বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় প্রশিক্ষণবিহীন কর্মচারী

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০১৯, ০৪:৩৩ এএম

প্রশিক্ষণবিহীন কর্মচারীদের দিয়ে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। তাদের অনেকে রোস্টার (কর্মঘণ্টার সূচি) ছাড়াই দায়িত্ব পালন করেছেন। মাঝেমধ্যে স্ক্যানিং মেশিনেও ক্ষুদ্রাস্ত্র শনাক্ত হচ্ছে না। দুই বছর ধরে ব্রিটিশ সংস্থা রেড লাইন কী ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে বা আমলে নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির দুর্বলতা দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি চিত্রনায়ক ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের ইলিয়াস কাঞ্চনের বিনা বাধায় অস্ত্র নিয়ে বিমানবন্দরে প্রবেশের রহস্য উদঘাটন করতে গঠিত বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে।

তবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ (বেবিচক) বলেছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট ছিনতাইয়ের পর শাহজালালসহ দেশের সব কটি বিমানবন্দরে নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তায় যারা দায়িত্ব পালন করছে, তাদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পুরো নিরাপত্তা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের ঘটনায় আমরা তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা হবে। তা ছাড়া প্রতিবেদনে যেসব তথ্য এসেছে, তা-ও আমরা আমলে নেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের সব কটি বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান বাড়াতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এ জন্য অত্যাধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি আনার পরিকল্পনা আছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছরের ৫ মার্চ বেসরকারি একটি ফ্লাইটে করে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। নিজের লাইসেন্স করা পিস্তলটি লাগেজে বহন করেন তিনি। সে বিষয়টি বিমানবন্দরের

অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের প্রি-বোর্ডিংয়ে (অ্যান্টি হাইজ্যাকিং গেট) কর্তব্যরত একজন  নিরাপত্তা সুপারভাইজার ও আনসার সদস্যকে অবহিত করেন ইলিয়াস কাঞ্চন। এরপর লাগেজে থাকা পিস্তল ও ল্যাপটপ দেন স্ক্যানার মেশিনে। কিন্তু মেশিনে অস্ত্র ধরা পড়ার আগেই স্ক্যানিং মেশিন বন্ধ করে দেন অপারেটর হেমায়েত। এ ঘটনার পর সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি সাড়ে চার মাস ধরে তদন্তকাজ সম্পন্ন করে। ৩৪ জনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। এর মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণবিহীন কর্মচারী দিয়ে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টিও।

বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবু সাঈদ মেহবুব খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিমানবন্দর একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থায় গাফিলতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

বেবিচকে পাঠানো মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানবন্দরের যতবারই নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করা হয়, ততবারই ‘জিএসও’ নামক প্রশিক্ষণের সনদ নবায়ন বাধ্যতামূলক করা রয়েছে। কিন্তু গত ৫ মার্চ অভ্যন্তরীণ ওই গেটে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এরিয়া নিরাপত্তা সুপারভাইজার শহীদুল আলমকে ৯ মাস আগে মেয়াদোত্তীর্ণ নিরাপত্তা সনদ দিয়ে এই পদে পুনর্বহাল করা হয়। বিমানবন্দরে কর্তব্যরত নিরাপত্তা কর্মকর্তা (ডিএসও) মো. রোকনউদ্দিন মৌখিকভাবে নির্দেশনা দিয়ে শহীদুলকে একই পদে পুনর্বহাল করেন। ওই দিন ইলিয়াস কাঞ্চন তাড়াহুড়া ও মোবাইল ফোনে কথোপকথনে ব্যস্ততার মধ্যে বিমানবন্দরে ভুলক্রমে লাইসেন্স করা পিস্তলটি নেওয়ার পর আনসার সদস্যদের অবহিত করা সত্ত্বেও স্ক্যানিংয়ে দায়িত্বরত শহীদুল আলম তার দায়িত্বে গাফিলতি করেছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অ্যান্টি স্ক্যানিং গেটে কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্ব হচ্ছে স্ক্যানিংয়ে সন্দেহজনক বা ঝুঁকিপূর্ণ কোনো বস্তু ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যাগের মালিককে ডেকে অবহিত করা। কিন্তু ইলিয়াস কাঞ্চনের বেলায় তা করা হয়নি। এমনকি বিমানবন্দরসহ পুরো ফ্লাইটের নিরাপত্তার স্বার্থে অ্যান্টি হাইজ্যাকিং পয়েন্টের স্ক্যানিং মেশিনে ২০ মিনিট পরপর স্ক্যানিং পরিবর্তনের কথা থাকলেও ঘটনার দিন টানা চার ঘণ্টায় মাত্র একজন ‘জিএসও’ প্রশিক্ষণের মেয়াদ থাকা সনদধারী অপারেটর রাখা হয়, যাতে বিমানের নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এ ঘটনায় বিমানের নিরাপত্তার স্বার্থে কার্যকরী দ্রুত ব্যবস্থাসহ শহীদুল আলমকে ওই দিন কর্তব্যে নিয়োগকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।  

তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘটনার সময় বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে প্রশিক্ষণবিহীন ও রোস্টারবিহীন অনেকেই নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছে। এতে বলা হয়, যাত্রীদের তল্লাশি করা হয় না, যাত্রীদের কোর্ট, জুতা খোলা হয় না। যেসব নিরাপত্তা কর্মচারী এভাবে ঢিলেঢালা বা গা-ছাড়াভাবে দায়িত্ব পালন করেছে, তাদের শুধু মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছিল। এখনো এসব ঘটনা ঘটছে বলে তদন্ত কমিটি তথ্য পায়।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্ত কমিটি ইলিয়াস কাঞ্চন, হেভি লাগেজ গেটের আনসার সদস্য মাইনুল ইসলাম, মেহেদী হাসান, নাজমুল আনসার, নার্গিস বেগম, মিজানুর রহমান, ঘটনার পরপরই বরখাস্ত হওয়া ফজলার রহমান, আশরাফুল আলম, কানু সরেন, সুনীল চন্দ্র, মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, পুরুষ বডি সার্চার নাইমুর রহমান, দ্বিতীয় স্ক্যানিং অপাারেটর আবদুল আলিম, নারী বডি সার্চার রাজিয়া আক্তার, অ্যান্টি হাইজ্যাক গেটের স্ক্যানিং অপারেটর হেমায়েত উল্লাহ সুজন, পোস্ট সুপারভাইজার আবদুল বারি, স্ক্যানিং অপারেটর আলমগীর হোসেন, নিরাপদ সড়ক চাইয়ের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম আজাদ হোসেন, এরিয়া সুপারভাইজার শহীদুল আলম, বেবিচকের ডিউটি সিকিউরিটি অফিসার রোকন উদ্দিন, এভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্সের (অ্যাভসেক) নিরাপত্তা অফিসার রাশিদা সুলতানা, এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ম্যানেজার নওশীন মাহবুব, স্কোয়াড্রন লিডার কাজী হাসিবুল ইসলাম, অ্যাভসেকের পরিচালক নুরে আলম সিদ্দিকী, গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল্লাহ আল ফারুক, এম শাহিদুর রহমান, খান শাহীনুল বারী, অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার সফিউল মোসলেমিন খান, মোহাম্মদ আলমগীর, ইফতেকার জাহান হোসেন, শাহ মো. ইমদাদুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা বিমানবন্দরের নিরাপত্তাসহ নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলেন।

তিনি বলেন, ইলিয়াস কাঞ্চনের ঘটনার পর কিছুদিন কঠোর নিরাপত্তা ছিল। কিন্তু এখন আগের মতোই সবকিছু হচ্ছে। নিরাপত্তায় যারা (বেবিচকের সদস্য) আছেন বেশির ভাগেরই প্রশিক্ষণ নেই। মূলত প্রশিক্ষণ ছাড়া কেউ নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে পারে না। তবে পুলিশসহ অন্য সংস্থার সদস্যদের প্রশিক্ষণ নিয়ে কারও প্রশ্ন ছিল না।

মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণে দুজন জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ও দুজন বিশেষ পরামর্শক রয়েছেন। পদবিতে পরামর্শক হলেও মূলত তারা নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত, যাদের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের আলোকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা সাজানো হয়। কিন্তু কর্মকর্তারা ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর থেকে এ বছরের ৬ মার্চ পর্যন্ত ইলিয়াস কাঞ্চনকে নিয়ে ওই দুর্ঘটনার আগে চার মাস ধরে কোনো পরিদর্শন প্রতিবেদনই দেননি। তাদের গাফিলতির কারণেই নিরাপত্তা নিয়ে এ ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে। বিমানবন্দরে নিরাপত্তাসংক্রান্ত দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে বয়সের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। নিরাপত্তায় নিয়োজিত জ্যেষ্ঠ পরামর্শকসহ পরিদর্শকের দায়িত্বে নিয়োজিত পরামর্শকের মাধ্যমে চেক পয়েন্টে সরেজমিন পরিদর্শন করতে হবে।

সুপারিশে বলা হয়, ভিআইপিদের তালিকা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পয়েন্টসহ সংশ্লিষ্ট স্থানে সরবরাহ করতে হবে এবং তাদের প্রটোকলে দায়িত্ব পালনের জন্য দুজনকে নির্ধারণ করতে হবে। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অদক্ষতাসহ যেকোনো ধরনের লঘু কিংবা গুরুদণ্ড প্রমাণ হলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

বেবিচকের নিজস্ব জনবল, আনসার, পুলিশ ও বিমানবাহিনীর সদস্য নিয়োজিত আছে। তাদের মধ্যে পুলিশ ও আনসার বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। বিমানবন্দরের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে বিমানবাহিনী। তাদের কর্মকাণ্ড ও নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে বেবিচকের নিজস্ব কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অনাগ্রহ প্রকাশ করে থাকে। ফলে কর্মক্ষেত্রে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে সবার মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সুপারিশে উল্লেখ করা হয়, নিরাপত্তাবিষয়ক ব্রিটিশ পরামর্শক রেডলাইন দুই বছর কী কী সার্ভিস দিয়েছে এবং বিমানবন্দরে কতটুকু ব্যবহৃত হচ্ছেÑ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। টার্মিনাল গেটে সংরক্ষিত এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে জনবল, মেশিন, প্রশিক্ষণ ও চেকপয়েন্টে ডিজাইন সম্পর্কিত ফ্যাসিলিটির ব্যবস্থা করতে হবে। বেবিচক সদর দপ্তর এবং অ্যাভসেক বিভাগে যোগ্যতাসম্পন্ন ও দক্ষ জনবল বৃদ্ধি করতে হবে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সবাইকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং রোস্টার থাকতে হবে। বেবিচকের নিজস্ব জনবল ও অ্যাভসেকের বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে রুটিনকাজে সমন্বয়হীনতা নিরসনের জন্য চেকপয়েন্টে সমন্বিত হাজিরা বই রাখতে হবে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত