ছয় বছর আগে ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে নিখোঁজ হন রনি চৌধুরী। রনির মা আঞ্জুমানারা বেগমের বিশ্বাস আজ হোক কাল হোক ছেলে ঘরে ফিরবেই। এজন্য প্রতিদিনই পথ চেয়ে থাকেন মধ্যবয়সী এই নারী। গতকাল শুক্রবার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘গুম হওয়া পরিবারগুলোর’ সংগঠন মায়ের ডাকের উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় তিনি তার এই বিশ্বাস আর অপেক্ষায় থাকার কথা জানান।
‘গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে’ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ছেলের সন্ধানের আকুতি জানিয়ে আঞ্জুমানারা বেগম বলেন, ‘রনিকে একটি মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যায় সাদা পোশাকধারীরা। রনির খোঁজে কত মানুষের কাছে গিয়েছি, তা বলে শেষ করতে পারব না। প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকি এই বুঝি আমার ছেলে ফিরে এলো। কিন্তু রনি আর আসে না। এভাবে আর কত দিন?’
অনুষ্ঠানে ‘নিখোঁজ স্বজনদের’ ছোট-বড় ছবি, ব্যানার নিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত হন; তাদের সঙ্গে ছিল পরিবারের শিশুরাও।
২০১৬ সালের ৪ আগস্ট বাবার জন্য ওষুধ কিনতে গিয়ে আর ফেরেননি কুষ্টিয়ার হোমিও চিকিৎসক শেখ মোকলেছুর রহমান জনি। জাতীয় প্রেস ক্লাবের এই অনুষ্ঠানে তার বাবা শেখ আবদুর রাশেদ কথা বলতে গিয়ে কান্না আটকাতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে কান্না সামলে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। তারপরও স্থানীয় থানার এক এসআই আমার ছেলেকে তুলে নিয়ে গুম করেছে। ছেলেকে ফিরে পেতে ওই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করলেও কোনো সুরাহা কেউ দেয়নি। ছেলের জন্য আর কতকাল অপেক্ষায় থাকতে হবে?’
কুষ্টিয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন ২০১৫ সালের ২১ আগস্ট থেকে নিখোঁজ। সাজ্জাদের স্ত্রী ও কন্যার পাশাপাশি সভায় উপস্থিত ছিলেন তার মা সাহিদা বেগম। ছেলের কথা বলতে শুরু করতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সামলে নিয়ে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকেরা আমার ছেলের সঙ্গে তিনজনকে ধরে নিয়ে যায়। দুজনকে ছেড়ে দিলেও আমার ছেলেকে তারা ছাড়েনি। আমার ছেলে কোনো অপরাধ করে থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক, তাতে আমার আপত্তি নেই। তারপরও আমার ছেলেকে আপনারা ফিরিয়ে দিন।’
সাড়ে তিন বছর ধরে খোঁজ নেই রাজধানীর রামপুরা থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এসএম মোয়াজ্জেম হোসেন তপুর। তার মা সালেহা বেগমের অভিযোগ, স্থানীয় যুবলীগের নেতারা প্রশাসনকে ব্যবহার করে সাজ্জাদকে গুম করেছে। তিনি বলেন, ‘বছরের পর বছর ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে অসুস্থ হয়ে পড়েছি। তারপরও ছেলের আশায় প্রতিদিনই পথ চেয়ে থাকি।’ সালেহা বেগম বলেন, ‘ছেলের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিনবার দেখা করেছি, কোনো ফল পাচ্ছি না। এই দেশে কি কোনো আইন নেই? আর কতদিন সন্তানের জন্য অপেক্ষা করব?’
রাজধানীর তেজগাঁও থেকে ছয় বছর আগে নিখোঁজ বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের ১২ বছরের মেয়ে রাইতা ইসলামও বক্তব্য রাখে অনুষ্ঠানে। সে বলে, ‘আমার বয়স যখন ছয় বছর তখন বাবা গুম হন। অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে আমি বড় হচ্ছি। বাবার জন্য আর কত বছর অপেক্ষা করব?’
২০১২ সাল থেকে নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর ছেলে আবরার ইলিয়াস বলেন, ‘সাত বছর ধরে বাবার কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। আমার মা এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বাবা গুম হওয়ার পর থেকে আমাদের মধ্যে জন্মদিন বা ঈদের দিন বলে কিছু নেই। এসব দিন আরও দুঃখের হয়ে দাঁড়ায় আমাদের।’
বংশালের ছাত্রদল নেতা পারভেজ হোসেনের খোঁজ নেই ২০১৩ সাল থেকে। তার সাত বছরের মেয়ে হৃদি হোসেন এক আত্মীয়ের কোলে উঠে মাইক্রোফোনের সামনে বলে, ‘পাপার বুকে আমি ঘুমাতে চাই। পাপা তো আসে না। প্রতিদিন আমি পাপার জন্য অপেক্ষায় থাকি। কোথায় গিয়েছে পাপা?’
পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) নেতা মাইকেল চাকমা গত ৯ এপ্রিল নিখোঁজ হন। অনুষ্ঠানে তার বোন সুভদ্রা চাকমা বলেন, ‘আমার ভাইকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকেরা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। প্রথমে তারা আটকের বিষয়টি স্বীকার করলেও পরে তা অস্বীকার করে।’
নিখোঁজদের স্বজনদের মধ্যে শুরুতেই মঞ্চে আসেন কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের নাসরিন জাহান স্মৃতি। গত ১৯ জুন রাজধানীর মিরপুর থেকে তার স্বামী ইসমাইল হোসেন নিখোঁজ হন। নাসরিনের অভিযোগ, পূর্বশত্রুতার জের ধরে র্যাবের এক সদস্য তার স্বামীকে গুম করেছে।
‘নিখোঁজদের স্বজনরা’ মিলে ২০১৪ সালে ‘মায়ের ডাক’ নামে এ সংগঠনটি গড়ে তোলেন। বিএনপি নেতা সুমনের মা হাজেরা বেগম এর নেতৃত্বে আছেন। তিনি অসুস্থ থাকায় তার মেয়ে মারুফা ইসলাম ফেরদৌসী সভায় সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ও অধ্যাপক আকমল হোসেন।
