রুমিনের প্লট আবেদনে সমালোচনা বিএনপিতেও

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১২:২১ এএম

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে কাছে ১০ কাঠার প্লট চেয়ে যে আবেদন করেছেন তা নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য জানা গেছে।

রুমিন ফারহানার ওই প্লট চাওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলেও আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এদিকে দলের নেতাকর্মীদের আলোচনা-সমালোচনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে প্লটের আবেদনের বিষয়ে ব্যাখ্যা

দিয়েছেন রুমিন। একই সঙ্গে ওই আবেদন মন্ত্রণালয়ের বাইরে কীভাবে এলো সে প্রশ্নও রেখেছেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরাও মন্ত্রী ছিলাম। কিন্তু প্লট বা ফ্ল্যাট নিইনি। সবাই তো আর একরকম হবে না।’ তিনি বলেন, ‘শুধু রুমিন ফারহানা নন, বিএনপিদলীয় অন্য যারা সাংসদ আছেন তারাও প্লটের জন্য আবেদন করেছেন বলে আমি জানি।’

প্লটের আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে রুমিন ফারহানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য হিসেবে এটি আমার অধিকার। তাই আমি আবেদন করেছি। আমি একাই আবেদন করিনি। বিএনপির সাত সংসদ সদস্যের অধিকাংশই প্লট চেয়ে আবেদন করেছেন।’ এ সময় তিনি তার আবেদনপত্র মন্ত্রণালয়ের বাইরে কীভাবে এলো তা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

রুমিন ফারহানার আবেদনের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্য হিসেবে একটি প্লট রুমিন পেতেই পারেন।’ এ বিষয়ে বিএনপির সাবেক এক নারী সংসদ সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের এই দুঃসময়ে, বিশেষ করে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যখন কারাবন্দি তখন রুমিন সংসদে যে ভূমিকাটা রাখছেন তা প্রশংসার। তবে সাংসদ হিসেবে তিনি প্লটের জন্য আবেদন না করলেও পারতেন।’

বিএনপির সহআন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা গত ৯ জুন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এরপর সংসদে দলের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখে আলোচনায় আসেন প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হওয়া এই বিএনপি নেত্রী। প্লট চেয়ে মন্ত্রণালয়ে যে আবেদনপত্র তিনি জমা দিয়েছেন তাতে বলেছেন, ঢাকার পূর্বাচলে তার ১০ কাঠার একটি প্লট প্রয়োজন। কারণ ঢাকায় তার কোনো জমি বা ফ্ল্যাট নেই। ওকালতির বাইরে তার কোনো পেশা বা ব্যবসাও নেই। ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলে তিনি ‘চিরকৃতজ্ঞ’ থাকবেন। তবে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দলের মনোনয়ন পাওয়ার পর রুমিন নির্বাচন কমিশনে সম্পদের যে বিবরণী জমা দিয়েছিলেন তাতে তিনি পৈতৃক সূত্রে সায়েন্স ল্যাবরেটরি রোডে ১৮৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট থাকার কথা বলেছেন।

রুমিন ফারহানার প্লট চাওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। কেউ তার পক্ষে লিখছেন, কেউ বিপক্ষে। এর পেছনে কাজ করছে একাদশ সংসদকে তার ‘অবৈধ’ বলা এবং বর্তমান সরকারের তীব্র সমালোচনা করার বিষয়টি। অলিউর নামে ছাত্রদলের এক নেতা ফেইসবুকে লিখেছেন, বিএনপি বাছাই করা তাদের সর্বোচ্চ আদর্শিত নেত্রী রুমিন ফারহানাকে পাঠিয়েছিল সংসদ গরম করতে। বোঝা গেল ক্ষমতা পেলে তেনারা কেমন গরম করতে পারবেন? তবে নির্লোভ ও নিরাভরণ হওয়া এক জিনিস। আর টকশো অথবা সোশ্যাল মিডিয়া গরম করা অন্য জিনিস। বিএনপি চেয়ারপারসনের সিকিউরিটি ফোর্সের (সিএসএফ) এক সদস্য যিনি সাবেক সামরিক কর্মকর্তা তিনি রুমিন ফারহানার ‘তীব্র সমালোচনা করে’ ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

ওই আবেদনের বিষয়ে গণমাধ্যমে পাঠানো লিখিত বক্তব্যে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমি এখন চ্যালেঞ্জ করব যতজন এমপি অ্যাপ্লিকেশন করেছেন, সব প্রকাশ করা হোক। রুমিন কেন একলা?’ তিনি বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্র থেকে জায়গার জন্য অ্যাপ্লাই করতে পারেন সেই সুযোগ আমার আছে।’ রুমিন বলছেন, এছাড়া ট্যাক্স -ফ্রি গাড়ি, বেতন-ভাতা ও অ্যাপার্টমেন্ট পাওয়ার রাষ্ট্রীয় সুযোগ রয়েছে তার। এই রাষ্ট্রীয় সুযোগ যিনি সংসদ সদস্য হবেন তিনিই রাষ্ট্র থেকে পাবেন। ‘সেই সুবাদে আমি একটি আবেদনপত্র দিয়েছি। শুধু আমি একা নই, অন্তত ৩০০-৩৫০ এমপি অ্যাপ্লিকেশন দিয়েছেন’ বলেন সংরক্ষিত আসনে বিএনপির এই সদস্য।

তিনি বলেন, ‘আমার প্রশ্ন হলো আমার চিঠিটা মন্ত্রণালয় থেকে বেরোল কী করে? যেখানে আমার ব্যক্তিগত টেলিফোন নম্বর দেওয়া আছে? আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, আমি এই সরকারের কাছ থেকে এক সুতা জমিও আশা করি না, আমি চিন্তাও করি না। এটা একটি প্রসিডিউর, একটি ফরমালিটিজ যেটা সব এমপি করেছেন, আমিও করেছি।’ রুমিন বলেন, ‘এই চিঠি আমি ড্রাফটও করিনি, আমার পিএস ড্রাফট করে দিয়ে দিয়েছে। সব পিএসরা যখন তাদের এমপিদের চিঠি ড্রাফট করেছে, আমার পিএসও ড্রাফট করে দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমার চিঠিটা কেন ভাইরাল হলো? এটা ভাইরাল কেন হলো তার উত্তর আমি নিজেই দিচ্ছি।’ রুমিন ফারহানা বলেন, ‘গত দুদিন আগে আবুল মাল আবদুল মুহিত (সাবেক অর্থমন্ত্রী) কোনো পদে না থাকা অবস্থায় শুল্কমুক্ত গাড়ি এনেছিলেন। সরকার তার সেই নোংরামি ও অসততাকে চাপা দেওয়ার জন্য আমার যে বৈধ অ্যাপ্লিকেশন সেটা নোংরাভাবে পাবলিক করেছে। একটা সরকারি নথি কখন পাবলিক হয়, যখন সেখানে সরকারের মদদ থাকে।’ তিনি বলেন, ‘এই সরকার আমাদের ফোনে আড়ি পাতে, এই সরকার আমাদের ফেইসবুক হ্যাক করে, এই সরকার আমাদের সমস্ত গোপন নথি ইচ্ছে করে প্রকাশ করে। যারাই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলবে, যারাই সরকারের কাজের সমালোচনা করবে, যারাই সরকারকে সঠিক পথে আনবার জন্য যা যা পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সে বিষয়ে কথা বলবে এবং সরকারের মনমতো কথা না বলবে তাদের ব্যাপারে সরকারের এক ধরনের চেষ্টা থাকে তাদের হিউমিলেটেড করা বা তাদের কোনো না কোনোভাবে ম্যালাইন করা।’ তিনি বলেন, ‘আমার প্রশ্ন হলো আমার চিঠিটা কি অবৈধ? কোন আইনে অবৈধ? এটা কি অনৈতিক কিছু? এটা তো রাষ্ট্রীয় চিঠি। আমি তো সরকারের কাছ থেকে কিছুই চাইনি। আমার বেতনটা যেমন রাষ্ট্রীয়, আমার এই অ্যাপ্লিকেশনও রাষ্ট্রীয়। এই সরকার যে অবৈধ এটা এখন বলছি, আগেও বলেছি এটা সম্পূর্ণ অবৈধ সরকার। এটা জনগণের ভোট ছাড়া নির্বাচিত সরকার। এই সরকার সর্বঅর্থে অবৈধ সরকার। আমি সরকারের কাছে কোনো কিছু চাইনি। আমি রাষ্ট্রীয় সুযোগ চেয়েছি। এটা তারা (সরকার) করেছে আবুল মাল আবদুল মুহিতকে যে অবৈধ ও অনৈতিক সুবিধা দিয়েছে ওইটাকে চাপা দেওয়ার জন্য, জনদৃষ্টিকে ভিন্নদিকে প্রবাহিত করার জন্য। যাতে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে যায়।’

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত