২০ বছরে ক্ষমতার চূড়ায় পুতিন

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৯, ১১:২৫ পিএম

গত ৯ আগস্ট কয়েক মেয়াদে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টানা ২০ বছর ক্ষমতায় থাকার কৃতিত্ব অর্জন করলেন ভøাদিমির পুতিন। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে চতুর্থ মেয়াদ পূর্ণ করবেন। রাজনীতির মাঠে একেবারে শূন্য হাতে এসে ২০ বছরে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা পুতিনকে নিয়ে লিখলেন পরাগ মাঝি

মিলেনিয়াম রাত

৩১ ডিসেম্বর, ১৯৯৯। প্রায় মধ্যরাত। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই নতুন একটি যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে ইংরেজি ক্যালেন্ডার। মিলেনিয়ামকে স্বাগত জানাতে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর রেড স্কোয়ারে জড়ো হয়েছে অসংখ্য মানুষ। তারা সবাই একটি বড় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রতি বছরের মতো এবারও নতুন বছর উপলক্ষে রুশ প্রেসিডেন্ট কী বার্তা দেবেন তা শোনার জন্য সবার অধীর অপেক্ষা। মধ্যরাত পেরিয়ে গেলেও রুশ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের দেখা নেই। হয়তো তার হৃদরোগে শারীরিক অবস্থা ভালো নয়, এমনটাই ভাবছিল উপস্থিত জনতা। রাত ভোর হয়ে এলে বিশাল স্ক্রিনে একজনকে দেখা গেল শেষ পর্যন্ত। তিনি বরিস ইয়েলৎসিন নন। তার পরিবর্তে যাকে দেখা যাচ্ছে তিনি একজন সরকারি আমলা। তার জরাজীর্ণ শরীরে ভালোভাবে ফিট হয়নি কালো রঙের স্যুটটি। তবে, ও স্যুটে রাশিয়ান গোপন সংস্থা কেজিবি’র একটি লোগো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। লোকটি ঘোষণা করলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিন আমাকে তার দায়িত্ব পালনের আদেশ করেছেন।’

তার বক্তব্যটি এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে, মনে হচ্ছে তিনি একটি কাঠের পুতুল। চল্লিশোর্ধ্ব ওই ব্যক্তি উপস্থিত জনতাকে কিছুটা আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেন এবং বললেন, ‘ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি দেশের আইনকানুন, বাক স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিমালিকানার অধিকারকে সবার ওপরে রাখব।’

হঠাৎ করেই ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া ওই ব্যক্তিটি আর কেউ নন, ভ্লাদিমির পুতিন। ওই ঘটনার চারমাস আগে তাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন সবার আলোচনার বাইরে। প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তো বটেই, এমনকি মিলেনিয়ামের রাতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পরও কেউ ভাবেনি অনাহূত এই ব্যক্তিটিই হয়ে যাবেন রাশিয়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা এবং পৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি।

কেজিবি সদর দপ্তরে এক কিশোর

ছেলেবেলায় গোয়েন্দা গল্পের বই পড়ার পোকা ছিলেন ভøাদিমির পুতিন। আর এসব গল্পের অনুপ্রেরণায়ই মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি একদিন রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি’র সদর দপ্তরে গিয়ে হাজির হলেন। সেখানে গিয়ে জানালেন, তিনি গোয়েন্দা সংস্থায় যোগ দিতে চান। তার মুখে এমন কথা শুনে অফিসাররা শুরু করলেন হাসাহাসি। তারা তাকে বললেন, তুমি তো বাচ্চা ছেলে। কীসের গোয়েন্দা হবে। শারীরিক গড়নেও ছোটখাটো। কেজিবি’র মতো কঠিন দায়িত্ব তোমাকে দিয়ে হবে না। তবে এক কাজ করতে পারো। তুমি বরং দুই-তিনটা ভাষা  শেখো। আইনে লেখাপড়া করো। বড় হও। একসময় কেজিবি’র ডেস্কে কাজ করতে পারবে।

সেদিন হতাশ হয়ে ফিরে গেলেও সত্যি সত্যিই কিশোর পুতিন ভাষাশিক্ষায় মনোযোগ দিলেন এবং কয়েকটি ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনাও শুরু করলেন। ২৩ বছর বয়সে একদিন তার দরজায় কড়া নাড়ল খোদ কেজিবি। পুতিন সত্যি সত্যিই হয়ে গেলেন কেজিবি’র এজেন্ট।

১৯৯১ সালে জার্মানির বার্লিন দেওয়াল পতনের সময় তিনি ছিলেন কেজিবি’র কর্নেল। জার্মানিতে অবস্থান করেই দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। বার্লিন দেওয়াল ভেঙে দুই জার্মানিকে আবারও এক করার বিরোধী ছিলেন পুতিন। দেওয়ালটি ভেঙে ফেলার সময় মস্কোর কাছে সামরিক সহযোগিতাও চেয়েছিলেন। কিন্তু মস্কো তার ওই আবেদনে সাড়া দেয়নি। দেওয়াল ভাঙার কিছুদিন পরই কেজিবি’র দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন পুতিন। সে সময় রাজনীতিবিদদের প্রতি তার ক্ষোভ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত নিজেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তবে, কেজিবি’র সঙ্গে তার যোগাযোগ সবসময় ছিল। ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরের ডেপুটি মেয়র হিসেবে তিনি দায়িত্ব পেয়ে যান। যদিও ১৯৯৬ সালে তিনি আবারও পুরনো প্রতিষ্ঠান কেজিবি’তে যোগ দেন। ততদিনে নাম বদলে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল গোয়েন্দা সংস্থাটি। সে সময় সংস্থাটির ইন্টারনাল উইং এফএসবি’তে ২০ হাজার এবং এক্সটার্নাল উইং এসভিআর-এ ১৫ হাজার সদস্য ছিল। প্রত্যাবর্তন করার পর পুতিনকে এফএসবি’র প্রধান মনোনীত করা হয়। মূলত এখান থেকে শুরু হয় তার ক্ষমতার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া। তিনি তার শত্রুদের শক্ত হাতে মোকাবিলা শুরু করেন। ইউরি স্কুরাতভ নামে এক রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী এক সময় পুতিনকে জেলে নেওয়ার পাঁয়তারা করেছিলেন। ফলস্বরূপ এফএসবি তার পিছু নেয়। পরে দুই নারীর সঙ্গে স্কুরাতভ যৌনতায় লিপ্ত হয়েছেন এমন একটি ভিডিও সম্প্রচার করা হয় কিছু রুশ ও জার্মান টেলিভিশনের খবরে।

১৯৯৬ সালে তৎকালীন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের সঙ্গে পুতিনের সখ্য গড়ে ওঠে পুতিনের। পুতিনের মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে ইয়েলৎসিনই তাকে ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের পরিচালক পদের দায়িত্ব দেন। পরে ১৯৯৯ সালের ৯ আগস্ট পুতিনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন ইয়েলৎসিন। যেদিন তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করা হয় সেদিনই পুতিন বলেছিলেন যে, পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০০০ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি রাষ্ট্রপতি হতে চান। তবে সে সময় তার জনপ্রিয়তা ছিল শূন্যের কোঠায়।

যেভাবে ক্ষমতায় ২০ বছর

পুতিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও বছর দুই মূল ক্ষমতা ছিল তার চিফ অব স্টাফ আলেকজান্ডার ভালাসিনের হাতে। কারণ ভালাসিন পুতিনের চেয়েও ইয়েলৎসিনের পরিবারের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন। সেই সুযোগে তরুণ ভালাসিন ও তার বন্ধুরা সব ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি করেন। রাশিয়ার তখন ছিল ৮৯টি অঞ্চল। এসব অঞ্চলের গভর্নরদের কারও কাছেই কোনো জবাবদিহি করতে হতো না। তবে, এই অরাজক অবস্থায় পুতিন সুকৌশলে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নিতে সক্ষম হন। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও লোক দেখানো তৎপরতা চালান। টিভি সেন্টার থেকে শুরু করে তিনি তেল ও গ্যাস কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নেন। গ্রেপ্তার করেন বহু নাটের গুরুকে। তাদের মধ্যে একজন হলেন ভালাসিনের অনুগামী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মিখাইল খোদরকভিস্কি। তার প্রাইভেট বিমান ছিল। এ বিমানের ছবি পুতিনের নিয়ন্ত্রণাধীন টিভিতে হাজারবার প্রদর্শিত হয়। রুশ নাগরিকরা বলতে শুরু করলেন, রাশিয়াকে রক্ষা করবেন পুতিন। এ সময় রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থাও হঠাৎ করে ভালো হয়ে ওঠে। দেশটিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উন্মেষ ঘটে। প্রচুর বেড়ানো এবং মার্কেটিং করার সুযোগ সৃষ্টি হয় তাদের। অনেক বিশ্লেষক এই উন্নয়নকে শুভ লক্ষণ বলে অভিহিত করেন। কল-কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। যদিও বিরোধীরা এসব উন্নয়নের জন্য পুতিনকে কোনো কৃতিত্ব দিতে চাইছিলেন না। কারণ ওই সময়গুলোতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়ে ওঠে রাশিয়া।

