আধাদক্ষদের চাকরির সুযোগ কমছে

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৯, ১১:৪১ পিএম

সাধারণ শিক্ষা, সঙ্গে আধাদক্ষ শ্রমিকদের চাকরি কমছে বাংলাদেশে। ১৬ বছরে এমন আধাদক্ষদের চাকরির সুযোগ কমে গেছে ২০ শতাংশ। তবে একেবারেই অদক্ষ কিংবা উচ্চদক্ষদের চাকরি বাড়ছে। ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০১৯-এ তথ্য তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। দুনিয়াজুড়ে কাজের ধরন পাল্টে যাওয়ার ওপর জোর দিয়ে এ প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর শ্রমশক্তিকে জীবনভর শিখতে হয়। উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশে দক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা বাড়ছে। ২০০০ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত বলিভিয়া, ইথিওপিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় দক্ষ শ্রমিকের চাকরির সুযোগ বেড়েছে ৮ শতাংশ হারে। কিন্তু অদক্ষ ও আধাদক্ষদের চাহিদা তেমন বাড়েনি। জর্দানে আধাদক্ষদের চাকরি ২০০০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বেড়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে। এই ১৬ বছরে বাংলাদেশে মোটামুটি বা আধাদক্ষদের চাকরির সুযোগ কমে গেছে ২০ শতাংশ হারে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর চাকরির বাজারে এই পরিবর্তন বিস্ময়কর নয়।

প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি ও বিশ্বায়নের কর্মবাজারে এই পরিবর্তন আসছে জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দক্ষদের চাকরির সুযোগ প্রতি বছর প্রায় ১ শতাংশ হারে বাড়ছে। আধাদক্ষদের চাকরির সুযোগ কমছে প্রায় ১.৫ শতাংশ হারে। আর অদক্ষদের চাকরির ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হচ্ছে প্রায় দশমিক ২৫ শতাংশ হারে।

কিছু উন্নয়নশীল দেশ আধাদক্ষদের কর্মসংস্থান বাড়াতে তৎপর হয়েছে। সেসব দেশ ছাড়া বাকিগুলোতে এ শ্রেণির শ্রমশক্তির চাকরির সুযোগ কমে যাচ্ছে। ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ কর্মশক্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমশক্তির আচরণগত দক্ষতা ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সহজেই খাপ খাওয়ার দক্ষতাও থাকতে হবে। সাম্প্রতিক দশকগুলোর কাজের ধরন পরিবর্তনের আলোকে বিশ্বব্যাংক বলেছে, বলিভিয়া ও কেনিয়ার ৪০ শতাংশ কম্পিউটার ব্যবহারকারী কর্মী জটিল কাজ ও অ্যাডভান্স প্রোগ্রামিং করতে সক্ষম।

ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, সেøাভাক রিপাবলিক, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন ও সুইজারল্যান্ডের চাকরির বাজার বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক বলেছে, জটিল সমস্যা সমাধানে দক্ষদের বেতন ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেশি হয়। আর্মেনিয়া ও জর্জিয়ায়ও নতুন দক্ষতা অর্জনে সক্ষমদের বেতন একই পর্যায়ের অন্যদের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। সংস্থাটি বলেছে, ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দেশগুলো ডিজিটাল প্রযুক্তিবিষয়ক দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের ফার্মগুলো সামাজিক আচরণে দক্ষ কর্মীর তীব্র সংকটে রয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬ নম্বরে। অনলাইনে কাজের সুযোগ দক্ষদের কাজের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক বাধা দূর করছে জানিয়ে এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের অনলাইন লেবার পোলে বাংলাদেশের অবদান ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের রয়েছে ৬ লাখ ৫০ হাজার ফ্রিল্যান্সার ওয়ার্কার। ২০১৬ সালে ভারতে প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়েজ দলগতভাবে ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং করছে।

ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ করে গড়ে তুলতে সামাজিকীকরণের ওপর জোর দিয়ে বিশ্বব্যাংক বলেছে, তিন বছর বয়স থেকেই শিশুদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। যারা এই বয়সে প্রাক-প্রাথমিকে পড়ে, তারা প্রাথমিক শিক্ষায় সফলতা পায়। মানসম্পন্ন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা শিশুর কার্যক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলের যেসব শিশু প্রাক-প্রাথমিকে পড়ে, তারা অন্যদের তুলনায় আগে বলতে, লিখতে ও অঙ্ক কষতে পারে।

বিআইডিএসের ১৮ জন গবেষক ২০১৭ সালে ‘বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও দক্ষতার ঘাটতি’ শিরোনামে একটি সমীক্ষা করেন। তাতে বলা হয়, ২০২৫ সাল নাগাদ দেশে বিভিন্ন খাতে মোট ৮ কোটি ৮৭ লাখ শ্রমিকের দরকার হবে। এই সময় পর্যন্ত দেশের ৯টি শিল্প খাতে নিয়োগ দিতে হবে আরও ১ কোটি ৬৬ লাখ ৮৪ হাজার নতুন শ্রমিক। তাদের মধ্যে দক্ষ শ্রমিক লাগবে ৮০ লাখ, আধাদক্ষ ৫৬ লাখ, অদক্ষ শ্রমিক লাগবে ৩১ লাখ। ৮০ লাখ দক্ষ শ্রমিকের জোগান নিশ্চিত করতে হলে ২০২৫ সাল নাগাদ ৫৬ লাখ শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।

সমীক্ষায় বলা হয়, দেশে এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পর উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার ঝোঁক বাড়ছে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হলেও তাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে দক্ষতা গড়ে উঠছে না। আর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছে, তার সঙ্গে শিল্প খাতের চাহিদার কোনো সামঞ্জস্য নেই। আর উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে কোনো একটি কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া বা ডিপ্লোমাসম্পন্ন করার আগ্রহ থাকে না। ফলে শিল্প খাতে এসব উচ্চশিক্ষিত দক্ষ শ্রমিক হিসেবেও নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছেন। ফলে শিল্প খাতে শিক্ষিত শ্রমিকের সংকট রয়েছে। তবে এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পর যারা বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার খুবই কম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত