মেট্রোরেল পথে যাতায়াতকারীদের ভোগান্তির অন্ত নেই। বাস চলাচলের সুবিধার্থে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ফুটপাত। একদিকে হেঁটে চলা দায়, অন্যদিকে বাস চলে ধীরগতিতে। ভাঙাচোরা খানাখন্দে ভরা সড়কে রিকশা নিয়েও চলা দায়। ২০১২ সালে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্পের কাজ অর্ধেক শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৭ বছরে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩৪.৫৮ শতাংশ।
২০২৪ সালের মধ্যে উত্তরা থেকে মিরপুর হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় হবে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২০ সালের মধ্যে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ট্রেন চলাচল চালুর কথা ছিল। যদিও সে ঘোষণা থেকে পিছিয়ে এসেছে সরকার। বর্ধিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে কি না তা নিয়েও যথেষ্ট সংশয়ে আছে প্রকল্প তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। এই অবস্থায় আগামী সপ্তাহে প্রকল্পটির বিষয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ যাবে সংস্থাটির উচ্চপর্যায়ের একটি দল।
এ বিষয়ে আইএমইডির সচিব আবুল মনছুর মো. ফয়েজ উল্লাহ বলেন, মেট্রোরেল প্রকল্পটি ফাস্টট্র্যাকভুক্ত হওয়ায় নিবিড় পরিবীক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বে সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। এর আগে করা প্রতিবেদন ভোগান্তির বিষয়টি উঠে এসেছিল, যা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। এরপর নতুন করে পর্যবেক্ষণ করা হলে বিদ্যমান সমস্যা এবং এ থেকে উত্তরণে সুপারিশ সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রতিবেদন আকারে পাঠানো হবে। এতে তাদের করণীয় ঠিক করতে সহজ হবে বলে আশা করছি।
আগামী সপ্তাহে পর্যবেক্ষণের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মেট্রোরেল প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভুক্ত ফাস্টট্র্যাক প্রকল্প। এজন্য এই প্রকল্পের পর্যবেক্ষণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা থাকলে তা উঠে আসবে। এছাড়া সার্বিকভাবে যথাসময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে করণীয় তুলে ধরা হবে আইএমইডি প্রতিবেদনে। আগামী সপ্তাহে আইএমইডির মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব মো. কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে এই পর্যবেক্ষণ দল প্রকল্প পরিদর্শন করবে। তিনি আরও বলেন, চলমান প্রকল্পের পর্যবেক্ষণ করা আইএমইডির দায়িত্ব। প্রতি তিন মাস অন্তর এই পর্যবেক্ষণে যাওয়ার কথা। কিন্তু অদৃশ্য কারণে গত ৬ মাসে এই প্রকল্পের পর্যবেক্ষণে যাননি কর্মকর্তারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরোদমে চলছে উত্তরা থেকে মিরপুর, ফার্মগেট হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের কাজ। ঈদের পর রাস্তায় গাড়ির চাপ কম থাকলেও এই রাস্তায় লম্বা জ্যাম। হাঁটার অবস্থা নেই। রাস্তা সরু, ভাঙা ও খানাখন্দ থাকায় রিকশায় চলাও দায়। আর বৃষ্টি হলে তো কথায় নেই, রাস্তায় জমে হাঁটুপানি। ফলে মেট্রোরেল নির্মাণের কারণে মূল সড়কের আশপাশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মিরপুর এলাকায় অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, বেশিরভাগের আয় আগের চেয়ে কমেছে।
এ রাস্তায় আরেকটি বড় সমস্যা ধুলাবালু। ফলে অনেক যাত্রী বদল করেছেন রাস্তা। কিন্তু অনেককে বাধ্য হয়ে চলাচল করতে হয়। ভোগান্তি বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) ও অতিরিক্ত সচিব আফতাব উদ্দীন তালুকদার দেশের বাইরে থাকার কারণে বিস্তারিত বলতে চাননি। তবে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ধুলাবালু কমাতে নিয়মিত পানি দেওয়া হচ্ছে। আর ভোগান্তি কমাতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ শেষ হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মেট্রোরেল নিয়ে আইএমইডির করা সর্বশেষ এক জরিপে ভোগান্তির বিষয়টি উঠে এসেছে। মেট্রোরেল প্রকল্প এলাকার ২৬০ জন নারী-পুরুষ ওই জরিপে মতামত দিয়েছেন। এদের ৯৪ শতাংশের মেট্রোরেল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি সংস্থার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই এলাকার যাত্রীদের বাসে প্রতি এক কিলোমিটার যেতে গড়ে ১৫ মিনিট সময় লাগে। সেই হিসাবে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে মতিঝিলের দূরত্ব প্রায় ১১ কিলোমিটার। এই পথ পাড়ি দিতে মিরপুরবাসীকে প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টা বাসে কাটাতে হয়। উত্তরদাতাদের ৮১ শতাংশ মিরপুর, আগারগাঁও, পল্লবীসহ মেট্রোরেলের আশপাশের এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন না। কিন্তু ভবিষ্যতে যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হবে, এই আশায় ভোগান্তি সহ্য করে তারা ওই এলাকায় ভাড়া থাকেন।
এ বিষয়ে স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, মেট্রোরেল নির্মাণকালীন মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এখন মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে হবে। জনদুর্ভোগ কমাতে অবশ্যই পদক্ষেপ থাকা উচিত। এছাড়া দ্রুত ও যথাসময়ে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হবে। মনিটরিং ঠিকঠাক হলে বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা জাপানকে দিয়ে এটা সম্ভব।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর একযোগে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চালু হবে। প্রথমে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চালুর পরিকল্পনা থেকে সরে আসে সরকার। তবে এই ডিসেম্বর মাসের পর আগারগাঁও পর্যন্ত ভৌত কাজ শেষ। আর ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে মতিঝিল পর্যন্ত কাজ শেষ হবে। এরপর ২০২১ সালে দেশের প্রথম মেট্রোরেল চালুর পূর্বে কমপক্ষে এক হাজারবার পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চলাচল করবে।
