মোটরসাইকেল নিয়ে বন্ধুবান্ধবদের দুরন্তপনা ও হৈ-হুল্লোড় দেখে লক্ষ্মীপুরের ১৭ বছরের কলেজছাত্র ইব্রাহিমেরও দুই চাকার যানটি নেওয়ার ইচ্ছে জাগে। তাই ভালোভাবে চালাতে না শিখলেও বাবার কাছে বায়না করে বসে। বিদেশফেরত বাবা ছেলের আবদার মিটিয়ে গত ১৭ আগস্ট তাকে মোটরসাইকেল কিনে দেন। এর এক দিনের মাথায় হেলমেট ছাড়া বেপরোয়া গতিতে সেটি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ইব্রাহিম। গত ১৫ আগস্ট টাঙ্গাইলের সখীপুরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয় ইশতিয়াক আহমদ নামে ১৭ বছরের আরেক কলেজছাত্র। মাত্র দু’দিন আগে ছেলের আবদারে জমি বিক্রি করে মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা বাবা। শোক দিবসের দিনে নাটোরের বড়াইগ্রামে ঘোরাঘুরি শেষে বান্ধবী উপমাকে নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিল ১৭ বছরের কলেজছাত্র আরিফ হোসেন। সেদিন আর তাদের বাড়ি ফেরা হয়নি। পথিমধ্যে দুর্ঘটনায় আরিফ নিহত হয়; গুরুতর আহত উপমার ঠিকানা হয় হাসপাতালের শয্যায়। এই তিনটি ঘটনার মতো দেশের আনাচে-কানাচে
-কানাচে মোটরসাইকেলে এমন দুর্ঘটনা ঘটছে নিয়মিতই। এতে প্রাণহানি দিন দিন বাড়ছে, প্রাণ যাচ্ছে ইব্রাহিম, ইশতিয়াক, আরিফদের মতো তরুণদের। বিশ্লেষকরা বলছেন, শহরে ও গ্রামে মোটরবাইকের প্রতি তরুণদের ঝোঁক বেড়েছে অতিমাত্রায়। এই বয়সে এটি পেয়ে তারা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। ফলে দুর্ঘটনায় তরুণরাই বেশি মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং সেবার বদৌলতে রাজধানীতেও বেড়ে গেছে মোটরসাইকেলের সংখ্যা। সেই সঙ্গে বেড়েছে দুর্ঘটনাও। যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনার ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ সংগঠিত হয়েছে মোটরসাইকেলের দ্বারা। নির্দিষ্ট যানবাহন ঘটিত দুর্ঘটনার মধ্যে এটি ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সড়কে মোটরসাইকেল বাড়ায় এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা। তাই পরিবহন সংশ্লিষ্টরা এগুলোর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি মোটরবাইকের প্রতি মানুষের ঝোঁক কমাতে গণপরিবহন সহজলভ্য ও ভোগান্তিহীন করার প্রতি জোর দিয়েছেন তারা।
ঈদুল আজহার সময় সড়ক দুর্ঘটনাবিষয়ক প্রতিবেদনে যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে, এবারের ঈদের আগে ও পরের ১২ দিনে দেশের সড়ক ও মহাসড়কে মোট ২০৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে ৬৭টি ঘটেছে মোটরসাইকেলের সঙ্গে অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষে; যা মোট দুর্ঘটনার ৩৩ শতাংশের বেশি। এসব বাইক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৭৭ জন ও আহত ৭৩ জন। এটি মোট নিহতের ৩৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ ও আহতের ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। গত ঈদুল ফিতর-পরবর্তী সংগঠনটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঈদের ১৩ দিনে মোট ৭৬টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ৮৩ জন এবং আহত হয় আরও ৮৬ জন। তখন মোট দুর্ঘটনার প্রায় ২৪ শতাংশ ছিল মোটরবাইক দ্বারা সংগঠিত। এবারের ঈদে তা বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের ঈদুল আজহার ১২ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯টি বাইক দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত হয় ঈদের দিনে। গত ঈদুল ফিতরেও ঈদের দিন সর্বোচ্চ ১৪ জন মারা যায় বাইক দুর্ঘটনায়।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্যান্য যানবাহনের তুলনায় দু’চাকার যানে দুর্ঘটনার আশঙ্কা ৩০ গুণ বেশি। সড়কে এসব বাহন যেভাবে বাড়ছে তা জাতির জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেকোনো মূল্যে সরকারের মোটরবাইকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাইক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে সব তরুণরা। তাও আবার উৎসবের সময় আনন্দ করতে গিয়ে। এ সময় ফাঁকা রাস্তা পেয়ে তারা রেসিংয়ে নামে, নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। উৎসবের আনন্দে মেতে উঠতে গিয়ে জীবনটাকেই শঙ্কায় ফেলে দেয়।’
মোটরসাইকেলের সংখ্যা কমানোর চেয়ে গণপরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণে বেশি জোর দিচ্ছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তার মতে, সড়কে গণপরিবহন সংকট ও যাতায়াতে ভোগান্তির কারণে সবাই ব্যক্তিগত বাহনের দিকে ঝুঁকছেন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ বাইকের প্রতি। কারণ এটি স্বল্প দামে কেনা যায় এবং দ্রুত যাতায়াত করা যায়। ঈদে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার জন্য সড়কের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘ঈদের সময় উত্তরবঙ্গে সড়কে ব্যাপক যানজট ছিল। তাই অনেকে ভোগান্তি এড়াতে বাইক নিয়েই গ্রামে রওনা দিয়েছেন। কেউ নতুন কেনা বাইক দেখাতেও গ্রামে নিয়ে যাচ্ছেন।’ মোজাম্মেল হক চৌধুরীর মতে, দুর্ঘটনা কমাতে মোটরসাইকেলের প্রতি মানুষের ঝোঁক কমাতে হবে। এজন্য গণপরিবহন সহজলভ্য ও ভোগান্তিহীন করার বিকল্প নেই।
