রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের লাগাম টানতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং ডামি ক্লাসের বিধান রেখে অভিন্ন শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ নীতিমালা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে চাইলে কাউকে এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত চার স্তরের প্রতিটিতে প্রথম শ্রেণি থাকতে হবে। প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী থেকে সহযোগী এবং সহযোগী থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতে হলে গবেষণা ও প্রকাশনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষকরা যেন নিজ কর্মস্থল ও গবেষণায় বেশি মনোযোগী হন, সে কারণে খণ্ডকালীন চাকরির সময় কমিয়ে আনা হয়েছে এই নীতিমালায়।
গতকাল রবিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কর্মকর্তারা এক বৈঠকে এই খসড়া চূড়ান্ত করেন। খুব শিগগিরই নীতিমালটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন বৈঠকে উপস্থিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা। অনুমোদন পেলেই প্রজ্ঞাপন
বা আদেশ জারি করা হবে। ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে অনেক বড় ধরনের করাপশনের (দুর্নীতি) অভিযোগ রয়েছে। টাকার বিনিয়মে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। দেশের স্বার্থে এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হলো। এভাবে চলতে থাকলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। বহুদিন ধরে এই বিষয়টা নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম। পুরোটা সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে সকল স্টেক হোল্ডারদের (অংশীজন) রেখে এটার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি হবে সকালেই। এর পরপরই লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এদিনই ভাইভা ও ডামি ক্লাসের মাধ্যমে পরীক্ষার সব প্রক্রিয়া শেষ হবে। ওই দিনই ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।’
অভিন্ন নীতিমালার খসড়ায় বলা হয়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে নিয়োগের জন্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে আলাদাভাবে সিজিপিএ অন্তত তিন দশমিক পাঁচ পয়েন্ট থাকতে হবে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে এই গ্রেড পয়েন্ট আরও বাড়িয়ে চাইতে পারে। কিন্তু কমাতে পারবে না। বর্তমানে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যদের পছন্দের প্রার্থীরাই নিয়োগ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যাতে বঞ্চিত হওয়ার কথা বলেছেন অনেক প্রার্থী।
বর্তমানে শিক্ষক পদোন্নতির ক্ষেত্রে গবেষণা ও প্রকাশনা না থাকলে চাকরির সময়সীমা বিবেচনায় নেওয়া হয়। কিন্তু নতুন নীতিমালায় বিষয়টি আর থাকছে না। পদোন্নতি নিয়ে নীতিমালায় বলা হয়, চাকরির সময়সীমার পাশাপাশি গবেষণা ও প্রকাশনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, অধ্যাপক হতে হলে অবশ্যই চাকরি জীবনের বিভিন্ন সময় গবেষণা, প্রকাশনা, এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রি থাকতে হবে। এসব গবেষণা না থাকলে চাকরির শেষ সময়ে বিশেষ বিবেচনায় কেউ কেউ অধ্যাপক হবেন। আবার একই প্রকাশনা ও গবেষণা দিয়ে বারবার পদোন্নতি পাওয়া যাবে না। এক পদ থেকে অন্য পদে পদোন্নতি পেতে ওই সময়ের মধ্যে কাক্সিক্ষতসংখ্যক গবেষণা ও প্রকাশনা থাকতে হবে। তবে বর্তমানে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য এই নীতিমালায় বিধান কোথাও কোথাও শিথিল করা হয়েছে। কিন্তু তাদেরও পদোন্নতি পেতে গবেষণা ও প্রকাশনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শিক্ষকদের সপ্তাহে ৪০ কর্মঘণ্টার (সপ্তাহে ৫ দিন ৮ ঘণ্টা করে) বিধানটি যথাযথ কার্যকর করার জন্য নীতিমালায় জোর দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সপ্তাহে প্রতিদিন ১ ঘণ্টা দুপুরের খাবারের বিরতি। সে হিসাবে সপ্তাহে কর্মঘণ্টা ৩৫। সপ্তাহে একজন শিক্ষক ছয় ঘণ্টা খণ্ডকালীন চাকরি করতে পারবেন। এর মধ্যে তিন ঘণ্টা কর্মদিবসে, বাকি ৩ ঘণ্টা ছুটির দিনে চাকরি করতে পারবেন শিক্ষকরা। এ হিসাবে প্রতিদিন দুপুরের খাবারের বিরতি ও খণ্ডকালীন তিন ঘণ্টা বাদ দিলে নিজ বিভাগেই একজন শিক্ষক সময় দেবেন ৩২ ঘণ্টা।
এমন বিধানের বিষয়ে অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম বলেন, ‘এখন বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, শিক্ষকরা নিজ কর্মস্থলে সময় কম দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন চাকরিতে বেশি মনোযোগী। এতে করে ওই শিক্ষকের নিজ কর্মস্থলের শিক্ষার্থীরা ভুক্তভোগী হন। সময়মতো ক্লাস পান না, সেশনজটের সৃষ্টি হয়। শুধু তাই নয়, ওই শিক্ষকের পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য যে সময় প্রয়োজন, তা তিনি নষ্ট করেন খণ্ডকালীন চাকরিতে। এ কারণেই এটি শক্তভাবে মানতে চেষ্টা করা হবে।’
ইউজিসি সূত্রে জানা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়নে প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। ২০০২ ও ২০০৪ সালে অভিন্ন নিয়োগ নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক সমিতিসহ রাজনৈতিক চাপের কারণে কোনো নীতিমালা ও প্রস্তাব আলোর মুখ দেখেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির একাধিক নেতা জানান, ২০১৫ সালে জাতীয় বেতন স্কেলে বৈষম্যের প্রতিবাদে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলনের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষক নেতাদের বৈঠক হয়। বৈঠকে তারা নিয়োগ ও পদোন্নতির বৈষম্য তুলে ধরেন। তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে একটি মানসম্মত অভিন্ন নীতিমালা করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ইউজিসিকে নীতিমালার খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি এ নীতিমালা চূড়ান্ত করতে একাধিক কর্মশালার আয়োজন করে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্টরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, ‘শিক্ষার মান বজায় রাখতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একই মানে উন্নীতকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা কার্যকর হলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে শিক্ষকদের গবেষণার প্রবণতা বাড়বে এবং মানসম্পন্ন শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হবে। শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য, রাজনৈতিক দৌরাত্ম্য, পদোন্নতি জটিলতা, লেজুড়ভিত্তিক শিক্ষক রাজনীতির প্রভাব কমাসহ শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা আসবে। শিক্ষকদের মধ্যে পদোন্নতি বৈষম্যও দূর হবে।’
