চামড়া কিনে অন্যের ট্যানারি ভাড়া নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করার পর রপ্তানি করছে টাইলেক্স এন্টারপ্রাইজ। এ বছরও কোরবানির পর সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে কিছুটা বেশি দিয়ে চামড়া কিনেছেন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. ইকবাল হোসেন। সরকারের রপ্তানি উন্মুক্ত করার ঘোষণার পর ভারতীয় ক্রেতারা কাঁচা চামড়ার জন্য যোগাযোগ শুরু করেছেন তার সঙ্গে। এ খাতে ৩২ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বাণিজ্য সম্পাদক আবুল কাশেম
ট্যানারি মালিকদের চামড়া কেনায় অনাগ্রহ কেন?
চামড়া কিনে তা আমাদের আরেক জায়গায় বিক্রি করতে হয়। আমরা চীন, কোরিয়া ও ইতালিতে আগে রপ্তানি করতাম। কোরিয়া ও ইতালির বাজার আগেই হাতছাড়া হয়েছে। এখন চীনের ক্রেতারাও সরে গেছেন। ফলে ট্যানারি মালিকরা রপ্তানির জন্য ক্রেতা খুঁজে পাচ্ছেন না। যাদের পাওয়া যায়, তারাও কম দামে অর্ডার দিতে চেষ্টা করছে। ২ দশমিক ২ ডলার থেকে এখন দর ১ ডলারে নেমেছে। তাও নিয়মিত এই দর পাওয়া যায় না। ২০১৪ সালের পর থেকে চামড়া কিনে প্রক্রিয়াজাত করে রাখার জায়গার অভাব হয়ে গেছে। একদিকে প্রক্রিয়াজাত করা চামড়া রপ্তানি করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে চামড়া রাখার জায়গা হচ্ছে না। এ কারণেই ট্যানারিগুলোতে চামড়ার চাহিদা কম।
তাহলে কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত কি যৌক্তিক?
এদিক থেকে বিবেচনা করলে রপ্তানির সুযোগ দেওয়া যৌক্তিক। কিন্তু রপ্তানি শুরু করলে চামড়া আর ট্যানারিতে ঢুকবে না। ঢাকার পোস্তা, নাটোরসহ সারা দেশের প্রধান আড়তগুলো থেকেই রপ্তানি হয়ে যাবে। আর আড়তদাররা যে পাওনা টাকার কথা বলছেন, তা সত্য। ট্যানারিগুলো পড়েছে বেকায়দায়। কারণ, গতবার তারা যে চামড়া কিনেছে, সেগুলো তো রপ্তানি করতে পারেনি। রপ্তানি করতে না পারলে বকেয়া দেবে কীভাবে?
বড় কোম্পানিগুলোর রপ্তানি চিত্র কেমন?
স্থানীয়ভাবে রপ্তানিমুখী কারখানা হয়েছে। এবিসি লেদার নামে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের আগামী তিন বছরের জন্য পর্যাপ্ত রপ্তানি আদেশ আছে। এপেক্সের কয়েকটা ইউনিট রয়েছে। তারাও কাঁচা চামড়া কিনে, নিজেরা প্রক্রিয়াজাত করে এবিসিকে দেয়, নিজেরা ব্যবহার করে ও রপ্তানি করে। কিন্তু জাপান, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করতে হলে তারা কেউই দেশের চামড়া ব্যবহার করতে পারে না। বিদেশ থেকে প্রক্রিয়াজাত করা চামড়া আমদানির পর রপ্তানি করে।
চামড়া শিল্পের উন্নয়নে সরকারের ভূমিকা কি যথেষ্ট?
চামড়া খাতের কোনো মা-বাপ নেই। এ খাতের উন্নয়নে সরকারের ভীষণ ভূমিকা দরকার। প্রথমত, চামড়া দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি পণ্য। এ খাতের জন্য কোনো অধিদপ্তর তো পরের কথা, কোনো বোর্ডও নেই। অথচ রেশম, তুলা উন্নয়নেও দেশে বোর্ড আছে। চামড়ার সুখ-দুঃখ নিয়ে চিন্তা করার কেউ নেই। সাভারে আন্তর্জাতিক মানের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। হাজারীবাগে থাকাকালে আমরা জোর-জবরদস্তি করে রপ্তানি করতাম। আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত না করেই সেখান থেকে আমাদের জোর করে সাভারে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
সাভারের ট্যানারিপল্লীতে আর কী কী সংকট রয়েছে?
