আফগানদের সামলাতে মুশফিকের প্রস্তুতি

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৯, ১২:৪৯ এএম

 ‘প্রস্তুতি যত কঠিন লড়াই তত সহজ।’ সকাল সকাল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের সেন্টার উইকেটে মুশফিকুর রহিমের দিকে তাকিয়ে যে কারও মনে প্রথমেই এই কথাটা চলে আসতে পারে। কন্ডিশনিং ক্যাম্পের অধিকাংশ খেলোয়াড়ের ফিটনেসের ঘাটতি নিয়ে ট্রেনারের আক্ষেপ। প্রথম দু’দিন বরাদ্দ বিপ টেস্টে। সেখানে মুশফিক মূর্তিমান ব্যতিক্রম। সেন্টার উইকেটে তার ব্যাটিং প্রস্তুতি চলছে। এবং বোলার তালিকায় কে নেই? অফ স্পিনার, লেগ স্পিনার, চায়নাম্যান, বাঁহাতি স্পিনার, ডানহাতি মিডিয়াম পেসার, বাঁহাতি ফাস্ট বোলার, ভিন্ন অ্যাকশনের স্পিনার কিংবা পেসার। এই হিসাব কষতেই দেখুন আট ধরনের বোলিং উঠে এলো!

গতকাল সকালে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের এই প্রস্তুতি শেষে ড্রেসিংরুমটার কাছে ফেরেন ঘামে নেয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক। মিস্টার ডিপেন্ডেবলকে দূর থেকে একজন প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘কয় ঘণ্টা ব্যাট করলেন?’

‘এই তো ঘণ্টাখানেক।’ তিনি মুশফিক বলেই দুই ঘণ্টার মতো সময়কে আধেক মনে হয়। পর্যাপ্ত নক করা হয়নি তাহলে!

‘কয়জন বোলারকে খেললেন?’ আরেক প্রশ্ন।

ড্রেসিং রুমে ঢুকে যাওয়ার আগে মুশফিকের জবাব, ‘৭-৮ জন হবে।’

আসলে সংখ্যাটা ১২-১৪-এর কম নয় মোটে। মোস্তাফিজুর রহমান, মাহমুদউল্লাহ, ইবাদত হোসেন, তাইজুল ইসলাম ছাড়াও কয়েকজন চেনা-অচেনা বোলার টানা বল করে গেছেন। একজন নিয়মিত বল ছুড়েছেন থ্রোয়ার দিয়ে। মুশফিক কখনো সামনে কখনো পেছনে ডিফেন্স করেছেন। কখনো মন দিয়েছেন শুধু গ্রাউন্ডে খেলতে। কখনো বোলার পিক করে পুল করেছেন, উড়িয়ে মেরেছেন লাগাতার। আবার কখনো কাউকে কেবল ব্যাকফুটে খেলে গেছেন। আবার এমন কাউকে কেবল ফ্রন্টফুটে ডিফেন্স করেছেন বা মেরে দিয়েছেন। আবার নিপুণ সতর্কতায় ডাউন দ্য উইকেটে গিয়ে শক্তির প্রয়োগে বলকে হাওয়ায় ভাসিয়েছেন। মুশফিকের মনোযোগে একবিন্দু ভাটা পড়তে দেখা যায় না। বলের লাইন মিস করা কিংবা বলকে নিজের মতো করে খেলতে না পারার ব্যর্থতায় বলতে গেলে কখনো পুড়তে হয়নি। কী সাবলীল!

‘সামনে সিরিজ খেলতে হবে তো। তাই একটু প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ এমনিতে নিজের প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলতে সবসময় একটু মুখচোরা মুশফিক। এদিন সবকিছু শেষে কুলডাউন করে ফিরেছেন গাড়ির কাছে। তখন আরেক দফা তার কাছে জানতে চাইলে ছোট্ট ছোট্ট করে জবাব দেন। যেন এটাই তো স্বাভাবিক। একটা বড় লড়াইয়ে নামার আগে এভাবে বৈচিত্র্যময়, কঠোর প্রস্তুতি না নিলে কি চলে?

নানা ধরনের বোলার খেললেন। একটু অন্য রকমের প্রস্তুতি না?

কথাটা শুনে মুশফিকের উত্তর, ‘আসলে

আফগানিস্তান দলে কয়েকজন ক্যাকড়া বোলার আছে তো। কেউ লেগ স্পিনার, কেউ চায়নাম্যান। ওদের খেলতে হবে।’ ‘ক্যাকড়া’ বোলার বলতে আনঅর্থোডক্স আর কি। ৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের একমাত্র টেস্ট। মর্যাদার লড়াই অনেক এগিয়ে থাকা বাংলাদেশের জন্য। তো আফগানদের অধিনায়ক লেগ স্পিনার রশিদ খানকে নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। রহমত শাহ গুগলি লেগি। ১৯ বছরের কাইস আহমেদ যুব বিশ্বকাপে সেরা পারফরম্যান্স দিয়ে উঠে আসা বৈচিত্র্যময় লেগ স্পিনার। মোহাম্মদ নবী অভিজ্ঞ অফ স্পিনার। ২০ বছরের জহির খান চায়নাম্যান বোলার। জাভেদ আহমাদি অফব্রেক করেন। এরপর জিম্বাবুয়ে ও আফগানদের নিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ। সেখানে আছে শারাফুদ্দিন আশরাফের মতো বাঁহাতি স্পিনার। ১৮ বছরের ভিন্নধর্মী অফব্রেক বোলার মুজিব উর রহমান। প্রস্তুত থাকতে হবেÑ জেদ মুশফিকের।

বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ দল নিয়ে নানা প্রশ্ন। সেখানে ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সাকিব আল হাসান ও মুশফিক ছাড়া আর কাউকে চোখে পড়ে না। সাকিব করেছেন ভিনগ্রহের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স। মুশফিক বাংলাদেশের দ্বিতীয় সেরা পারফরমার ছিলেন। অবস্থানের দিক দিয়ে বিশ্বকাপে ১৬তম ব্যাটসম্যান। কিন্তু ৮ ম্যাচে ৩৬৭ রান, সর্বোচ্চ অপরাজিত ১০২। এক সেঞ্চুরির সঙ্গে দুই ফিফটি। গড় ৫২.৪২। স্ট্রাইক রেট ৯২.৬৭। ৩০ বাউন্ডারি, ২ ছক্কা।

এরপর শ্রীলঙ্কায় হোয়াইটওয়াশের লজ্জায় ডোবা বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিরোধের নাম ছিল ‘মুশফিক’। ৩ ম্যাচে ৮৭.৫০ গড়ে ১৭৫ রান। সর্বোচ্চ অপরাজিত ৯৮। দুই ফিফটি। সিরিজে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রান। সামান্য কয়েকটা রান নিয়ে লঙ্কান দুই ব্যাটসম্যান তালিকার এক ও দুইয়ে। মুশফিক তৃতীয়।

তো মাত্রই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১৩ বছর পার করা মুশফিক বছরের প্রায় প্রতিদিন নিজ উদ্যোগে প্র্যাকটিস করেন। ফিটনেসে ঘাটতি পড়ে না তাই কখনো। এদিন যেমন কয়েকজন বোলারকে নিজ খরচেই নেটে নিয়ে এসেছেন। ‘দুই-তিনজনকে এনেছি। ওরা অনূর্ধ্ব-১৯ কিংবা বিভাগীয় দলের।’ টেস্ট আর ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলার ঢের আগেই প্রস্তুত হয়ে উঠছেন মুশফিক। ২১৬ ম্যাচের ক্যারিয়ার তার। ২০২ ইনিংসে ৬১০০ রান ৩৬.৩০ গড়ে। স্ট্রাইক রেট ৭৯.০৩। সেঞ্চুরি ৭টি। ফিফটি ৩৭টি।

কথায় বলে পরিশ্রমই সৌভাগ্যের প্রসূতি। তাহলে সাফল্য-দেব মুশফিকের পায়ে পায়ে না হেঁটে কি পারেন?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত