আজ ২৫ আগস্ট। রোহিঙ্গাদের নিয়ে সৃষ্ট নতুন সংকটের দ্বিতীয় বার্ষিকী। ২০১৭ সালের এই দিনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি সেনাঘাঁটিতে কথিত বিদ্রোহীদের হামলার অজুহাতে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর স্মরণকালের ভয়াবহ বর্বরতা চালায় সে দেশের সেনাবাহিনী ও দোসররা। গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ নানা নির্যাতনের মুখে রোহিঙ্গারা প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চলে। মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দিয়ে তাদের আশ্রয় দেয় বাংলাদেশ সরকার।
এর আগে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের পর ৮৮ হাজার রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটে। বিশেষ করে ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইনে সহিংস ঘটনার পর ২৫ আগস্ট সকাল থেকে সীমান্ত পেরিয়ে একের পর এক রোহিঙ্গা পালিয়ে আসতে থাকে বাংলাদেশে। এক পর্যায়ে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু আশ্রয় নেয় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চলে।
সর্বশেষ নিবন্ধন অনুযায়ী, নতুন-পুরাতন মিলে রোহিঙ্গা নিবন্ধনের করেছে ১১ লাখ ১৮ হাজার ৪১৭ জন। তবে উখিয়া ও টেকনাফসহ জেলার শহর পেরিয়েও অনেক রোহিঙ্গা বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে। এসব রোহিঙ্গা পরিবার নিবন্ধনের আওতায় আসেনি। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ১২টি ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো প্রত্যাবাসনের আলোর মুখ দেখেনি বাংলাদেশ।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন : ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথম প্রত্যাবাসনের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। এ বছরের চলতি মাসের ২২ আগস্ট দ্বিতীয়বারের মতো প্রত্যাবাসনের দিনক্ষণ ঠিক করলেও রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফিরে না যাওয়ায় ফের পিছিয়ে যায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। অবশ্য এর আগে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। একইভাবে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের তিন সপ্তাহের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করার কথা ছিল। কিন্তু এখনো পর্যন্ত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন হয়নি।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাঝি (সর্দার) : রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে। তাদের সহযোগিতা করছে কিছু রোহিঙ্গা সর্দার। প্রতিটি ক্যাম্পে ১০০ থেকে ১২০টি পরিবার নিয়ে একজন সর্দার নিয়োগ করা হয়। তারা রোহিঙ্গা মাঝি নামে পরিচিত। উখিয়া ও টেকনাফের এসব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করছে ১ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা মাঝি।
নিরাপত্তা ও শিক্ষাব্যবস্থা : রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ৯টি পুলিশ ফাঁড়ির আওতায় কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেড় হাজার সদস্য। ক্যাম্পে অবস্থানরত শিশু-কিশোরদের জন্য আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাসহ বিভিন্ন এনজিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করেছে। সরকার নির্ধারিত ৩ হাজার একর বনভূমিতে সাড়ে ৪০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়াও মসজিদ-মাদ্রাসা রয়েছে ৩০০।
স্বাস্থ্যসেবা : ১২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৯৬টি মেডিকেল সেন্টার পুরোদমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নবজাতক শিশু ও গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি সব বয়সী রোহিঙ্গার চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে এসব মেডিকেল সেন্টারগুলো। এরই মধ্যে সাড়ে ৬ লাখ রোহিঙ্গার কলেরা প্রতিরোধে টিকা খাওয়ানোর কাজ সম্পন্ন করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে রোহিঙ্গারা ডিপথেরিয়া ও এইচআইভি ঝুঁকিতে রয়েছে। এ পর্যন্ত ১১২ জন রোহিঙ্গা এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছে।
বাসস্থান : রোহিঙ্গাদের জন্য ৩ হাজার একর বনভূমি নির্ধারণ করেছে। এরই মধ্যে নির্ধারিত তিন হাজার একর পেরিয়ে এর আশপাশে আশ্রয় নিয়েছে লাখো রোহিঙ্গা। এ পর্যন্ত এক লাখ ৪৫ হাজার পরিবারের জন্য সরকারিভাবে ঘর নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে।
বনাঞ্চল ধ্বংস : রোহিঙ্গাদের বসতির কারণে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ নিয়ন্ত্রণাধীন উখিয়া ও টেকনাফে ছয় হাজার ১৬৩ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত ৮ লাখ ৭২ হাজার ৮৮০ রোহিঙ্গা বনাঞ্চলে বসতি গেড়েছে।
ত্রাণ তৎপরতা : আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও এনজিওদের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রোহিঙ্গাদের প্রাণ বাঁচাতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় পুরো ত্রাণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বর্তমানে রোহিঙ্গারা চাল, ডাল, তেল, ত্রিপল থেকে শুরু করে সব ধরনের ত্রাণ পাচ্ছে।
নিত্যপণ্যের বাজার চড়া : মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের বাজারগুলোতে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। লাখ লাখ রোহিঙ্গার কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের।
উখিয়ার ইউএনও নিকারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘উখিয়ার জনসংখ্যা ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬০০। কিন্তু এর বিপরীতে রোহিঙ্গা রয়েছে তিনগুণ। কাজেই স্থানীয়দের চেয়ে রোহিঙ্গার সংখ্যা বেশি। এই বাড়তি জনসংখ্যার চাপে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ।’
কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন বলেন, ‘রোহিঙ্গারা যাতে দেশের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যেতে না পারে সে জন্য পথে পথে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এসব চেকপোস্টের মাধ্যমে এ পর্যন্ত লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আটকের পর ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে।’
ক্যাম্পে অনুষ্ঠান : আজকের দিনটিকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করবে বিভিন্ন ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গারা। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ), ভয়েস অব রোহিঙ্গা যৌথভাবে তাদের গৃহীত কর্মসূচি পালনের অনুমতি পেয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে উখিয়ার ইউএনও বলেন, এখনো এ ব্যাপারে সরকারের কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
