আগস্ট ডায়েরি ১৯৪৭

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০১৯, ১১:২৬ পিএম

১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে জন্ম নিল দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান। সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের বর্ণনা মূর্ত হয়ে উঠেছে ভারতের সাবেক মন্ত্রী, গবেষক ও ইতিহাসবিদ যশোবন্ত সিংয়ের নানা লেখায়। তার একটি লেখার নির্বাচিত অংশের সংক্ষিপ্ত অনুস্মৃতি এবং তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘জিন্নাহ : ইন্ডিয়া-পার্টিশন ইন্ডিপেনডেন্স’-এর ডায়েরির অংশটুকুর অনুবাদ ‘চিন্তা’ পাতায় প্রকাশিত হলো। দ্বিতীয় লেখাটি পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মিলিটারি সেক্রেটারি মেজর জেনারেল শহীদ হামিদের স্মৃতিকথা ‘ডিজাস্ট্রাস টোয়াইলাইট : এ পার্সোনাল রেকর্ড অব দ্য পার্টিশন অব ইন্ডিয়া’র কিছু কিছু অংশকে উদ্ধৃত করে যশোবন্ত সিংয়ের লেখা থেকে চয়িত। লেখা দুটি পাঠকের জন্য অনুবাদ করেছেন আন্দালিব রাশদী

১৩ আগস্ট ১৯৪৭

করাচিতে উৎসবমুখয় ভাব বিরাজ করছে, কিন্তু পাকিস্তানের জন্ম প্রত্যক্ষ করার জন্য যে শত শত সংবাদদাতা ও দর্শনার্থী এসেছেন তাদের রাখার মতো পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা এখানে নেই। আমার ভগ্নিপতি (ব্রাদার-ইন-ল বলা হয়েছে, শালাও হতে পারে) কর্নেল মজিদ মালিক ভারতের জেনারেল হেড কোয়ার্টার্সের গণসংযোগ পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আর এখন তিনি পাকিস্তান সরকারের প্রিন্সিপাল ইনফরমেশন অফিসার; তার ওপর দিয়ে ভীষণ ঝক্কি-ঝামেলা যাচ্ছে। খবরের কাগজের প্রতিনিধিরা অবাস্তব কিছু প্রত্যাশা করছেন। কোনো পাকিস্তান সরকার ছিল না। (পক্ষান্তরে ওপ্রান্তে ভারতে সরকার ছিল, সরকারি সুযোগ-সুবিধা, আহার, বাসস্থান সবই পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের), তবে পাকিস্তানে রাতারাতি সরকার সৃষ্টি হচ্ছে। এখানে কোনো সরকারি দপ্তর নেই, মন্ত্রণালয় নেই, অফিসের আসবাব নেই, স্টেশনারি সামগ্রীও নেই। টাইপরাইটার তখন বিলাসিতার পর্যায়ে পড়ে। ভীষণ হ-য-ব-র-ল অবস্থা। ভাইসরয় আশা করেছিলেন ১৩ আগস্টই রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে করাচির অভ্যুদয় ঘটবে এবং ব্রিটিশ রাজের প্রতিনিধি হিসেবে তাকে বরণ করার জন্য প্রস্তুত থাকবে।

প্রথম অনুষ্ঠানটিই হচ্ছে গভর্নর জেনারেলের বাড়িতে বাঙ্কোয়েট, পঞ্চাশজন অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি বেশ উত্তেজনাকর। কায়েদে আযম একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন। এই প্রথম এবং শেষবারের মতো তাকে  দেখলাম তিনি ‘হিজ ম্যাজেস্ট্রি দ্য কিং’-এর জন্য টোস্ট প্রস্তাব করলেন। অন্যদিকে মাউন্টব্যাটেন ব্রিটিশ রাজের শুভেচ্ছা জানিয়ে দীর্ঘ একটি বক্তৃতা দিলেন, যা এ ধরনের অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তিনি যা যা বললেন তার মধ্যে রয়েছে মানুষ অবাক হয়ে জানতে চেয়েছে ক্ষমতা হস্তান্তরের তারিখ কেন এগিয়ে আনা হয়েছে। এর জবাব দিতে তিনি শিশুসুলভ উপমা টানলেন; বললেন তরুণ কাউকে সাইকেল চালনা শেখাতে হলে সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে তাকে পাহাড়ে তুলে সাইকেলের সিটে বসিয়ে নিচের দিকে ঠেলে দেওয়া যতক্ষণে সে সমতলে এসে পৌঁছাবে, ততক্ষণে তার সাইকেল চালানো শেখা হয়ে যাবে।

যতক্ষণ প্রত্যাশিত ছিল তার চেয়ে বেশিক্ষণ ধরে বাঙ্কোয়েট চলল। এর পরপরই বাইরের বাগানে একটি সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে। এতে হাজারেরও বেশি অতিথি অংশগ্রহণ করেছেন। কায়েদে আযম তখন নীরব এবং নিজেকে বিছিন্ন করে রেখেছেন। আমি তার কাছে গেলাম এবং কোনো কথা না বলে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার দিকে তাকিয়ে তিনি মৃদু হাসলেন... শারীরিকভাবে তাকে দুর্বল, ক্লান্ত এবং কোনো কিছু নিয়ে চিন্তামগ্ন দেখাচ্ছিল। যেকোনো ভাবে আমার মনে হলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সংবর্ধনার অনুষ্ঠানটি শেষ করা হোকÑ এটাই তিনি চাচ্ছেন।

হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে মাউন্টব্যাটেন ভিন্ন ‘মুড’-এ, তিনি এখনই চলে যেতে যাচ্ছেন না। তিনি অতিথিদের মুগ্ধ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন... স্পষ্টতই যতক্ষণ না রাজার প্রতিনিধি অনুষ্ঠান ত্যাগ করছেন কায়েদে আযমের পক্ষেও এখান থেকে সরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

কায়েদ যখন তার এডিসিকে ডাকলেন আমি তার কাছ থেকে তেমন দূরে ছিলাম না, তিনি তাকে বললেন, মাউন্টব্যাটেনকে বাড়ি চলে যেতে বলোÑ তিনি তাকে আর সহ্য করতে পারছিলেন না। বেচারা এডিসি বুঝতে পারছিল না তখন কী করবে। পরামর্শ নেওয়ার জন্য আমার কাছে এলো। আমি তাকে বললাম, মাউন্টব্যাটেনের কাছে যাও এবং কায়েদ যা বলেছেন ঠিক তা-ই তাকে বলো। তাকে নৈতিক সমর্থন দিতে আমি বললাম, তুমি চলো আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি। আমরা হেঁটে মাউন্টব্যাটেনের কাছে গেলাম এবং হুবহু তাকে বার্তাটি দিলাম। মাউন্টব্যাটেন একটা ধাক্কা খেলেন এবং বললেন ‘অবশ্যই, আমার বোঝা উচিত ছিল কত দেরি হয়ে গেছে এবং জিন্নাহ সাহেব নিশ্চয়ই ক্লান্ত।’ তিনি হেঁটে হেঁটে জিন্নাহ সাহেবের কাছে এলেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে বিদায় নিলেন। কী যে এক দিন ছিল এটা!

১৪ আগস্ট ১৯৪৭

এদিন সকালে কত কিছু যে ঘটল, এর মধ্যে মাউন্টব্যাটেন আবার দাদাগিরি ফলাতে চেষ্টা করলেন। তিনি কায়েদকে জানালেন দিল্লির গোয়েন্দা সংস্থার হাতে একটি ষড়যন্ত্র উদঘাটিত হয়েছে। করাচির মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা উদযাপন শোভাযাত্রায় কায়েদের গাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করা হবে। এই গাড়িযাত্রা বন্ধ করার জন্য তিনি কায়েদকে অনুরোধ করলেন। কায়েদ অস্বীকার করলেন। সেক্ষেত্রে মাউন্টব্যাটেন আবার অনুরোধ করলেন তিনি যেন কোনো বদ্ধ গাড়িতে যান, কায়েদ আবার প্রত্যাখ্যান করলেন তিনি খোলা গাড়িতেই যাবেন। পুরো রাস্তাজুড়ে প্রবল উদ্দীপনা, প্রবল করতালি। দেখার মতো এক দৃশ্য, বর্ণনা করা অসাধ্য। স্বপ্ন সত্য হতে যাচ্ছে, একটি রাষ্ট্রের জন্ম হচ্ছে, কায়েদে আযমের নাম সবার মুখে মুখে, স্রষ্টার জন্য তাদের শুকরিয়া... ফেরার পর মাউন্টব্যাটেন তার স্টাফকে বললেন জিন্নাহ খুব উত্তেজিত ও বিষণœ এবং ভেঙে পড়েছেন। তিনি মিস জিন্নাহকে (কায়েদের বোন ফাতিমা জিন্নাহ) বলেছেন, ‘ফানি ওম্যান’।

এসব নিয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়, মেজর জেনারেল শহীদ হামিদ যা বলেছেন তার যথার্থতা নিয়েও নয় তবে তার লেখায় মাউন্টব্যাটেন সম্পর্কে অনেক কথাই বলে গেছেন। ক্রিস্টোফার মিচেলের জিন্নাহকে নিয়ে নির্মিত একটি সিনেমায় গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ এবং মাউন্টব্যাটেন উভয়কেই একই লিমোজিনে দেখা গেছে। শেষেরজন লঘুচিত্ত রয়্যাল নেভির মেডেল শোভিত ইউনিফর্ম পরা; অন্যজন তার সর্বজন পরিচিত পোশাক পরে আছেন, কিন্তু ক্লান্ত স্ব-প্রত্যাহৃত, মাউন্টব্যাটেন যেমন সব হাত নাড়ার জবাব দিচ্ছেন, আর এসব থেকে দূরবর্তী জিন্নাহ বসে কেবল দেখছেন। তারপর হঠাৎ কদিনের ক্লান্তি, অসুস্থতা, দিনের আর্দ্রতা সব ঠেলে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন আর এই বার্তাই দিল যে কায়েদে আযম পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন, মাউন্টব্যাটেন নন। পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাহায্যে সৃষ্ট পাকিস্তানের সৃষ্টির ১৩ মাসের মধ্যেই তার মৃত্যু ঘটল। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান সৃষ্টির অনুপ্রেরণাও হারিয়ে গেল। কাজেই জন্মের পরপরই শিশু রাষ্ট্রটির ধারণাগত ও নৈতিকভাবে এতিম হয়ে যাওয়ার যে ভয়ংকর ও অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল, পাকিস্তান এখনো তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত