খাল রক্ষণাবেক্ষণে সঠিক পরিকল্পনা জরুরি

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৯, ১০:০৭ পিএম

বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় রাজধানীর জনজীবন স্থবির হয়ে পড়লেও এ থেকে উত্তরণের কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য কোনো উদ্যোগ নেই বলেই প্রতীয়মান হয়। টানা বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাই শুধু ভেঙে পড়ে না, পাশাপাশি রাস্তায় আটকে পড়েন শ্রমজীবী-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেক আবাসিক এলাকাতেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এটি নগরবাসীর জন্য দুর্ভোগের কারণ হলেও এ থেকে মুক্তি মিলছে না এবং এবারের পরিস্থিতিও ভিন্ন হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বয়হীনতা, পরিকল্পনাহীনতা এবং অদূরদর্শী নানা পদক্ষেপের কারণেই এ জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নগরবাসীর অসচেতনতা। রাজধানীর ২৬টি খাল, তিন হাজার কিলোমিটার ড্রেন ও জলাশয়গুলো পৌনঃপুনিকভাবে আবর্জনায় ভরাট হচ্ছে এবং তা জলাবদ্ধতায় ভূমিকা রাখছে।

 

রাজধানীর খাল, নর্দমা, ড্রেন সংস্কার, উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের নামে ঢাকা সিটি করপোরেশন (উত্তর ও দক্ষিণ), ঢাকা ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ, ঢাকা ডিসি অফিস বিভিন্ন প্রকল্পের নামে এবং রুটিন ব্যয় হিসেবে বিপুল অর্থ খরচ করেছে, অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়ের সঠিক হিসাব থাকে না বলে অভিযোগ আসে। এত কিছুর পরও জলজটের সুরাহা হচ্ছে না। উপরন্তু নতুন নতুন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

 

ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড সুয়ারেজ অথরিটি বা ঢাকা ওয়াসার আওতাধীন ১২টি খাল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ১৪ হাজার টাকা ব্যয় না হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী ফেরত গেছে মন্ত্রণালয়ে। অথচ একই সংস্থা এ ১২টি খাল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুই দফায় নতুন করে ১শ কোটি টাকা নতুন করে অর্থ বিভাগে বরাদ্দ চেয়েছে। একই সঙ্গে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্যও আরও ৬০ কোটি টাকা চাওয়া হবে বলে খবর মিলেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঢাকা মহানগরীর ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং খাল উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ৫৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পাস করে সরকার। এ প্রকল্পে রাজধানীর ১২টি খাল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ওয়াসাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ১৪ হাজার টাকা। খালগুলো হলোÑ কল্যাণপুর খাল, ইব্রাহিমপুর (বক্স কালভার্ট), বাউনিয়া খাল, দুয়ায়ীপাড়া খাল, আরামবাগ খাল, কল্যাণপুর প্রধান খাল, কল্যাণপুর (বক্স কালভার্ট), কল্যাণপুর-গ খাল, কল্যাণপুর-ঙ খাল, কল্যাণপুর-চ খাল, রামচন্দ্রপুর খাল, কাঁটাসুর খাল। সেই লক্ষ্যে ১২টি খালের নামসহ একটি কর্মপরিকল্পনাও তৈরি করে ওয়াসার সংশ্লিষ্ট বিভাগ। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের এ অর্থ ব্যয় করতে (অ্যানুয়াল প্রকিউরম্যান্ট প্ল্যান্ট-এপিপি) অনুমোদন করতে হয়। সেখানে প্রস্তাব পাঠানো হলেও এপিপি অনুমোদন না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের পর অর্থ ফেরত চলে যায়। অথচ, একই খাল রক্ষণাবেক্ষণের নামে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হচ্ছে।

 

পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন আইন-১৯৯৬ অনুযায়ী বৃষ্টির পানি অপসারণের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। ১৯৮৯ সালে পানি নিষ্কাশনের কাজ ঢাকা ওয়াসার ওপর ন্যস্ত করা হয়। সেই সময় থেকে দায়িত্ব পালনে সংস্থাটি কতটুকু সফল হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। সংস্থাটির আওতায় ৩৬০ কিলোমিটার পানি নিষ্কাশন নালা, ১০ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট ও মোট ৭৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ২৬টি খাল রয়েছে। এগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য দুটি সার্কেল ও একটি বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে ড্রেনেজ (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) সার্কেলে ৮৭ জন, ড্রেনেজ গবেষণা ও উন্নয়ন সার্কেলে ৩৪ জন এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন (ড্রেনেজ) বিভাগে ১২ জন কর্মরত আছেন। কিন্তু এই জনবল কাজে আসছে না।

 

দৈনন্দিন নাগরিক সেবার জন্যই ওয়াসার মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছিল। এই সেবাগুলোর মধ্যে ড্রেনেজ ও সুয়ারেজ ব্যবস্থাকে যথাযথভাবে পরিচালনা করা এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন অন্যতম। কিন্তু এই সেবাগুলো যথাযথভাবে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে ওয়াসার যথেষ্ট গাফিলতি আছে। সে জন্য সরকার নগরীর ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের দায়িত্বের পুরোটাই দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে ভাগ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। উদ্যোগটি এখনো চলমান। একসময় ঢাকায় বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে গড়িয়ে যাওয়ার পরিমাণ ছিল ৫৫ শতাংশ; বাদবাকি পানি মাটির নিচে চলে যেত। কিন্তু এখন প্রাকৃতিক পথগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৮৫ শতাংশ পানিই গড়িয়ে যায়। ফলে নতুন কারিগরি মূল্যায়ন সাপেক্ষে ওয়াসার পাম্পগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে গেছে। এছাড়া খালগুলো দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় আবর্জনা শক্ত হয়ে গেছে। এগুলো দিয়ে বৃষ্টির পানি প্রবাহিত না হওয়ায় রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি জমে থাকে। তাই খালগুলোকে পরিষ্কার করার জন্য উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি, নদী ও খালের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যকে কাজে লাগাতে ঢাকার ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়া খাল-জলাশয়গুলোকে পুনরুদ্ধার করে সেগুলোকে চারপাশের নদীগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা হলে জলাবদ্ধতা থাকবে না।

 

সেক্ষেত্রে ওয়াসার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং খাল উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয় না হয়ে ফেরত যাওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ওয়াসার যে জনবল রয়েছে তাদের কারিগরি দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করার বিকল্প নেই। প্রকল্পের অর্থ যেন যথাযথভাবে ব্যয় হয় সে জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মনিটরিংও প্রয়োজন। সর্বোপরি, ওয়াসাকে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকরী সংস্থায় পরিণত করতে হবে।’’’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত