মুক্তির সংগ্রামকে মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত করতে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে বাংলার মানুষকে। দুইশ বছরের ব্রিটিশ উপনিবেশের শৃঙ্খল আর তেইশ বছরের পাকিস্তানি শাসন-শোষণের জোয়াল ভেঙে বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামকে বেগবান করতে বহু রক্ত ঝরেছে। ইতিহাসের এ দীর্ঘ পরিক্রমায়, জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে বাঁচবার এই সংগ্রামে যারা আলো জ্বালিয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই একে একে বিদায় নিয়েছেন আমাদের ছেড়ে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী যে ব্যক্তিরা আলোকবর্তিকা হয়ে দীর্ঘদিন আলো জ্বেলে রেখেছিলেন, দেশের প্রবীণতম রাজনীতিক অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন তাদের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদও শুক্রবার চিরবিদায় নিলেন। তার মৃত্যুতে বাঙালি জাতি এক সূর্যসন্তানকে হারাল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন হারাল এক অভিভাবককে।
বাংলাদেশে কমিউনিস্ট মতাদর্শের অনুসারী বামপন্থি রাজনীতির অন্যতম পুরোধা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন সেই প্রজন্মের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র যারা ব্রিটিশশাসিত অবিভক্ত বাংলায় জন্ম নিয়ে ইংরেজ তাড়িয়ে স্বরাজের স্বপ্নে কৈশোর-তারুণ্য পার করেছেন, পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াই-সংগ্রামে যৌবনকে উৎসর্গ করেছেন এবং স্বাধীনতা ও দেশ গড়ার সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করেছেন। ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মোজাফফর আহমদ। তার পিতা কেয়ামুদ্দীন ভূঁইয়া ছিলেন স্কুল শিক্ষক। চল্লিশের দশকে ‘পাকিস্তান উন্মাদনার’ বিপরীতে যে মুষ্টিমেয় মুসলিম তরুণ ছাত্রাবস্থাতেই বামপন্থায় দীক্ষা নিয়েছিলেন, তিনি তাদেরই একজন। তার সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের শুরু ১৯৩৭ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। ১৯৫১-৫২ সালে মোজাফফর আহমদ ঢাকা কলেজের শিক্ষক ছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন তিনি। ১৯৫২ সালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং সেখানে বছর দুয়েক শিক্ষকতা করেন তিনি।
১৯৫৪ সালে অধ্যাপনা ছেড়ে রাজনীতির সঙ্গে পুরোপুরি গাঁটছড়া বাঁধেন মোজাফফর আহমদ। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে দেবীদ্বার আসন থেকে নির্বাচন করে মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে পরাজিত করে রাজনীতিতে আলোচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৫৭ সালের এপ্রিলে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠিত হলে তিনি এর কেন্দ্রীয় নেতা হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে মোজাফফর আহমদের নামে হুলিয়া জারি হয় এবং তিনি আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘ আট বছর আত্মগোপনে থেকে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। ১৯৬৬ সালে পুনরায় প্রকাশ্য রাজনীতিতে এসে, ঐতিহাসিক ৬ দফা নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তিনিও পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি হিসেবে আইয়ুব খান আহূত গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন। ১৯৬৭ সালে ন্যাপ বিভক্ত হলে মওলানা ভাসানী পিকিংপন্থি অংশের নেতা হন এবং মোজাফফর আহমদ মস্কোপন্থি অংশের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি হন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকায় তাকে কারাবরণ করতে হয়।
একাত্তরের পঁচিশে মার্চের পরপরই তিনি ঢাকা থেকে পালিয়ে আগরতলায় যান এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে আত্মনিয়োগ করেন। একদিকে তিনি মুজিবনগর সরকারের ছয় সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন; আরেকদিকে ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের নিয়ে বিশেষ গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলায় নেতৃত্ব দেন। প্রশিক্ষণ শেষে ওই বাহিনী ঢাকা, নরসিংদী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, রংপুরসহ বিভিন্ন রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। মুক্তিযুদ্ধকালে মোজাফফর আহমদ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগ দেন তিনি। মোজাফফর আহমদের সম্পাদনায় ‘নতুন বাংলা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাও প্রকাশিত হয়েছিল মুজিবনগর থেকে।
প্রায় আট দশকের রাজনৈতিক জীবনে একজন নির্লোভ, নিরহংকারী ও সব শ্রেণির মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন মোজাফফর আহমদ। আমরণ রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি অনুগত থাকা মোজাফফর স্বাধীনতার পর মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। অবশ্য এ কথাও ঠিক যে, পঁচাত্তরে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির অভ্যুদয়ের বিরুদ্ধে তিনিও জনপ্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারেননি। ১৯৭৯ সালে তিনি ন্যাপের হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৮১ সালে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। তবে, আশির দশকে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে কারাভোগ করেন তিনি। মোজাফফর আহমদ ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েও গ্রহণ করেননি। মুক্তিযুদ্ধে মোজাফফর আহমদের অনন্য ভূমিকা এবং তার আদর্শে অবিচল নিষ্ঠা আমাদের জাতীয় জীবনে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