হাজারীবাগে ২৫০টির মতো ট্যানারি ছিল। এর বড় অংশই ভাড়া দিত। অনেকে কাঁচা চামড়া কিনে অন্যের ট্যানারি ভাড়া নিয়ে প্রক্রিয়া করার পর রপ্তানি করত। আমিও তাই করতাম। কিন্তু এ ধরনের ট্যানারি ব্যবসায়ীদের জন্য সাভারে কোনো প্লট নেই। আমি নিজেই ট্যানারি করার জন্য জমি খুঁজতেছি। সাভারে ১৫৩টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেখানে অল্প কিছু ট্যানারি কাজ শুরু করেছে। বাকিরা আমাদের মতো অন্যের ট্যানারি ভাড়া নিয়ে কোনোমতে কাজ করছে।
আপনি কি এবার চামড়া কিনছেন?
আমি ১০ হাজার পিস চামড়া কিনেছি। নিজের ট্যানারি থাকলে হয়তো আরও ২০ হাজার পিস কিনতে পারতাম। সাভারে যারা প্লট পেয়েছেন, তাদের নামে এখনো রেজিস্ট্রেশন হয়নি। রেজিস্ট্রেশন হলেই তাদের অনেকে প্লট বিক্রি করে দেবেন, সেজন্য বসে আছেন। তখন আমার মতো লোকেরা হয়তো বেশি দামে কিনে নিয়ে কারখানা করতে পারবে। সরকারের উচিত ছিল সাভার ট্যানারিপল্লীর সব দিক থেকে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা, প্রকৃত ট্যানারি ব্যবসায়ীদের প্লট বরাদ্দ দেওয়া।
আপনি কি সরকার নির্ধারিত দরে চামড়া কিনেছেন?
আমি নির্দিষ্ট কিছু মাদ্রাসা ও এতিমখানা থেকে প্রতি বছর চামড়া সংগ্রহ করি। এবারও তাদের কাছ থেকেই কিনেছি। আমি সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে পিসপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনেছি। সামান্য বাড়তি দরে কেনার কারণ হলো, আমি যাদের কাছে রপ্তানি করি, তারা আমাকে একটু ভালো দাম দেয়।
এত সস্তা চামড়া আর কখনো ছিল কি?
বাংলাদেশে ট্যানারি ব্যবসা শুরু পাকিস্তান আমলে। তখন পাকিস্তানিরাই এ ব্যবসা করত। তখনো এত সস্তা ছিল না। কারণ, তখন লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ ছিল। পরে ওয়েট ব্লু রপ্তানি শুরু হয়। ১৯৯১ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়।
কাঁচা চামড়া রপ্তানি বন্ধের প্রেক্ষাপট কী ছিল?
জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। তখন তিনি বলেন যে, এজন্য কাঁচা চামড়া রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হবে। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি বাড়াতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া ছাড়াই শুধু জিয়াউর রহমানের ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে কাঁচা চামড়া রপ্তানি নিষিদ্ধ করে।
এবার কাঁচা চামড়া রপ্তানির ঘোষণার পর ক্রেতারা যোগাযোগ করছেন কি?
ভারতীয় এক ক্রেতা যোগাযোগ করেছেন। বলেছেন, যেহেতু তোমার দেশ কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ দিয়েছে, তাই দ্রুত আমাকে কিছু চামড়া পাঠাও। আমি এলসি (ঋণপত্র) খুলে পাঠাচ্ছি। আমি বললাম, সরকার শুধু ঘোষণা দিয়েছে। রপ্তানি এখনো উন্মুক্ত করেনি। তাই এখনই এলসি খোলার দরকার নেই।
