হত্যার আগে ট্রেনের পরিত্যক্ত বগিতে কয়েক দফায় ধর্ষণ করা হয় মাদ্রাসাছাত্রী আসমা আক্তারকে (১৭)। ধর্ষণের পর কান্নাকাটি করতে থাকায় এবং বিষয়টি মা-বাবাকে জানানোর কথা বলায় ক্ষুব্ধ হয়ে আসমার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে মারুফ হাসান ওরফে বাঁধন (১৮)। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর আসমার সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সা নিয়ে বাসে করে পঞ্চগড় চলে যায় সে। তার ধারণা ছিল আসমার পরিচয় শনাক্ত হবে না এবং লাশ অজ্ঞাত হিসেবে দাফন হবে। কিন্তু পরদিন লাশ শনাক্ত হলে আত্মগোপনে চলে যায়। আসমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করার উদ্দেশ্যে প্রায় ৫ বছর ধরে তার সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় চালিয়ে আসছিল বাঁধন। গ্রেপ্তারের পর ঢাকা রেলওয়ে থানা পুলিশের (কমলাপুর জিআরপি) জিজ্ঞাসাবাদে এবং আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য জানিয়েছে এই তরুণ। একাই আসমাকে হত্যা এবং তার সঙ্গে আর কেউ ছিল না বলেও দাবি করেছে বাঁধন। গতকাল শনিবার নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে সে। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক।
বাঁধনকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে আসমা হত্যা মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা রেলওয়ে পুলিশের (পূর্ব) ঢাকা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার ওমর ফারুক গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পঞ্চগড় সদর থানা পুলিশ বাঁধনকে আটকের পর আমাদের কাছে হস্তান্তর করে। আমরা তাকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করি। জিজ্ঞাসাবাদে বাঁধন জানায়, একই মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় আসমার সঙ্গে তার ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়। আসমা তাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসলেও সে ভালোবাসত না। কিন্তু আসমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করার উদ্দেশ্যে প্রায় ৫ বছর তার সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় চালিয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৮ আগস্ট রবিবার আসমা তার সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসে।’
বিয়ে বা সংসার নয়, বরং শারীরিক সম্পর্ক গড়ার উদ্দেশ্যে আসমাকে বাসে করে বাঁধন ঢাকায় নিয়ে আসে জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, গত রবিবার বিকেলে ঢাকায় এসে তারা কয়েকটি আবাসিক হোটেলে ‘স্বামী-স্ত্রী’ পরিচয়ে কক্ষ ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু বয়স কম হওয়ায় এবং তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় কোনো আবাসিক হোটেল তাদের কাছে কক্ষ ভাড়া দেয়নি। পরে তারা কমলাপুর স্টেশনের বাইরে একটি রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া করে। সেখান থেকে বিকেল ৫টা ১২ মিনিটের সময় কমলাপুর রেলস্টেশনে প্রবেশ করে। দীর্ঘ সময় তারা প্ল্যাটফরমে যাত্রীদের বিশ্রামের বেঞ্চে শুয়ে থাকে। রাত ১০টার পর তারা সেখান থেকে হেঁটে পশ্চিম দিকে (খিলগাঁও রেলক্রসিং) যেতে থাকে, যা স্টেশনের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় (সিসিটিভি) ধরা পড়েছে। এ সময় বাঁধন কৌশলে আসমাকে স্টেশনের ওয়াশ ফিল্ড এলাকায় দাঁড় করিয়ে রাখা বলাকা এক্সপ্রেস ট্রেনের পরিত্যক্ত একটি বগির কাছে নিয়ে যায়। হোটেলে কক্ষ না পাওয়ায় সেখানে রাত কাটানোর কথা বলে বগিতে ওঠায় আসমাকে। পরে রাতে তাকে কয়েক দফায় ধর্ষণ করে বাঁধন। ধর্ষণের পর আসমা কান্নাকাটি করতে থাকে এবং তার মা-বাবাকে ধর্ষণের বিষয়টি জানিয়ে দেবে বলে জানায়। এতে বাঁধন ক্ষিপ্ত হয়ে ওড়না দিয়ে আসমার গলা পেঁচিয়ে ধরে। গলা পেঁচিয়ে ৬-৭ মিনিট টেনে ধরে রাখার পর আসমার শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর বাঁধন আসমার সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সা নিয়ে গাবতলী চলে যায়। সেখান থেকে পঞ্চগড়ের বাসে করে চলে যায় পঞ্চগড়। বাঁধনের ধারণা ছিল আসমার পরিচয় কখনো শনাক্ত হবে না এবং লাশ অজ্ঞাত হিসেবেই দাফন হবে। কিন্তু পরদিনই আসমার লাশ উদ্ধার ও পরিচয় শনাক্ত হলে আত্মগোপনে চলে যায় সে।
বাড়ি থেকে পালানোর আগে আসমা তার ডায়েরিতে বাঁধনের সঙ্গে প্রেমের বিষয়টি লিখে রেখে আসে জানিয়ে ওমর ফারুক বলেন, ‘বিষয়টি বাঁধনের জানা ছিল না। তাছাড়া আসমার ভ্যানিটি ব্যাগে বাবার ফোন নম্বর ছিল। সেখান থেকে নম্বর পেয়ে পুলিশ তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে।’
ধর্ষণের বিষয়টি ধামাচাপা দিতে বাঁধন একাই এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এর সঙ্গে জমিজমা বা আর্থিক কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। আসমা দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। আর বাঁধনের বাবা রিকশার টায়ার ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ব্যবসা করেন। তাদের পরিবারের মধ্যে আর্থিক, জমিজমা বা অন্য কোনো বিরোধ থাকার বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি।’
বাঁধনের বিষয়ে জানতে চাইলে পঞ্চগড় সদর থানার ওসি আবু আক্কাছ আহম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসমাকে হত্যার পর প্রধান সন্দেহভাজন বাঁধন পঞ্চগড়ের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে থাকে। পঞ্চগড় জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় থানা পুলিশের নানামুখী কৌশল ও চাপের ফলে গত বৃহস্পতিবার সে থানায় এসে ধরা দেয়। পরে শুক্রবার বাঁধনকে ঢাকা রেলওয়ে থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। মামলাটি জিআরপি থানায় হওয়ায় তারাই এ বিষয়ে তদন্ত করছে।’
কমলাপুর জিআরপি থানার ওসি রুশো বণিক জানান, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় বাঁধনের রিমান্ড চাওয়া হয়নি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা রেলওয়ে থানার এসআই আলী আকবর দেশ রূপান্তরকে জানান, বাঁধন শনিবার বিকেলে আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। বিচারক জবানবন্দি নথিভুক্ত করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
এক সময়ের সহপাঠী বাঁধনের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে গত ১৮ আগস্ট ঢাকায় আসে পঞ্চগড় সদর উপজেলার খান বাহাদুর মখলেছুর রহমান মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আসমা আক্তার। তার বাবা পঞ্চগড় সদর উপজেলার শিংপাড়া গ্রামের রিকশাভ্যান চালক আবদুর রাজ্জাক। আর বাঁধন পার্শ্ববর্তী সীতাগ্রামের আবু হানিফ ওরফে ভুট্টোর ছেলে। পরদিন কমলাপুর রেলস্টেশনে ট্রেনের পরিত্যক্ত বগি থেকে আসমার লাশ উদ্ধার করে ঢাকা রেলওয়ে থানা পুলিশ। মৃতদেহের ময়নাতদন্তে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে আসমার চাচা মোহাম্মদ রাজু বাদী হয়ে বাঁধনকে আসামি করে ঢাকা রেলওয়ে থানায় মামলা করেন।
