ফিরে যাওয়ার আগে আবারও নাগরিক হিসেবে মিয়ানমারের স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। এজন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন রোহিঙ্গা নেতারা। তবে শর্ত না মেনে রোহিঙ্গাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, শর্তপূরণ না হলে তারা সারাজীবনই ক্যাম্পে অবস্থান করবেন। তবে দাবি মানলে বাংলাদেশে অবস্থান করা ১১ লাখ রোহিঙ্গা একই সঙ্গে মিয়ানমারে ফিরবেন বলেও জানান তারা।
রোহিঙ্গা সংকটের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে (রোহিঙ্গার ভাষায় গণহত্যা দিবস) গতকাল রবিবার কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং মধুরছড়া (ক্যাম্প-৪) আশ্রয়শিবিরে আয়োজিত এক মহাসমাবেশে এসব কথা বলেন রোহিঙ্গা নেতারা। রাখাইনে গণহত্যা, ধর্ষণসহ বর্বর নির্যাতন এবং জড়িত সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থি মগদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের দাবিতে এই মহাসমাবেশের আয়োজন করে রোহিঙ্গারা।
সকাল থেকেই বিভিন্ন শিবির থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রোহিঙ্গারা দলে দলে মধুরছড়ার সমাবেশ স্থলে আসতে থাকে।
অধিকাংশ রোহিঙ্গা তাদের জাতীয় পোশাক টুপি, পরনে সাদা শার্ট ও লুঙ্গি পরে আসে সমাবেশে। সে সময় তাদের সেøাগান ছিলÑ ‘নিরাপদে ঘরে ফিরতে চাই, গণহত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার চাই’, ‘নাগরিকত্ব ফেরত চাই’ ইত্যাদি।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, গত দুই বছরে রোহিঙ্গাদের কারণে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয় বাজারের জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। এছাড়া সংখ্যায় রোহিঙ্গারা বেশি হওয়ার কারণে স্থানীয়রাই কার্যত সেখানে ‘সংখ্যালঘু’ হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে তাদেরই ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র সরে যেতে হবে।
গতকালের সমাবেশে, আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহ বলেন, মিয়ানমার মুখে বলল আর ফিরে গেলাম, তা কোনোভাবে সম্ভব নয়। আমাদের নিজস্ব অধিকার দিয়ে ফিরিয়ে নিতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকার এবং রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংলাপ করতে হবে।
সমাবেশে উপস্থিত রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমাদের যদি মিয়ানমারে ফিরে যেতে হয়, একসঙ্গে যাব, একসঙ্গে সীমান্ত পার হব।’ এ সময় রোহিঙ্গারা দাঁড়িয়ে চিৎকার করে নেতাদের বক্তব্যের সমর্থন জানায়।
রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার আবদুর রহিম, মৌলভী ছৈয়দ উল্লাহ ও রোহিঙ্গা নারী নেত্রী হামিদা বেগমসহ অনেকেই বক্তব্য রাখেন। তারা বিশ্ববাসীকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক মর্যাদাসহ দাবিকৃত পাঁচটি শর্ত মেনে নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমার সরকারকে জোরালোভাবে চাপ দেওয়ার আহ্বান জানান। এজন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সংলাপ (ডায়ালগ) চলমান রাখার ওপর গুরুত্বারোপও করেন তারা।
এদিকে স্থানীয়রা বোহিঙ্গাদের বোঝা হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। উখিয়ার এক স্কুলশিক্ষক নুরুল কবির বলেন, রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন করতে হবে। তাদের কারণে এলাকায় চুরি বেড়ে গেছে। তাদের কারণে নির্বিঘেœ চলাচল করাও দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা যখন উখিয়া-টেকনাফের শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেয় তখন প্রথমে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন উখিয়া-টেকনাফের সাধারণ জনগণ। তবে সেই আশ্রিতরাই আস্তে আস্তে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী অনিল বড়–য়া বলেন, রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য বিষফোঁড়া। তাদের দ্রুত মিয়ানমারে ফেরাতে হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কিছু এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। উখিয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, গত ২২ আগস্ট সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ার পেছনে সংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। আছে কিছু এনজিওর হাতও। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা দরকার।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুরউদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দুই বছরেও আলোর মুখ না দেখায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে স্থানীয়রা। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিকারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চলমান প্রক্রিয়া। যারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফেরত যেতে রাজি হবে তাদেরই ফেরত পাঠানো হবে।
