ফুটপাতে পা হারালে মানুষ হাঁটবে কোথায়

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৯, ১২:২১ এএম

ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু এই মহানগরের সড়কগুলোতে ফুটপাতও নিরাপদ নয়। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই যাত্রীবাহী বাসের চাপায় পা হারালেন। মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটর মোড়ে এভাবেই সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক কৃষ্ণা রায়। দুর্ঘটনায় কৃষ্ণার বাম পা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তার পায়ে অস্ত্রোপচার করে বাম পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে অনেকখানি কেটে ফেলতে হয়। দুর্ঘটনার পর বাসটি আটক করা হলেও বাসের চালক পালিয়ে যান। পুলিশ জানিয়েছে, চালককে আটকের চেষ্টা চলছে। রাজধানী ঢাকার ফুটপাতে দুর্ঘটনায় পথচারীদের হতাহতের সংখ্যা বিপুল।

মঙ্গলবারের এই দুর্ঘটনা ঢাকার চলাচলের অনুপযোগী ও অনিরাপদ ফুটপাতের নানা সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা গেছে অন্য একটি বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আগে যাওয়ার জন্যই রাজধানীর ব্যস্ততম এই প্রধান সড়কে কারওয়ান বাজারের দিক থেকে আসা বাসটি ফুটপাতের ওপর উঠে যায়। বাংলামোটর ক্রসিংয়ের ফুট ওভারব্রিজ সংলগ্ন ফুটপাতের পাশে কোনো রেলিং না থাকায় বাসটি সরাসরি ওপরে উঠে যায় এবং সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণা রায়ের পা বাসের নিচে চাপা পড়ে। কেবল দিনের বেলায় ব্যস্ত সড়কেই নয়, রাতের বেলার ফাঁকা রাস্তায়ও বেপরোয়া চালকেরা ফুটপাতে ওপর গাড়ি তুলে দেন। ২০১৬ সালের ৫ ডিসেম্বরে মধ্যরাতে হাইকোর্টের সামনের ফুটপাতে ঘুমন্ত ছিন্নমূল মানুষের ওপর গাড়ি উঠে গেলে হাসিনা নামে মধ্যবয়সী এক নারী নিহত এবং আরও তিনজন আহত হন।

রাজধানীর অরক্ষিত ফুটপাত নিয়ে নানা সময়ে আলোচনা হলেও ফুটপাতগুলোকে নাগরিকদের চলাচলের উপযোগী করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোর দুই পাশের সব ফুটপাতই পথচারীদের চলাচলের উপযোগী নয়। অনেক ক্ষেত্রেই ফুটপাতের বড় অংশ বেদখল হয়ে থাকে। সড়ক সংলগ্ন দোকানপাটের মালামাল, বিভিন্ন ভবনের নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখার কারণে অনেক ফুটপাতেই হাঁটা যায় না। আর মহানগর জুড়ে ভ্রাম্যমাণ দোকানপাট এবং জিনিসপত্র নিয়ে ফুটপাতের ওপর দোকান সাজানো হকাররা তো আছেই। এসব কারণে ফুটপাতে হাঁটা কষ্টকর হয়ে ওঠে পথচারীদের জন্য। এর ওপর সম্প্রতি শুরু হয়েছে বিপুল সংখ্যক মোটরসাইকেলের দৌরাত্ম্য। প্রায়শই রাস্তার জ্যাম এড়াতে ফুটপাতের ওপর মোটরসাইকেল তুলে দিতে দেখা যায়। ফলে এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, কিছু বিশেষ এলাকা বাদ দিলে রাজধানী ঢাকার বেশিরভাগ ফুটপাতই দিন দিন নাগরিকদের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

বিভিন্ন গবেষণায়, সড়ক দুর্ঘটনার নানা কারণের সঙ্গে যুক্ত রাজধানীর নগর পরিকল্পনার যেসব ত্রুটি উঠে এসেছে তার মধ্যে অন্যতম হলোÑ পথচারীদের চলাচলের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সড়ক অবকাঠামোর বিন্যাস না করা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের (এআরআই) গবেষকরা বলছেন, প্রায় পৌনে দুই কোটি জনসংখ্যার ঢাকা মহানগরে সড়ক ব্যবহারকারী মানুষের প্রায় ৭০ শতাংশই পথচারী। কিন্তু নগর পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে শুধুই যানবাহনকে মাথায় রেখে। এর অনিবার্য ফলাফল অনুধাবন করা যাবে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের পরিসংখ্যান খেয়াল করলে। পুলিশের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এআরআই-এর গবেষকরা জানিয়েছেন, দেশের সব মহানগরে যত পথচারী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান, তার দ্বিগুণের বেশি মারা যান শুধু ঢাকা মহানগরে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এআরআই-এর একজন গবেষক জানান, দেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ লোক মারা যায় তার মধ্যে ৪৭ শতাংশই পথচারী। আর এরমধ্যে শুধু ঢাকা মহানগরে পথচারীদের দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পরিমাণ মোট দুর্ঘটনার ৪৯ শতাংশ।

সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল যেভাবে প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে তার সঙ্গে রাজধানীর সড়ক দুর্ঘটনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু রাজধানীর সড়ক অবকাঠামো ও গণপরিবহন ব্যবস্থা নানা কারণেই বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ পথচারীদের হাঁটার জন্য ফুটপাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা না থাকা, পর্যাপ্ত পরিমাণ ফুটওভারব্রিজ না থাকা, জেব্রা ক্রসিংয়ের মার্কিং উঠে যাওয়া, রাস্তা পারাপার এবং পথচারী চলাচলের জন্য সড়কগুলোর বিন্যাস যথাযথভাবে না থাকা। এসব কাঠামোগত প্রকৌশলের ত্রুটির সঙ্গে চালকের বেপরোয়া মনোভাব, পথচারীদের অসচেতনতাই দুর্ঘটনার বড় কারণ। বেপরোয়া চালকদের নিয়ন্ত্রণ করতে যেমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জরুরি, তেমনি এই মহানগরের সড়ক ও ফুটপাতগুলোকে নাগরিকদের জন্য নিরাপদ করে তুলতে নগর উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বিশেষ মনোযোগ এখন সময়ের দাবি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত