স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অন্যতম কুশীলব, এ দেশের রাজনীতি-অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এক কিংবদন্তি রাজনীতিবিদ। প্রায় শতবর্ষ ছুঁয়ে এই মানুষটি জনগণের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ছিলেন হাজার হাজার অনুসারী অনুরাগীর কাছে। প্রায় ৮ দশক জুড়ে রাজনীতিতে তিনি ক্রিয়াশীল থেকেছেন, এটাও কম বিস্ময়কর নয়। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে তিনি ছিলেন অবিচল। কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, রাষ্ট্রীয় পদপদবির প্রত্যাশায় নয়, রাষ্ট্র ভাষাসহ সব গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় এবং শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজের লক্ষাভিসারী লড়াইয়ে তিনি থেকেছেন অবিচল ও অনড়। সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে এক মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় তিনি অসক্ত শরীরেও অটল ছিলেন। শুক্রবার অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী রাজনীতির এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।
মোজাফফর আহমদের জন্ম ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ বা ইলাবাজ গ্রামে। বাবা স্কুলশিক্ষক মরহুম কেয়ামুদ্দীন ভূঁইয়া। চলতি ২০১৯ সালের ১৪ এপ্রিল তিনি ৯৮ বছরে পদার্পণ করেছিলেন। ব্যাধি ও জরার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জাতীয় নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বয়স ধরে বেঁচে থেকে তিনি আমাদের অনুপ্রাণিত করে গেছেন।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী মানুষ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ এবং ইউনেসকোর ডিপ্লোমা অর্জন করেন। ১৯৫২ থেকে তিনি অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে বিভিন্ন সরকারি কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদানে নিয়োজিত থাকেন। ১৯৩৭ সাল থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশ নেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সম্মুখ সারির একজন ভাষাসৈনিক ছিলেন তিনি।
১৯৫৪ থেকে সরকারি চাকরি ত্যাগ করে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে অংশ নেন। হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর ঐক্য নির্মাণে তথা যুক্তফ্রন্টের রাজনৈতিক-সাংগঠনিক-প্রচারমূলক কর্মকান্ডে মোজাফফর আহমদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে দেবীদ্বারের আসন থেকে জয়ী হন। ১৯৫৭ সালে তিনি আওয়ামী লীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে প্রস্তাব উত্থাপন করেন পূর্ব পাকিস্তানের আইন সভায়।
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে মোজাফফর আহমদসহ প্রগতিশীল নেতাকর্মীদের নামে হুলিয়া জারি করে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক জান্তা। এমনকি মোজাফফর আহমদকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিল তৎকালীন সরকার। ফলে বাধ্য হয়েই অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বেছে নেন কঠিন আত্মগোপনের জীবন এবং বৈরী ও বিপজ্জনক অবস্থায় থেকেও স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের শাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার বহুমুখী কর্মযজ্ঞে তিনি নিয়োজিত থাকেন।
দীর্ঘ আট বছর আত্মগোপনকারী এই নেতা প্রকাশ্য রাজনীতিতে আবার অংশ নেন ১৯৬৬ সালে। ১৯৬৭ সালে তিনি রিকিউজিশন ন্যাপ সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন। প্রকাশ থাকে যে, ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্বের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসন দাবি পরিত্যাগ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে সামরিক চুক্তিতে সমর্থন দানের বিরোধিতায় মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিও ষাটের দশকে চীন-রাশিয়া বিরোধের সুবাদে বিভক্তির শিকার হয়। এ ক্ষেত্রে ষাটের দশকের মধ্যভাগে চীনের এবং পাকিস্তানের আইয়ুবের প্রতি মোহাচ্ছন্ন ভাসানীর নেতৃত্বে চীনাপন্থিরা অতীতের আওয়ামী লীগের মতোই স্বায়ত্তশাসন দাবি ও পাকিস্তানি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের নীতি পরিত্যাগ করায় অনিবার্য হয়ে উঠে ন্যাপের এই বিভক্তি। ব্যতিক্রমী গণ ছাত্রসংগঠন, ছাত্র ইউনিয়ন এবং তৎকালীন গোপন কমিউনিস্ট পার্টিও চীন-রুশ মতবিরোধের নামে বিভক্তির শিকার হয়। বিভাজন ঘটে শ্রমিক-কৃষক গণসংগঠনেও। বাম-প্রগতিশীলরা আজও ঐতিহাসিক অগ্রগতির গতিপথ স্থগিত বা শ্লথ করে দেওয়ার অনৈক্য বিভক্তির দায় স্বীকার করেননি এটিও দুর্ভাগ্যজনক।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্বদানের কারণে এবং ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি (উঅঈ) গঠনের কারণে তিনি কারারুদ্ধ হন। একই সঙ্গে কারারুদ্ধ হন তৎকালীন ন্যাপ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আলতাফ হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সরদার আবদুল হালিমসহ অনেকে। পরে ৬ দফা প্রশ্নে আইয়ুব আহূত গোলটেবিল বৈঠকে তিনি পূর্ব বাংলার অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামাবাদে গমন করেন এবং স্বায়ত্তশাসন, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। উল্লেখ্য, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে এই বৈঠক নেওয়া হয়। তিনি যথারীতি ৬ দফা প্রশ্নে অনড় থাকায় তথাকথিত এই গোলটেবিল ব্যর্থ সংলাপে পরিণত হয় এবং পূর্ব বাংলার মানুষ আপসহীন আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারে উদ্বুদ্ধ হয়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা হন মওলানা ভাসানী, মণি সিংহ, মনোরঞ্জন ধর সমবায়ে। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের কাজে সফর করেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্বও করেন। স্বাধীনতার পরপরই তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি তুলে ধরেন। দুঃখজনক যে, ন্যাপের জাতীয় সরকারের এই দাবিটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও মেনে নেননি। মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠন, ট্রেনিং প্রদান ও দেশের ভেতরে যুদ্ধ সংগঠনে তিনি নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম হিসেবে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ প্রগতিশীল রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ যথাক্রমে শান্তি, মৈত্রী-সংহতির সংস্থাসমূহে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন মোজাফফর আহমদ।
১৯৭৯ সালে তিনি ন্যাপের হয়ে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ন্যাপ-সিপিবিসহ প্রগতিশীল শক্তির মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন তিনি। যদিও ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির অভ্যুদয়ের বিরুদ্ধে জনপ্রত্যাশিত আশানুরূপ ভূমিকা পালনে তিনি সক্ষমতা দেখাতে পারেননিÑ এ কথাও অসত্য নয়।
স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী গণ-আন্দোলনে তিনি আবার কারারুদ্ধ হন। পার্টির কর্মী-সমর্থক এবং প্রগতিশীলদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি মদনপুরের সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন এবং হাজার হাজার ন্যাপকর্মী ও প্রগতিশীলদের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। তিনি এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ‘সমাজতন্ত্র কী ও কেন?’, ‘প্রকৃত গণতন্ত্র (সমাজতন্ত্র) সম্পর্কে জানার কথা’, ‘মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্র’, ‘অধনবাদী পথে সমাজতন্ত্র’ প্রভৃতি পুস্তিকা প্রকাশ ও প্রচার করেন।
আইভী আহমদ তার একমাত্র মেয়ে। মোজাফ্ফর আহমদের স্ত্রী আমেনা আহমদ তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জীবনের সহকর্মীÑ বর্তমান ন্যাপের (মোজাফফর) কার্যকরী সভাপতি, তিনি জাতীয় সংসদের নারী আসনে প্রতিনিধিত্বকারী পরপর দুই দফায় এমপি ছিলেন। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জাতীয় নেতা মোজাফফর আহমদের জীবদ্দশায় ন্যাপ তিন ভাগে বিভক্ত হয় যথাক্রমে ন্যাপ (মো), এর আগে ন্যাপ (হারুন), পরে ‘ঐক্য ন্যাপ’ এবং ‘গণতন্ত্রী পার্টি’তে বিভক্ত হয়ে অবস্থান করছে। নীতিনিষ্ঠ জনকল্যাণে নিবেদিত সমাজতন্ত্রমুখীন সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাগ্যবদলে ন্যাপের অভিন্ন রাজনীতির ধারায় ওই অংশীদারদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া আজ সময়ের দাবি জাতীয় শূন্যতা পূরণের দাবি, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত আদর্শ ও অর্জন বিসর্জন হওয়ার পথ থেকে বাঁচানোর স্বার্থে অনিবার্য ও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ নির্মাণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অবিসংবাদী নেতৃত্বে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মওলানা ভাসানী, মোজাফফর আহমদ, মণি সিংহ, মনোরঞ্জন ধর প্রমুখ নির্মাতার ঐতিহাসিক অবদান সংরক্ষণে দলমত-নির্বিশেষে আমাদের সবারই উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।
লেখক : সভাপতি, ঐক্য ন্যাপ
মোজাফফর আহমদ
[জন্ম :১৪ এপ্রিল ১৯২২ মৃত্যু : ২৪ আগস্ট ২০১৯]
