরা কী করে মেনে নেব, বলুন? আমরা প্রচার করেছি, লবণ দিয়ে চামড়া তিন মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। যারা পুঁতে ফেলছে বা ফেলে দিচ্ছে, তারা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ করেছে। তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে এটা করেছে। যারা উপকারভোগীÑ মাদ্রাসা বা এতিমখানা বা যেই হোক না কেন, তারা কিন্তু লবণ দিয়ে চামড়াটা রাখতে পারত। তারা কিন্তু সেই কাজটি করেনি। তা হলে কাজটা কি তারা ঠিক করল? যে কেউ এটা জানে যে, চামড়া পচে যাবে। কিন্তু এটাকে লবণ দিয়ে রাখা যায়। কীভাবে চামড়া ছাড়াতে হবে, কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে তা ব্যাপকভাবে প্রচার করেছি আমরা। তারপরও কেউ এই দায়িত্বটা পালন করল না।
অনেকে বলছেন, চামড়া রপ্তানির ঘোষণা আরও আগে দেওয়া উচিত ছিল?
ঈদের আগে কিন্তু আমি ঘোষণা দিয়েছিলাম যে, আমরা কাঁচা চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিতে পারি, যদি চামড়ার নির্ধারিত দর নিশ্চিত না হয়। চামড়ার দর নির্ধারণের মিটিংয়ে আমি এ কথা বলেছিলাম। তখন ট্যানারি মালিকরাও এ কথা শুনেছেন। কারণ, ট্যানারি মালিকরা ঈদের আগেই ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে, গত বছরের চামড়া বিক্রি হয়নি। যারা বিক্রি করেছে, তারা বলে আমরা টাকা পাইনি। তখনই আভাস পেয়ে আমি এ কথা বলেছি। কিন্তু মানুষ যে এতটা উতলা হয়ে চামড়া নষ্ট করবে, তা বুঝতে পারিনি। যারা পুঁতে ফেলছে বা ফেলে দিচ্ছে, তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।
কী পরিমাণ চামড়া পুঁতে ফেলা হয়েছে বলে মনে করছেন?
এর পরিমাণ সামান্য। কিন্তু উদ্দেশ্যমূলকভাবে এটা করা হয়েছে। দাম না হয় কম পাবে, কিন্তু পুঁতে ফেলবে কেন? দেশের সম্পদ কেন নষ্ট করবে? মিনিমাম তো একটা দাম আছে। সেই দামেই তারা বিক্রি করত। দেশ লাভবান হতো। তারাও তো কিছু টাকা পেত। হয়তো তাদের লাভ হতো না। কিন্তু কিছু টাকা তো পেত। আমরা চামড়া নিয়ে কোনো সিন্ডিকেট হতে দেব না।
চামড়া নিয়ে কি তা হলে সিন্ডিকেট কাজ করছে?
এটা আমি বলতে পারব না। কিন্তু বাস্তবতা কিছু আছে। তারা ব্যাংক থেকে ঋণ পায়নি। ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন নানা কথা বলতেছে। তাই তদন্ত না করে এটা বলা যাবে না যে, সিন্ডিকেট হয়েছে বা হয়নি।
সিন্ডিকেট বিষয়ে কোনো তদন্ত করার পরিকল্পনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আছে কি?
আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দেখছে বিষয়টি। আমরাও দেখব। সুনামগঞ্জ ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককে চামড়া পুঁতে ফেলা নিয়ে রিপোর্ট পাঠাতে বলেছি। সেগুলোও দেখব। আর এমনিতে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের বলেছিÑ যাতে চামড়া ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হয়, চামড়ার গুণাগুণ যাতে নষ্ট না হয়।