তবে, পুতিনের জনপ্রিয়তার সূত্রপাত হয় মূলত ক্ষমতায় আরোহণের পরই চেচেন যুদ্ধে ভূমিকার জন্য। চেচনিয়ার বিদ্রোহীদের তিনি শক্ত হাতে মোকাবিলা করেছিলেন। ফলে নিজ দেশে সাধারণ মানুষের কাছে একজন শক্তিশালী মানুষ হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন।

পলেস্টার লেভাদা সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় পুতিনের জনপ্রিয়তা ৮৪ শতাংশে পৌঁছেছিল এখন পর্যন্ত তা ৬০ শতাংশের নিচে নামেনি। ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার কয়েকটি শহরের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে রহস্যজনক বোমা হামলায় শতাধিক মানুষ মারা যায়। ওই ঘটনাকে রাশিয়ার নাইন-ইলেভেন বলা হয়। তখন পুতিন তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আমরা সবখানে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করব। তারা বিমানবন্দরে থাকলে আমরা বিমানবন্দরে যাব। আমরা কোনো ক্ষমা করব না।’ রুশ তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, ওই হামলার পেছনে ছিল ইসলামিক চরমপন্থিরা, যাদের পেছন থেকে সহায়তা করেছিল রুশ ধনকুবের বরিস বেরেজোভস্কি ও সাবেক গুপ্তচর আলেকজান্ডার লিটভিনেনকো। ২০১৩ সালে বেরেজোভস্কিকে যুক্তরাজ্যে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। আর লিটভিনেনকোকে পুলোনিয়াম-২১০ বিষপ্রয়োগে লন্ডনে হত্যা করা হয়।

২০০০ সালের পর থেকে রাশিয়ায় নির্বাচনে আর জয়-পরাজয় নিয়ে ভাবা হয় না। তখন থেকে নির্বাচনের মূল লক্ষ্য হলো, পুতিনের রাজত্বের ভিত আরও শক্ত করা। নেতা বাছাই করা নয়। ২০১৮ সালের মে মাসে চতুর্থ মেয়াদে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হয়েছেন পুতিন। ২০০৮ সাল পর্যন্ত দুই দফায় প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। তখন প্রেসিডেন্টের মেয়াদ ছিল ৪ বছর করে। এরপর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে প্রধানমন্ত্রী হন পুতিন। দিমিত্রি মেদভেদেভ তখন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। তবে ওই এক মেয়াদেই। এরপর ২০১২ সালে তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের পদে ফিরে যান পুতিন। তখনই আইনপ্রণেতাদের দিয়ে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ ২ বছর বাড়িয়ে ৬ বছর করান তিনি। চতুর্থ মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২৪ বছর ক্ষমতায় থাকা হয়ে যাবে পুতিনের। সোভিয়েত ইউনিয়ন পরবর্তী সময়ে এটিই সর্বোচ্চ।

বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়ার অগ্রযাত্রা

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পুতিনের নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে আইএস ও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযানের মধ্য দিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় রাশিয়া। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ অবসান ও আইএস নির্মূলের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে পুতিন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে শক্তিধর দেশগুলোর একটি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান। পরে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে সিরিয়ায় আইএস ও অন্য জঙ্গিদের অস্ত্রাগার, তথ্যকেন্দ্র ও গোপন ঘাঁটিগুলোর ওপর অব্যাহত বোমা হামলা শুরু করে রাশিয়া। রাশিয়ান মিগ-২০ যুদ্ধবিমানগুলো মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বীরদর্পে বিচরণ শুরু করে। যদিও এতে কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে একচ্ছত্র আধিপত্যের নায়ক আমেরিকা ও তার সহযোগী ব্রিটিশ সরকার।

বিশ্ব রাজনীতিতে সোভিয়েত রাশিয়ার যবনিকাপাতের দীর্ঘ ২০ বছর পর আবারও পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার ঘুরে দাঁড়ানোকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি ইঙ্গ-মার্কিন সরকার ও তাদের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট।

এর আগে ন্যাটো জোট ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যালেস্টিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরোধিতা করে ২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দখল করে নেন পুতিন। অবশ্য ওই দখলের ফলে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। কিন্তু তাতেও পুতিনের জনপ্রিয়তা কমেনি। গত বছরের শুরুতে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক ঘোষণায় জানায়, দেশের বিদেশি অর্থের রিজার্ভ ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একজন লৌহমানব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন পুতিন। বর্তমানে চীন, ইরান এবং তুরস্কের সঙ্গে যৌথভাবে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। ইসরায়েল ও হাঙ্গেরির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছেন। বছর খানেক আগেই ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। ওই সাক্ষাতে দুই নেতার আচরণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বিশ্ব গণমাধ্যম। টুইটারে সারা দুনিয়াকে হুমকি দিয়ে বেড়ানো ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পুতিনের সান্নিধ্যে গিয়ে অনেক ম্রিয়মাণ মনে হয়েছে।

এতদিন যে দেশগুলো রাশিয়ার বিরোধী ছিল এবং নানা অবরোধের মাধ্যমে দেশটিকে কোণঠাসা করে রাখত, সেই দেশগুলো এখন রাশিয়া আতঙ্কে ভোগে। এর অকাট্য প্রমাণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ধারণা করা হয়, যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিট গণভোট ও সর্বশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছিল রাশিয়া। শুধু আমেরিকা নয়Ñ ফ্রান্স, জার্মানি থেকে শুরু করে ইউরোপের অনেক দেশই এই ধরনের রুশ হস্তক্ষেপের আশঙ্কা করছে।

পুতিনের পর কে?

দুই দশক ধরে ক্ষমতায় পুতিন। এই ২০ বছর পর পুতিনের ক্ষমতার দেয়ালে কিছুটা ফাটল দেখা যাচ্ছে। ২০১৮ সালে মেয়র নির্বাচন নিয়ে দেশটিতে ক্রেমলিনের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে বিপুলসংখ্যক মানুষ রাস্তায় নামে। বিক্ষোভকারীরা পুতিনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনে।

এ বছরের জুলাইয়ে রাশিয়ায় কমপক্ষে ১০৭৪ জন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে। রাশিয়ার বিরোধীদলীয় নেতা অ্যালেক্সি নাভালনি এই প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন। অননুমোদিত বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেওয়ার কারণে গত বুধবার তাকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তারপরও কয়েক হাজার লোক ওই বিক্ষোভে যোগ দেয়। মিছিলে অংশ নেওয়া মানুষেরা ‘পুতিনবিহীন রাশিয়া’ ও ‘পুতিন পদত্যাগ করো’ সেøাগান দিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে ও লোকজনকে আটক করে।

সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুতিন পেয়েছিলেন ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট। আগের বারের তুলনায় তা অনেকাংশে বেশি। কিন্তু হঠাৎ করেই তার জনপ্রিয়তা কেন কমছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক মন্দাভাব, নিষ্পত্তিযোগ্য আয়ের নিম্নগতি ও অবসরকালীন বয়স বৃদ্ধিতে প্রেসিডেন্ট পুতিনের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন রাশিয়ানরা। পুতিনের ওপর আস্থা কমেছে ৩৩ শতাংশেরও বেশি রাশিয়ানের। ২০১৫ সালের জুলাইয়ের জরিপে দেখা যায় পুতিনের ওপর দেশটির ৭১ শতাংশ মানুষের আস্থা ছিল। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখলের পরিপ্রেক্ষিতে পুতিন তখন রাশিয়ানদের আস্থার প্রতীকে পরিণত হন। এ ছাড়া, তার ড্যাশিং পারসোনিলিটি, রোমান্টিক ইমেজ, সব ছাপিয়ে রাশানরা মনে করত পুতিনের ওপর নির্ভর করা যায়। কিন্তু পুতিনের জনপ্রিয়তার পালে এবার উল্টো হাওয়া বইছে ধীরে ধীরে।

২০২৪ সালে চতুর্থ মেয়াদ শেষে পুতিনের বয়স হবে ৭১ বছর। ওই সময় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মানতে হলে আবার প্রধানমন্ত্রী হতে হবে পুতিনকে। কারণ টানা তিনবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার নিয়ম নেই রাশিয়ায়। তখন পুতিনের হাতে বিকল্প থাকবে তিনটি। প্রথমত, চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং-এর মতো আজীবন ক্ষমতায় থাকার বিধান আনতে পারেন। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী পদে এক মেয়াদ থেকে আবার প্রেসিডেন্ট হতে পারেন। তৃতীয়ত, একজন উত্তরসূরির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সাধারণ মানুষের জীবনে ফিরে আসতে পারেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত