মুসলিম বিধানমতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ত্যাগ বা বিচ্ছেদ ‘তালাক’ নামে পরিচিত। আরবি শব্দ তালাকের অর্থ ‘ছিন্ন করা’ ‘ত্যাগ করা’ বা ‘ভেঙে ফেলা’। মুসলিম নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে তালাক একটি বৈধ ও স্বীকৃত অধিকার। তবে, স্বামী স্ত্রীকে কিংবা স্ত্রী স্বামীকে তালাকের ক্ষেত্রে এখনো সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তালাক নিয়ে কিছু ক্ষেত্রে নারীদের অধিকারের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনো স্বামী তথা পুরুষের একচ্ছত্র আধিপত্য অনেকটাই বিদ্যমান। এ ক্ষেত্রে মুসলিম বিয়ের নিকাহনামার (কাবিননামা) ১৮ ও ১৯ নম্বর কলাম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইসলামি চিন্তাবিদ, মুসলিম আইন বিশেষজ্ঞ ও নারী নেত্রীরা।
নিকাহনামার ১৮ নম্বর কলামে উল্লেখ আছে, ‘স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করেছে কি না? করে থাকলে কী কী শর্তে।’ রাজধানীর বেশ কয়েকজন কাজি জানান, এই কলামটির শূন্য ঘরটি সাধারণত ‘হ্যাঁ’ এবং ‘প্রচলিত আইন অনুযায়ী’ লিখে পূরণ করা হয়। অর্থাৎ কেবল স্বামী সেই ক্ষমতা অর্পণ করলে বা অনুমতি দিলেই স্ত্রী একজন স্বামীকে তালাক দিতে পারবেন। তবে গ্রামেগঞ্জে কখনো কখনো বরপক্ষের কৌশলে কিংবা উভয়পক্ষের উদাসীনতায় এই কলামটি খালি রাখা হয়।
কাবিননামার ১৯ নম্বর কলামে বলা আছে, ‘স্বামীর তালাক প্রদানের অধিকার খর্ব হয়েছে কি না?’ এই কলামটিতেও চিরাচরিত পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের প্রকাশ এবং বৈষম্য দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। কাজিরা জানান, প্রায় সব বিয়ের কাবিননামাতে এই কলামের ডান পাশে লেখা হয় ‘না’। অর্থাৎ তালাক নিয়ে স্বামী তথা পুরুষের অধিকার একচ্ছত্রই বজায় থাকল। স্বামীর চরিত্রে দোষত্রুটি থাকলেও কোনো কারণ দেখিয়ে স্বামী চাইলে যেকোনো মুহূর্তে স্ত্রীকে তালাক দিতে পারবেন।
ইসলামি চিন্তাবিদ, মুসলিম আইন বিশেষজ্ঞ ও নারী নেত্রীরা বলছেন, তালাকের ক্ষেত্রে স্বামী তথা পুরুষের একচ্ছত্র আধিপাত্য এখনো অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত রয়ে গেছে। মৌলিক অধিকার, নারী-পুরুষের সমতার প্রশ্নে এ ধরনের কলাম এবং পুরুষের ইচ্ছানুযায়ী তা পূরণ করা ইসলাম ও সংবিধানও সমর্থন করে না।
তাদের মতে, স্বামীর কোনো সমস্যা থাকলে তাকে তালাক দিতে স্ত্রীর কেন স্বামীর অনুমতির অপেক্ষা বা স্ত্রীকে স্বামী এ ক্ষমতা অর্পণ করেছে কি না, সে বিবেচনা করতে হবে? একই সঙ্গে স্বামী যদি তার ইচ্ছানুযায়ী স্ত্রীকে যখন-তখন তালাক দিতে পারেন তাহলে স্ত্রীর কেন সে অধিকার থাকবে না, সে প্রশ্ন রেখে তালাকনামার ওই দুটি কলাম নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তারা বলছেন, মৌলিক অধিকার, নারী-পুরুষের সমতার প্রশ্নে এটি সাংঘর্ষিক। এ বিষয়ে সুরাহা হওয়া উচিত।
ইসলামি চিন্তাবিদ হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাবিননামায় এ ধরনের কলাম (১৮ ও ১৯) থাকা এবং তাতে তালাকের ক্ষেত্রে শুধু পুরুষের আধিপাত্য থাকা কোরআন ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। স্বামী যদি অত্যাচারী, লম্পট হন, ব্যভিচারী হন, অপকর্ম করেন সে ক্ষেত্রে স্ত্রীকে তালাক দিতে স্বামীর অনুমতি নিতে হবে কেন? তার কি অধিকার থাকবে না ওই স্বামীকে ত্যাগ করার।’
জিয়াউল হাসান আরও বলেন, ‘এ ধরনের কলাম থাকা ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী। নারী-পুরুষের সমতার ব্যাপারে ইসলাম সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ক্ষমতা এক ও অভিন্ন হতে হবে। তাই সমতা, মানবিকতা, মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে এ ধরনের কলাম সংশোধন কিংবা বাতিল হওয়া উচিত।’
গত ২৫ আগস্ট এক রায়ে মুসলিম বিয়ে নিবন্ধন ফরমের (নিকাহনামা বা কাবিননামা) ৫ নম্বর কলামে বিয়ের কনের ক্ষেত্রে ‘কুমারী’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘অবিবাহিতা’ যুক্ত করতে বলেছে হাইকোর্ট। পাশাপাশি কাবিননামার ৪ নম্বর কলামে ‘ক’ নামে একটি কলাম যুক্ত করে বিয়ের বরের ক্ষেত্রে ‘বিবাহিত’ ‘বিপতœীক’ ও ‘তালাকপ্রাপ্ত কি না’ এমন শব্দগুচ্ছ সংযোজন করতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। হাইকোর্টের এই রায়কে একটি মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, মুসলিম আইনের তালাকের একাধিক পদ্ধতির একটি হলো ‘তালাক-ই-তৌফিজ’। এই পদ্ধতির ক্ষেত্রে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশের ৭ ধারায় বর্ণিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়।
এ পদ্ধতিতে স্ত্রী আদালতের দারস্থ হওয়া ছাড়াই স্বামীকে তালাক দিতে পারেন। তবে, এ ক্ষেত্রে বিয়ের আগে নিকাহনামায় (কাবিননামা) ১৮ নম্বর কলামে বিয়ে বিচ্ছেদের ব্যাপারে স্বামী স্ত্রীকে সেই ক্ষমতা অর্পণ করে থাকেন। এই ক্ষমতাবলে স্ত্রী যদি স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদ চান তবে তিনি তা করতে পারেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিয়ের সময় প্রশ্নকারীরা কনেকে ১৮ নম্বর কলামের বিষয়ে প্রশ্ন করেন না বা এড়িয়ে যান। কলামটিতেও খালি রাখা হয়। স্বামী বা তার পক্ষ যদি এই কলামটি পূরণ না করে কিছুই না লেখে তাহলে স্ত্রীর তালাক প্রদান করার যে ন্যূনতম ক্ষমতা, সেটিও সীমিত হয়ে যায়।
ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. বেলায়েত হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধর্মীয় বিধানের কারণে তালাকের ক্ষেত্রে পুরুষের একচ্ছত্র ক্ষমতা। তবে স্ত্রীও তালাক দিতে পারেন কিংবা আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। যদি তার ওপর সেই ক্ষমতা অর্পিত হয়। কিংবা অনুমতি পান। এখন কোনো কারণে যদি সেই ক্ষমতা অর্পণ না হয়, স্বামী যদি অত্যাচার, নির্যাতন করেন, ব্যভিচারী, নিরুদ্দেশ হন তখন কী হবে? তখন হয়তো ১৯৮৫ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী আইনের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া স্ত্রীর কোনো পথ নেই। কিন্তু সেটিও বেশ সময়সাপেক্ষ।’
তিনি বলেন, ‘কাবিননামায় এ ধরনের কলাম (১৮ ও ১৯) আছে, কিন্তু স্বামীর কোনো সমস্যার কারণে স্ত্রী কীভাবে তাকে তালাক দেবেন সেটিও থাকা উচিত ছিল। শুধু ধর্মের অজুহাতে তালাকে বৈষম্য ও সমতা কাম্য নয়। কাবিনমামার ওই কলাম সংশোধন ও পরিমার্জন করা উচিত।’
কাবিননামার ৫ নম্বর কলাম নিয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদনের পক্ষভুক্ত বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) আইনজীবী আইনুন নাহার সিদ্দিকা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তালাকের ক্ষেত্রে স্বামীর ইচ্ছার গুরুত্ব বেশি। এখন অনেক ক্ষেত্রেই স্ত্রীরাও তালাকের বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারেন। এজন্য বিভিন্ন পদ্ধতিও রয়েছে। আর এ দুটি কলাম আমাদের নজর এড়ায়নি। তবে এ বিষয়ে আসলে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে সেটি ভবিষ্যতেই দেখা যাবে।’
জামিয়াতুস সাহাবা মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও ইসলামি চিন্তাবিদ শায়খুল হাদিস মাওলানা রুহুল আমীন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসলে মুসলিম বিয়ে একটি চুক্তি। কাবিননামার মাধ্যমে সেই চুক্তি হয়। এই দুটি কলামও সেই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। চুক্তি মেনে নিয়েই একজন নারী একজন পুরুষকে বিয়ে করেন। সেই চুক্তির বলেই স্ত্রীর ওপর ক্ষমতা অর্পিত হয় এবং তিনি স্বামীকে তালাক দিতে পারেন। তবে, যদি অসমতার প্রশ্ন আসে সে ক্ষেত্রে এগুলো সংশোধন করা উচিত।’
