আজ থেকে চামড়া কিনবে ট্যানারিগুলো

দর মেনে কিনলে রপ্তানি নয়

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৯, ০১:৫১ এএম

আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতন ও গতবারের মজুদ থাকার দোহাই দিয়ে কোরবানির চামড়া কেনা থেকে হাত গুটিয়ে থাকা ট্যানারি শিল্প মালিকরা আজ শনিবার থেকে চামড়া কেনা শুরু করবেন। কাঁচা চামড়া রপ্তানি ঠেকাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দরেই চামড়া কেনার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। তাদের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। কেননা ট্যানারি মালিকরা নির্ধারিত দরে পর্যাপ্ত পরিমাণ চামড়া কিনলেই কেবল রপ্তানির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে সরকার। না হলে ঘোষণা অনুযায়ী চামড়া রপ্তানি শুরু করা হবে শিগগিরই।

এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মফিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ট্যানারি মালিকরা নির্ধারিত দরে চামড়া কেনা শুরু করার পর আমরা মাঠ পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করব। তাতে যদি মনে হয় কোরবানির সব চামড়া দর অনুযায়ী ট্যানারি মালিকরা কিনছেন, তাহলে রপ্তানি করতে দেব না। না হলে প্রথমে ওয়েট ব্লু (লোম ছাড়ানো চামড়া) ও পরে কাঁচা চামড়া রপ্তানি চালু করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

এবার সরকার নির্ধারিত দর অনুযায়ী, গরুর চামড়া ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৪৫-৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ এবং খাসির চামড়া ১৮-২০ এবং বকরির ১৩-১৫ টাকা। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোরবানির পশুর চামড়ার দর নির্ধারণের সময় থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দরের বিষয়ে ভুল তথ্য প্রচার করছেন ট্যানারি মালিকরা। সর্বশেষ গত ১৪ আগস্ট সংবাদ সম্মেলন করে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি বর্গফুট চামড়ার দর ৫০ সেন্টে নেমে এসেছে। কিন্তু বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ভালো মানের ওয়েট ব্লু চামড়ার আন্তর্জাতিক দর এক থেকে দেড় ডলার পর্যন্ত। আর সর্বনিম্ন মানের চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দরও ৫০ সেন্টের বেশি। এমনকি বাংলাদেশি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদাও কমেনি আন্তর্জাতিক বাজারে। তবে সাভার ট্যানারি পল্লীতে স্থাপিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন না থাকার কারণে বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত চামড়া দিয়ে তৈরি পণ্য আমদানি করতে আগ্রহী নয় জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো। এক্ষেত্রে রপ্তানিমুখী ট্যানারিগুলো বিদেশ থেকে চামড়া আমদানি করে তা থেকে পণ্য তৈরির পর রপ্তানি করছে।

চামড়া রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান টাইলেক্স এন্টারপ্রাইজের মালিক ইকবাল হোসেন জানান, বাংলাদেশে রপ্তানিমুখী ট্যানারি গড়ে উঠেছে। এবিসি লেদার নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে। প্রতিষ্ঠানটির আগামী তিন বছরের রপ্তানি সক্ষমতার পুরোটার রপ্তানি আদেশ আছে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটি মাসে ১০ লাখ জোড়া জুতা উৎপাদন করে। এপেক্সও কাঁচা চামড়া কিনে প্রক্রিয়াজাত করে তা থেকে উৎপাদিত চামড়াজাত পণ্য বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে। তবে জাপান, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করতে হলে বিদেশ থেকে প্রক্রিয়াজাত চামড়া আমদানি করে তা থেকে পণ্য তৈরি করতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, চামড়া খাতের এই দুরবস্থার জন্য ট্যানারি মালিকদের স্বেচ্ছাচার ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতা দায়ী। ২০০৩ সালে সাভাবে ট্যানারি পল্লী স্থাপনে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হলেও এখনো সিইটিপি চালু করা সম্ভব হয়নি। ট্যানারি পল্লীর আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার আগেই হাজারীবাগ থেকে সাভারে কারখানাগুলো স্থানান্তর করা হয়েছে। যেসব ট্যানারি ব্যবসায়ীর নিজস্ব ট্যানারি নেই, অন্যের ট্যানারি ভাড়া করে চামড়া প্রক্রিয়াজাত শেষে রপ্তানি করতেন, কারখানার অভাবে তারা রপ্তানি করতে পারছেন না। আবার সাভারে যারা প্লট পেয়েছেন, সেগুলোর এখনো রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন না হওয়ায় অনেক মালিক ট্যানারি স্থাপন করছেন না। ফলে কোরবানির সময়ে চামড়ার চাহিদা কমে গেছে ট্যানারি মালিকদের। এ কারণেই তারা চামড়া কেনা থেকে হাত গুটিয়ে আছেন। আর আড়তদাররাও যেন পর্যাপ্ত চামড়া কিনতে না পারেন, সে জন্য ব্যাংক থেকে ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ পাওয়ার পরও তাদের বকেয়া পরিশোধ করেননি ট্যানারি মালিকরা। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, গতবারের চামড়া বিক্রি করতে না পারায় আড়তদারদের পাওনা পরিশোধ করতে পারছেন না তারা। এ সমস্যা সমাধানে আগামীকাল রবিবার ত্রিপক্ষীয় সভা ডেকেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। 

অবশ্য এই সময়েও নির্ধারিত দরের চেয়ে কিছুটা বাড়তি দামে চামড়া কিনছেন কোনো কোনো ব্যবসায়ী। টাইলেক্স এন্টারপ্রাইজের মালিক ইকবাল হোসেন নিজেই নির্ধারিত দরের চেয়ে প্রতি চামড়ায় ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা বেশি দিয়ে ১০ হাজার পিস চামড়া কিনেছেন। তার নিজস্ব কোনো ট্যানারি নেই। অন্যের ট্যানারি ভাড়া নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করার পর রপ্তানি করেন তিনি।

দেশ রূপান্তরকে ইকবাল হোসেন বলেন, হাজারীবাগে ২৫০ ট্যানারি ছিল। তাদের বেশিরভাগের মালিক অন্যদের কাছে ফ্যাক্টরি ভাড়া দিত। আমিও একটি ভাড়া নিয়ে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করতাম। কিন্তু সাভার ট্যানারি পল্লীতে আমার মতো ভাড়াটিয়া ট্যানারি ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের জন্য কোনো প্লট করা হয়নি। সেখানে ১৫৩টি প্লট করে হাজারীবাগে যাদের ট্যানারি ছিল, তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে প্লটের রেজিস্ট্রেশন এখনো দেয়নি শিল্প মন্ত্রণালয়। আগে যারা ফ্যাক্টরি ভাড়া দিতেন, তারা সাভাবে ট্যানারি করছেন না। তাদের চিন্তা হলো প্লটের রেজিস্ট্রেশন হওয়ার পর তা বিক্রি করে দেবেন আমাদের মতো রপ্তানিকারকদের কাছে। এ কারণে সাভারে ট্যানারির সংখ্যা কম, অন্যদিকে কারখানা না পাওয়ায় অনেকে রপ্তানি করতে পারছেন না। নিজের ট্যানারি থাকলে আরও ২০ হাজার পিস চামড়া কিনতেন বলে জানান তিনি।

নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দরে চামড়া কেনার পর লোকসান হবে কি নাÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি যাদের কাছে রপ্তানি করি, তাদের কাছ থেকে একটু বেশি দাম পাই। তাই পিসপ্রতি ১৫০-২০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনলেও আমার লোকসান হবে না।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন গঠিত প্রাইভেট সেক্টর ডেভেলপমেন্ট পলিসি কো-অর্ডিনেশন কমিটির সাম্প্রতিক এক বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের সময় প্রত্যাশা করা হয়েছিল যে, আধুনিক পদ্ধতিতে কমপ্লায়েন্ট শিল্প হিসেবে ট্যানারি খাত থেকে রপ্তানি বাড়বে। পরিবেশ দূষণ রোধ হবে। কিন্তু তা হয়নি, বরং উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। রপ্তানিতে দরপতন ও উৎপাদন কমে যাওয়ায় ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়ার চাহিদা কমে গেছে। এ কারণেই কোরবানির পশুর চামড়ার দর গত কয়েক বছর ধরে তলানিতেই রয়ে গেছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের খসড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উন্নয়ন নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশের ট্যানারি খাত বেশ কিছু সুবিধা ভোগ করে আসছে। এই নীতিমালার ভূমিকায় বলা হয়েছে, দেশে উৎপাদিত চামড়ার সহজলভ্যতা, বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত চামড়ার উৎকৃষ্টমানের সূক্ষ্ম বুনন ও মসৃণতা। বাংলাদেশের বেশিরভাগ পশুই গৃহপালিত, যা বিশ্বের মোট গবাদিপশুর ১ দশমিক ৮ শতাংশ ও ছাগলের ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। কোরবানির সময় তুলনামূলকভাবে কম দামে একসঙ্গে বিপুল চামড়া পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তা সত্ত্বেও রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে শিল্প মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশের ট্যানারিগুলোর বিশ্বের প্রধান প্রধান ব্র্যান্ড ও রিটেইলারের পণ্য সম্পর্কে ধারণা কম এবং তারা সময়োপযোগী ফ্যাশন অনুযায়ী পণ্য তৈরি করতে সক্ষম নয়। ভবিষ্যৎ চাহিদা পর্যবেক্ষণ করার মতো সক্ষমতাও কম। তাই বাংলাদেশের ট্যানিং শিল্পকে আরও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। উৎপাদন অবশ্যই চলমান ফ্যাশন ও উচ্চমান অনুযায়ী হতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, চামড়া শিল্প মোটামুটি তিন ধরনের। ওয়েট ব্লু, ক্রাস্ট ও ফিনিশড চামড়া, চামড়াজাত পণ্য (ব্যাগ, বেল্ট) এবং জুতা ও জুতার বিভিন্ন অংশ। গত পাঁচ বছরে চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যের রপ্তানি বৃদ্ধির হার ছিল ১৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। কিন্তু ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে। ওই বছর প্রবৃদ্ধি কমে ১২ শতাংশেরও বেশি। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়া পণ্যের রপ্তানি কমেছে ৬ শতাংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রাস্ট চামড়া রপ্তানি কমেছে প্রায় ৯২ শতাংশ, সঙ্গে কমেছে +চামড়া রপ্তানির পরিমাণও। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ২২০ বিলিয়ন ডলারের বাজার রয়েছে। বিশ্বব্যাপী চামড়া ও জুতা খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। ২০১০ সালে বিশ্বে জুতা উৎপাদন হয়েছে ১৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ বিলিয়ন ডলারে। ২০১৬ সালে বিশ্বে জুতা রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল বিশ্বে অষ্টম। ওই বছর বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবদান ছিল মাত্র ১ শতাংশ। 

এসব বিষয়ে শিল্প সচিব আবদুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিইটিপি পুরোদমে চালু না হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। মূলত এ বিষয়ে আমাদের আগের কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথম দিকে বেশি জটিলতা হয়েছে। বর্তমানে আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সিইটিপি নির্মাণ ও কার্যক্রম সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে যে সিইটিপি তৈরি করা হয়েছে তা আন্তর্জাতিক মানের। ট্যানারির বর্জ্য ডাম্পিং নিয়ে কিছুটা সমস্যা আছে। এ জন্য একটি প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে। ট্যানারির বর্জ্যগুলোকে পরিবেশসম্মত করতে যেসব যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হবে সেগুলো আমদানি করা হয়েছে, যা চট্টগ্রাম পোর্টে আছে। আশা করা যায়, শিগগিরই সেগুলো ছাড়িয়ে সাভারে নিয়ে আসা হবে। তখন বর্জ্য ডাম্পিং নিয়েও প্রশ্ন উঠবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত