মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রভাব পড়ছে দেশের সার্বিক উন্নয়নে। বাংলাদেশের উন্নয়নে সবচেয়ে বড় সহযোগী বিশ্বব্যাংক রোহিঙ্গাদের জন্য ধীরগতির প্রকল্প থেকে অর্থ প্রত্যাহার শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে অতিদরিদ্র অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা প্রকল্পের বরাদ্দ অর্থ থেকে ৪০০ কোটি টাকা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে তারা। বিশ্বব্যাংক বলছে, রোহিঙ্গাদের কারণে চাপ বেড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর। এখন তাদের উন্নয়নে ব্যাপক অর্থ প্রয়োজন। এজন্য চলমান ধীরগতির প্রকল্প থেকে অর্থ প্রত্যাহার করে ওই অঞ্চলের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রোহিঙ্গারা না এলে প্রকল্পের অর্থ প্রত্যাহার করে ওই অঞ্চলে বিনিয়োগ করত না বিশ্বব্যাংক। এই মুহূর্তে হয়তো প্রয়োজনও পড়ত না। এখন বাধ্য হয়েই তা করতে হবে। ফলে অগ্রাধিকারভুক্ত উন্নয়ন কিছুটা বাধাগ্রস্ত হবে। সার্বিক উন্নয়নে ব্যয়ও বাড়বে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) গত ৬ মে চিঠি দিয়ে জানায়, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে চাপ বেড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর। এখন তাদেরকে সহায়তার জন্য অতিরিক্ত ৩০ কোটি ডলার প্রয়োজন। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এজন্য চলমান ধীরগতির প্রকল্প থেকে অর্থ প্রত্যাহার করে ওই অঞ্চলের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় অতিদরিদ্র অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা বাবদ একটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এতে বিশ্বব্যাংক সহজ শর্তে ৩০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। ‘ইনকাম সাপোর্ট প্রোগ্রাম ফর দ্য পুওরেস্ট’ (আইএসপিপি) প্রকল্পটির মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ নারী ও শিশু উপকারভোগী হিসেবে সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক এখন এই প্রকল্প থেকে ৫ কোটি ডলার বা ৪০০ কোটি টাকা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মেহরীন এ মাহবুব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির (আইডা) ঋণের অর্থ ব্যয় করতে না পারলে প্রত্যাহার করে নেওয়া হতো। এখন এই অর্থ সরাসরি ফেরত না নিয়ে কক্সবাজার এলাকার উন্নয়নের জন্য দেওয়া হচ্ছে। যেসব প্রকল্প থেকে অর্থ প্রত্যাহার করা হবে, তা আবার কক্সবাজার এলাকার উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হবে। এই অর্থ অন্যান্য আইডা ঋণের শর্ত মেনেই ব্যয় হবে।’
কিন্তু রোহিঙ্গারা না এলে বিশ্বব্যাংকের সহজ শর্তের এই ঋণ কক্সবাজারে বিনিয়োগের প্রয়োজন হতো না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রা ব্যাপক চাপের মধ্যে পড়েছে। এখন রোহিঙ্গারা যেহেতু এসেই পড়েছে, যেতেও চাচ্ছে না। এজন্য বাধ্য হয়েই স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এই অর্থ ব্যয় করতে হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক আগে ধীরগতির প্রকল্প থেকে অর্থ প্রত্যাহার করে নিলেও অন্যান্য অগ্রাধিকার প্রকল্পে তা ব্যয় করার সুযোগ ছিল। রোহিঙ্গাদের কারণে এখন এই সহজ শর্তের ঋণ কক্সবাজার এলাকায় ব্যয় করতে হচ্ছে। এজন্য পরোক্ষভাবে হলেও রোহিঙ্গাদের কারণেই অন্যান্য অগ্রাধিকার প্রকল্পে প্রভাব পড়ছে।’
আইএসপিপি প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা ও রংপুর বিভাগের সাত জেলার ৪২ উপজেলার পাঁচ লাখ নারীর এই নগদ সহায়তা পাওয়ার কথা। জেলাগুলো হলো গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, জামালপুর, শেরপুর ও ময়মনসিংহ। ২০১৫ সালে নেওয়া এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র ১৬ কোটি টাকা দেবে সরকার। বাকি টাকার পুরোটাই বিশ্বব্যাংক সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
এই প্রকল্পের আওতায় দরিদ্র নারীদের গর্ভকালীন চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। প্রতিবার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাদের ২০০ টাকা করে নগদ অর্থ দেওয়া হবে। অন্যদিকে শূন্য থেকে ২৪ মাস বয়সী দরিদ্র শিশুদের মাসে একবার স্বাস্থ্য বৃদ্ধির পরীক্ষা করে নগদ ৫০০ টাকা দেওয়ার কথা। স্থানীয় সরকার বিভাগ এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে।
আইএসপিপি প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক অর্থ প্রত্যাহার করে নেওয়ায় গত ৭ জুলাই প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা হয়েছে। সভার কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, ইতিমধ্যে প্রকল্প দুবার সংশোধন করা হয়েছে। আগামী বছরের জুনে এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পের কাজ শুরু হতে দেরি হওয়ায় বাস্তবায়ন কিছুটা পিছিয়ে। বর্তমানে প্রান্তিক পর্যায়ের ২ লাখ ৯১ হাজার ৮৯৬ জন নারী ও শিশুর তালিকা করা হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যে এই সংখ্যা সাড়ে ৪ লাখে উন্নীত করার কথা। কিন্তু ধীরগতির কারণে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের অধীনে বরাদ্দের ২ হাজার ২২২ কোটি টাকা অব্যয়িত থেকে যাবে। এজন্য প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পিএসসি সভায় স্থানীয় সরকার সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘এই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ৩০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা থাকলেও এখন দেবে ২৫ কোটি ডলার। এতে প্রকল্পের বাস্তবায়নে খুব একটা সমস্যা হবে না। আগে প্রতি ডলার হিসাব করা হয়েছে ৮০ টাকা ধরে। এখন ৮৫ টাকা ধরে হিসাব করতে বলা হয়েছে। বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় করতে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সাল নাগাদ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।’
তবে অন্যান্য ধীরগতির প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের অর্থ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের জন্য রোহিঙ্গাদের দায়ী করছে ইআরডি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, বিশ্বব্যাংক রোহিঙ্গাদের জন্য ৪৮ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ অনুদান দিচ্ছে। ইতিমধ্যে ৩০ কোটি ডলার ছাড় করেছে। কিন্তু ওই অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য কোনো আলাদা সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি তারা। যদিও স্থানীয়দেরও সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করে সংস্থাটি। এজন্য বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকা প্রকল্প থেকে অর্থ প্রত্যাহার করে ওখানে দিচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধান হলে এর প্রয়োজন ছিল না।
এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের কারণে উন্নয়নে কোনো সমস্যা হবে না। অর্থ সংকটও হবে না। অগ্রাধিকার প্রকল্পে কিছু ব্যয় বাড়তে পারে, তবে এর যথেষ্ট সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে।’
