আয়তন ও জনসংখ্যায় ভারত শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম বড় রাষ্ট্র। বহু জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-নৃগোষ্ঠীর এই দেশটি একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থারও উদাহরণ। কিন্তু সম্প্রতি জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বিলোপ এবং রাজ্যটিকে দুই ভাগ করে দুটি আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তরিত করা নিয়ে ভারতের ভেতরে-বাইরে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে। প্রশ্ন উঠেছে ভারত তার গণতান্ত্রিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে কি না। জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে উদ্বেগ ও জল্পনা-কল্পনা কমতে না কমতেই শনিবার আসাম রাজ্যের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন তালিকা ‘এনআরসি’ প্রকাশ নিয়ে উত্তেজনার পারদ নতুন করে তুঙ্গে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের মুখে থাকা এই তালিকায় রাজ্যটির ১৯ লাখেরও বেশি বাসিন্দার নাম নেই। রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, এই তালিকায় বাদ পড়া মানুষেরা এখন কার্যত ‘রাষ্ট্রহীন’ হয়ে পড়লেন।
আসামের বর্তমান জনসংখ্যা ৩ কোটি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৬৬১ জন। শনিবার প্রকাশিত ‘এনআরসি’ থেকে বাদ পড়েছেন ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন। সরকারি ঘোষণা অনুসারে ‘এনআরসি’ থেকে বাদ পড়া অধিবাসীরা এখন নাগরিকত্বের সুরাহার জন্য রাজ্যের ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে’ আবেদন করতে পারবেন। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং ১২০ দিনের মধ্যে ওই আবেদন করতে হবে। উল্লেখ্য, আসামে এখন ১০০টি ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ কাজ করছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুসারে এ মাস থেকেই আরও ২০০ ট্রাইব্যুনাল কাজ করতে যাচ্ছে। আসাম সরকারের পরিকল্পনা অনুসারে সেখানে মোট এক হাজার ট্রাইব্যুনাল স্থাপিত হবে। তবে, এসব ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে জনপ্রতি প্রায় ৪০ হাজার রুপি ব্যয় করতে হবে অধিবাসীদের। দরিদ্র মানুষেরা কীভাবে এত অর্থ ব্যয় করে এটা মোকাবিলা করবেন সে উদ্বেগও রয়েছে। আর ট্রাইব্যুনালে সুরাহা না হলে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে হবে ‘এনআরসি’ থেকে বাদ পড়া বাসিন্দাদের।
সঙ্গত কারণেই আসামে এক প্রবল অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ভারতজুড়ে এ ঘটনার তীব্র অভিঘাত দেখা দিয়েছে। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি ও তার মিত্ররা ছাড়া দেশটির বেশিরভাগ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ‘এনআরসি’র সমালোচনায় মুখর। এর নানা অসঙ্গতি নিয়ে নানা সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে গণমাধ্যমে। বাদ পড়া নাগরিকরা বাঙালি বলে নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশেও নানা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। অবশ্য ভারতের দায়িত্বশীল মহল বাংলাদেশকে নানাভাবে আশ্বস্ত করেছে। বাংলাদেশের সরকার ও জনগণও বিশ্বাস করে যে, ‘এনআরসি’র ঢেউ আমাদের আক্রান্ত করবে না। তবু এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সতর্কতার নীতি অবলম্বন করছে। কেননা, সাম্প্রতিক অতীতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দান করে বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের মধ্যে রয়েছে। মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব হরণ করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করলে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয় বাংলাদেশ।
অবশ্য এ কথা অনস্বীকার্য, দীর্ঘদিন সামরিক শাসনের অধীন থাকা মিয়ানমার আর ভারতের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ভারত বহু ভাষা ও বহু জাতির রাষ্ট্র। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সংস্কৃতিই তার প্রাণ। ফলে, আসামে আপাত অর্থে ‘রাষ্ট্রহীন’ হয়ে পড়া নাগরিকরা চূড়ান্ত অর্থেই রাষ্ট্রহীন ও উদ্বাস্তু হয়ে পড়বেন এই দুশ্চিন্তা করাটা কঠিন। নিজের রাষ্ট্র ছেড়ে তাদের অন্যত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে হবে এমন চিত্র ভারতের সঙ্গে বেমানানই হবে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আসামের এই জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন থেকে বাদ পড়া বাসিন্দাদের মধ্যে বাঙালি মুসলমানের চেয়ে বাঙালি হিন্দুদের সংখ্যা বেশি। হিন্দুই হোক কিংবা মুসলিম বা অন্য কোনো ধর্ম-জাতিসত্তার মানুষ, জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের মতো কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপের কারণে কোনো মানুষেরই ‘রাষ্ট্রহীন’ হয়ে যাওয়া কাম্য নয়। মানুষকে ‘রাষ্ট্রহীন’ করার এই রাজনীতি থেকে মুক্ত হতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সচেতন জনগণের এক সামগ্রিক সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে।
